নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ০৮:৩৭, ২৬ জুলাই ২০২৬

বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে নতুন ধাক্কা

বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে নতুন ধাক্কা

ফাইল ছবি

মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে মার্কিন-ইরান সংঘাত এবং লোহিত সাগরে হুথি বিদ্রোহীদের তীব্র সামরিক তৎপরতার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। জ্বালানির বৈশ্বিক মজুত বিপজ্জনকভাবে হ্রাস পাওয়ায় ব্যারেলপ্রতি ব্রেন্ট ক্রুডের দাম আবারও ১০০ ডলারের মনস্তাত্ত্বিক বাধা অতিক্রম করেছে। হরমুজ ও বাব এল-মান্দেব প্রণালিতে বিঘ্নিত সরবরাহ এবং মার্কিন কৌশলগত মজুত ইতিহাসের সর্বনিম্নে নেমে যাওয়ায় বিশ্ব অর্থনীতি এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

বৃহস্পতিবার বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারসের দাম একপর্যায়ে বেড়ে ১০২ ডলারে পৌঁছায় এবং দিন শেষে তা ১০০ দশমিক ৬৯ ডলারে স্থির হয়। মে মাসের পর এটিই ব্রেন্ট ক্রুডের সর্বোচ্চ মূল্য। শুক্রবারে সামান্য ওঠানামা করলেও গত সপ্তাহের তুলনায় দাম বেড়েছে প্রায় ১২ শতাংশ। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে ইরান সংঘাত শুরুর সময়ের তুলনায় বর্তমান দাম প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি।

বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, চলতি পরিস্থিতির দ্রুত সমাধান না হলে বিশ্ববাজার বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে পারে। গোল্ডেন স্যাকসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী চতুর্থ প্রান্তিকে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলার ছাড়াতে পারে। অন্যদিকে, জেপি মরগানের হিসাব বলছে, সরবরাহ সংকটের প্রতিটি অতিরিক্ত মাসের জন্য ব্রেন্টের দাম ৭ থেকে ৮ ডলার পর্যন্ত বাড়তে পারে।

বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক চতুর্থাংশ যাতায়াত করে হরমুজ প্রণালি এবং বাব এল-মান্দেব প্রণালির মাধ্যমে। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার জেরে এই দুই গুরুত্বপূর্ণ রুটে ট্যাংকার চলাচল প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।

হরমুজ প্রণালি: সামরিক উত্তেজনার কারণে এই রুটে ট্রাফিক চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

লোহিত সাগর ও বাব এল-মান্দেব: ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগরে তেল ট্যাংকার লক্ষ্য করে লাগাতার হামলা চালাচ্ছে এবং সৌদি আরবের বিরুদ্ধে কার্যকর নৌ অবরোধ তৈরি করেছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প লোহিত সাগরে এই হামলার তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে ইরান ও হুথিদের বিরুদ্ধে কঠোর সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।

আরও পড়ুন: বিশ্ববাজারে আরও বাড়লো জ্বালানি তেলের দাম

এর আগে গত এপ্রিল মাসে সংঘাতের শুরুর দিকে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২৬ ডলারে উঠেছিল। সে সময় আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থার (আইইএ) ৩২টি সদস্য দেশ মিলে বাজারে ৪০ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ছাড়ার যৌথ সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। যার মধ্যে একাই ১৭২ মিলিয়ন ব্যারেল তেল ছেড়েছিল যুক্তরাষ্ট্র।

তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই স্বস্তির সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ বর্তমানে কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩১১ মিলিয়নে, যা ১৯৮৩ সালের পর থেকে সর্বনিম্ন। বাণিজ্যিক মজুত ও সমুদ্রের ভাসমান গুদামগুলোর অবস্থাও অত্যন্ত করুণ হওয়ায় জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত তেল সরবরাহ নিশ্চিত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

শুধু অপরিশোধিত তেল নয়, রেকর্ড গড়েছে পরিশোধিত জ্বালানির রিফাইনিং মার্জিনও। মার্কিন ৩-২-১ ক্র্যাক স্প্রেড প্রায় ৭০ ডলারে পৌঁছেছে, যা স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি।

ইউরোপীয় বাজার: ডিজেল ও জেট ফুয়েলের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলার কারণে রাশিয়ার ডিজেল রপ্তানি সীমিত হওয়া এবং মধ্যপ্রাচ্য সংকট এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

ক্ষতিগ্রস্ত খাত: ডিজেল ও জেট ফুয়েলের আকাশচুম্বী দামের কারণে বিশ্বজুড়ে কৃষি এবং পরিবহন খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে।

পশ্চিমের কঠোর নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও এই বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের মধ্যে উল্টো সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে রাশিয়া। তেলের দাম বাড়ায় দেশটির উরাল ক্রুডের রপ্তানি মূল্যও বৃদ্ধি পেয়েছে, যা রুশ জাতীয় বাজেটে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব যোগ করছে। ভারত ও চীন এই সংকটকালীন সময়েও রেকর্ড পরিমাণ রুশ তেল কেনা অব্যাহত রাখায় মস্কো বৈশ্বিক বাজারে নিজেদের শক্ত অবস্থান বজায় রেখেছে।

তবে সামগ্রিকভাবে জ্বালানি সরবরাহের এই শৃঙ্খল ভেঙে পড়া এবং দফায় দফায় দাম বৃদ্ধির ফলে বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার আশঙ্কা করছেন অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়