নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ০৯:৫২, ২৬ জুলাই ২০২৬
আপডেট: ০৯:৫৯, ২৬ জুলাই ২০২৬

‘উৎপাদন ও বিনিয়োগে বড় ধাক্কা গ্যাস সংকট’

‘উৎপাদন ও বিনিয়োগে  বড় ধাক্কা গ্যাস সংকট’

ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের অর্থনীতি ও রপ্তানি আয়ের সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক (RMG) এবং বস্ত্র (Textile) খাত বর্তমানে বহুমুখী সংকটের আবর্তে নিপতিত হয়েছে। তীব্র অর্থসংকট, নজিরবিহীন গ্যাস ঘাটতি এবং ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তাহীনতা পুরো শিল্প খাতকে এক গভীর বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছে। 

শনিবার (২৫ জুলাই) রাতে রাজধানীর রেডিসন ব্লু ওয়াটার গার্ডেন হোটেলে বাংলাদেশ প্যাকেজিং অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিএমইএ) আসন্ন দ্বিবার্ষিক নির্বাচন উপলক্ষে আয়োজিত প্যানেল পরিচিতি সভায় বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল এই আশঙ্কার কথা জানান। 

তিনি সতর্ক করে বলেছেন যে, এখনই কার্যকর ও সমন্বিত পদক্ষেপ না নিলে দেশের শিল্প খাতে আগামী দিনে আরও ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসবে।  

বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেছেন যে, বর্তমান সময়ে দেশের টেক্সটাইল ও ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পগুলো মূলধন বা অর্থসংকট, জ্বালানি বা গ্যাসের তীব্র সংকট এবং আস্থার অভাব বা নিরাপত্তার সংকটের মধ্য দিয়ে পার হচ্ছে। গত কয়েক বছর ধরে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুতের অভাবে দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ কারখানা হয় সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে, নয়তো নামমাত্র সক্ষমতায় আংশিক চালু রাখা হয়েছে। উৎপাদন বন্ধ থাকলেও ব্যাংক ঋণ পরিশোধ এবং শ্রমিকদের নিয়মিত বেতন-ভাতা দিতে গিয়ে উদ্যোক্তাদের পকেটের ক্যাশ রিজার্ভ বা নগদ অর্থের তহবিল সম্পূর্ণ নিঃশেষ হয়ে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে মূলধন হারিয়ে উদ্যোক্তারা শিল্প টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন।

এই জ্বালানি সংকট কেবল টেক্সটাইলেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং এর বহুমুখী নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে পাট, কাগজ, কাঠ, প্লাস্টিক, স্টিল এবং সুতা তৈরির কারখানাগুলোতেও। পর্যাপ্ত গ্যাসের অভাবে দেশের প্রায় ১৪০টি কাগজকলের মধ্যে সচল রয়েছে মোটে ৪০টি। ফলে স্থানীয়ভাবে চাহিদা পূরণের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও বিপুল পরিমাণ কাগজ ও সুতা আমদানির ওপর নির্ভরতা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। 

তথ্যানুযায়ী, গত তিন বছরে প্রায় তিনশ সুতাকল এবং সাড়ে তিনশর বেশি পোশাক কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। পাশাপাশি, প্রাথমিক বস্ত্র খাতে বিনিয়োগকৃত ২৩ বিলিয়ন ডলারের প্রায় ৪০ শতাংশ অর্থাৎ ৮ থেকে ৯ বিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ অর্থ আজ আটকে বা ঝুঁকিতে রয়েছে।

বাংলাদেশের বর্তমান গ্যাস ঘাটতি কেবল একটি সাধারণ জ্বালানি সমস্যা নয়, এটি রূপ নিয়েছে জাতীয় শিল্প খাতের অন্যতম বড় বড় বিপর্যয়ে। দেশের দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮৮ কোটি ঘনফুট হলেও পেট্রোবাংলা ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সরবরাহ করতে পারছে মাত্র ২৬০ কোটি ঘনফুট। এতে দৈনিক ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে প্রায় ১২৮ কোটি ঘনফুট। সাম্প্রতিক সময়ে মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের (এফএসআরইউ) কারিগরি ত্রুটির কারণে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়, যা সামগ্রিক শিল্প উৎপাদন ব্যবস্থাকে পঙ্গু করে দিয়েছে।

জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দীর্ঘ সময় ধরে সীমিত সংখ্যক এলএনজি টার্মিনালের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরতা এবং দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে দীর্ঘসূত্রতাই আজকের এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বদরুল ইমাম এবং জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম তামিম বারবার জোর দিয়ে বলেছেন যে, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা মোকাবিলায় দ্রুত স্থল ও সমুদ্রে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান এবং দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। তা না হলে আমদানিনির্ভর এই ভঙ্গুর জ্বালানি কাঠামো দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে শিল্প টিকিয়ে রাখা অসম্ভব হবে।

আরও পড়ুন: এলএনজি টার্মিনাল বন্ধে গ্যাস সংকট, অনিশ্চিত সরবরাহ

আগামী দিনে দেশের শিল্প খাতের সামনে আরও বড় ও কঠিন চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে। স্বল্পোন্নত দেশ (LDC) বা এলডিসির মর্যাদা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকতে হলে স্থানীয় শিল্পকে তীব্র প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হবে। বিশ্ববাজারে নিজেদের অবস্থান বজায় রাখতে হলে পণ্যের মূল্য সংযোজন (ভ্যালু অ্যাডিশন) নাটকীয়ভাবে বাড়াতে হবে।

শওকত আজিজ রাসেল হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে জানান যে, ২০২৯ সালের পর থেকে রপ্তানিমুখী পণ্যে ন্যূনতম ৪০ শতাংশ এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত মূল্য সংযোজন নিশ্চিত করতে হবে। অথচ বর্তমান গ্যাস ও আর্থিক সংকটের কারণে স্থানীয় ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ ও অ্যাকসেসরিজ শিল্পগুলো ধ্বংসের মুখে পড়লে এই লক্ষ্য অর্জন অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। বিশেষ করে ভারতসহ বিভিন্ন প্রতিযোগী দেশের সরকার যখন তাদের উৎপাদকদের বিদ্যুৎ ও আর্থিক প্রণোদনা প্রদান করে, তখন আমাদের স্থানীয় শিল্পগুলো অতিরিক্ত উৎপাদন খরচের চাপে মার খাচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, আধুনিক যন্ত্রপাতি থাকার পরও উচ্চ জ্বালানি ও উৎপাদন ব্যয়ের কারণে স্থানীয় সুতা বিদেশি সুতার তুলনায় প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে।

এমন ক্রান্তিলগ্নে দেশের শিল্প ও রপ্তানি খাতকে রক্ষা করতে হলে উদ্যোক্তা এবং বাণিজ্য সংগঠনগুলোকে সকল বিভেদ ভুলে একসঙ্গে কাজ করার তাগিদ দিয়েছেন বিটিএমএ সভাপতি। 

তিনি বলেন, বিজিএমইএ, বিকেএমইএ এবং বিটিএমএ আজ যেভাবে যৌথভাবে সরকারের নীতিনির্ধারকদের কাছে দাবি ও প্রস্তাব তুলে ধরছে, তা অত্যন্ত ইতিবাচক। 

পোশাক খাতের বিভিন্ন সংগঠনকে এক মায়ের তিন সন্তান হিসেবে আখ্যায়িত করে তিনি উল্লেখ করেন যে, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, রপ্তানি বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির অভিন্ন লক্ষ্যে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।

এদিকে, আগামী ১ আগস্ট অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া বাংলাদেশ প্যাকেজিং অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিএমইএ) ২০২৬-২৮ মেয়াদের দ্বিবার্ষিক নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ব্যবসায়ী অঙ্গনে ব্যাপক তৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ২৭ সদস্যের পরিচালনা পর্ষদের বিভিন্ন পদে প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও ঐক্য পরিষদ প্যানেলের ছয়জন সহ-সভাপতি এবং ১৫ জন পরিচালক ইতোমধ্যে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। আগামী ১ আগস্ট কেবল সভাপতি পদ এবং চট্টগ্রাম অঞ্চলের পাঁচটি পরিচালক পদের জন্যই মূলত ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। সভাপতি পদে ঐক্য পরিষদের প্যানেল নেতা ও আদজি ট্রিমস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শাহরিয়ারের সঙ্গে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ব্রিটানিয়া লেবেল বিডি লিমিটেডের জামিল আহমেদ।

শিল্প সংশ্লিষ্ট ও অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশের এই ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও শিল্প বিপর্যয় রোধ করতে হলে সরকারের পক্ষ থেকে জরুরি ভিত্তিতে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা আবশ্যক:

নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি নিশ্চিতকরণ: শিল্প কারখানায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করতে হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে বিকল্প জ্বালানি হিসেবে নবায়নযোগ্য শক্তি ও সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়াতে হবে। 

নীতিগত ও আর্থিক সহায়তা: সংকটে থাকা কারখানাগুলোর জন্য সহজ শর্তে ঋণ পুনঃতফসিলীকরণ এবং কার্যকরী মূলধন সহায়তা প্রদান করতে হবে যাতে উদ্যোক্তারা কারখানা বন্ধ করতে বাধ্য না হন।

আমদানিবিকল্প শিল্পের সুরক্ষা: বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের স্বার্থে স্থানীয় সুতা, কাগজ এবং অন্যান্য ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পগুলোকে টিকিয়ে রাখতে সময়োপযোগী শুল্ক নীতি ও প্রণোদনা ঘোষণা করতে হবে। 

পরিশেষে, বর্তমান বহুমুখী সংকটের হাত থেকে তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল খাতকে রক্ষা করতে সরকারি নীতিনির্ধারক ও বেসরকারি শিল্প উদ্যোক্তাদের যৌথ ও বাস্তবসম্মত কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমেই কেবল দেশের অর্থনীতিকে টেকসই ও গতিশীল রাখা সম্ভব।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়