বাংলাদেশ ক্রিকেটে রদবদল: সাদা বলের নেতৃত্বে লিটন, টেস্টে বহাল শান্ত
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশ ক্রিকেটে আবারও ফিরল দুই অধিনায়কের মডেল। টি-টোয়েন্টির পর এবার ওয়ানডে দলেও নেতৃত্ব দেওয়া হয়েছে লিটন দাসকে। ফলে এখন থেকে সাদা বলের দুই সংস্করণ ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশ দলকে নেতৃত্ব দেবেন এই উইকেটকিপার-ব্যাটার। অন্যদিকে টেস্টে অধিনায়ক হিসেবে বহাল থাকছেন নাজমুল হোসেন শান্ত।
ওয়ানডে অধিনায়কের দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াতে হয়েছে মেহেদী হাসান মিরাজকে, যিনি গত এক বছরের বেশি সময় ধরে দলকে নেতৃত্ব দিয়ে আসছিলেন। সাদা বলের দুই সংস্করণে সহ-অধিনায়কের দায়িত্ব পেয়েছেন তাওহীদ হৃদয়, আর টেস্টে শান্তর ডেপুটি হিসেবে আগের মতোই থাকছেন মিরাজ। এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তিন ফরম্যাটে তিন অধিনায়কের নীতি থেকে সরে এসে আবারও লাল বল ও সাদা বলভিত্তিক নেতৃত্ব কাঠামোয় ফিরেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)।
বুধবার (২৯ জুলাই) মিরপুরের শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত বিসিবির পরিচালনা পর্ষদের সভায় এ সিদ্ধান্ত অনুমোদিত হয়।
সভা শেষে সংবাদ সম্মেলনে বোর্ড সভাপতি তামিম ইকবাল আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন নেতৃত্ব কাঠামোর ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, বোর্ডের বিশ্বাস, বাংলাদেশের ক্রিকেটের বর্তমান বাস্তবতায় দুই অধিনায়কের মডেলই সবচেয়ে কার্যকর। একজন সাদা বলের ক্রিকেটে এবং অন্যজন লাল বলের ক্রিকেটে পূর্ণ মনোযোগ দিতে পারবেন। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, খেলোয়াড় ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক সূচির চাপ বিবেচনায় রেখেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তামিম জানান, টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক হিসেবে লিটনের নেতৃত্বে বোর্ড সন্তুষ্ট। মাঠের নেতৃত্ব, কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, ড্রেসিংরুমে প্রভাব এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বিবেচনায় তাকেই ওয়ানডের দায়িত্বও দেওয়া হয়েছে। বোর্ডের মূল্যায়নে সাদা বলের দুই সংস্করণে একই অধিনায়ক থাকলে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সহজ হবে এবং দলও আরও স্থিতিশীল হবে। সেই কারণে লিটনের সঙ্গে সহ-অধিনায়ক হিসেবে তাওহীদ হৃদয়কে রাখা হয়েছে, যাতে ভবিষ্যতের নেতৃত্বও ধাপে ধাপে গড়ে তোলা যায়।
তবে অধিনায়কত্ব পরিবর্তনের অর্থ মিরাজের নেতৃত্বকে ব্যর্থ ঘোষণা করা নয় বলেও স্পষ্ট করেন বিসিবি সভাপতি। তার ভাষ্য, মিরাজ গত কয়েকটি সিরিজে দলকে ভালোভাবেই নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং পাঁচ সিরিজের মধ্যে চারটিতেই সাফল্য এসেছে। কিন্তু বোর্ডের মূল্যায়নে বর্তমানে বাংলাদেশ দলের জন্য মিরাজকে একজন পূর্ণাঙ্গ অলরাউন্ডার হিসেবে সর্বোচ্চ পারফরম্যান্সে দেখা বেশি জরুরি। সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাট হাতে অবদান রাখলেও বোলিংয়ে তার স্বাভাবিক ধার কিছুটা কমে এসেছে বলে মনে করছে বোর্ড। অধিনায়কের বাড়তি দায়িত্ব তার ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সে প্রভাব ফেলছে কি না, সেটিও আলোচনায় এসেছে। এ কারণেই দায়িত্ব পুনর্বিন্যাসের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানান তামিম।
তিনি আরও বলেন, বিষয়টি নিয়ে মিরাজের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা হয়েছে এবং তিনি বোর্ডের সিদ্ধান্তকে ইতিবাচকভাবেই গ্রহণ করেছেন।
আরও পড়ুন: জিম্বাবুয়ে ব্যর্থতা ভুলে অস্ট্রেলিয়া মিশনে টাইগাররা
মিরাজ ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে নাজমুল হোসেন শান্তর স্থলাভিষিক্ত হয়ে বাংলাদেশের ওয়ানডে অধিনায়ক হন। চলতি বছরের এপ্রিলে তাকে ২০২৭ ওয়ানডে বিশ্বকাপ পর্যন্ত নেতৃত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্তও নিয়েছিল তৎকালীন বোর্ড। কিন্তু মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে নেতৃত্বে বড় পরিবর্তন আনল বর্তমান বোর্ড। অধিনায়ক হিসেবে মিরাজ মোট ২৪টি ওয়ানডেতে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ জিতেছে ১০টি ম্যাচ, হেরেছে ১৩টি এবং একটি ম্যাচ পরিত্যক্ত হয়েছে। ঘরের মাঠে ওয়েস্ট ইন্ডিজ, নিউজিল্যান্ড, পাকিস্তান ও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজ জিতলেও বিদেশের মাটিতে দল প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি। ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও আফগানিস্তানের বিপক্ষে সিরিজ হার, আফগানিস্তানের কাছে হোয়াইটওয়াশ এবং সর্বশেষ জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ২-১ ব্যবধানে ওয়ানডে সিরিজ হার তার নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে। বিশেষ করে বিদেশের মাটিতে অধিনায়ক হিসেবে ১৩ ম্যাচে মাত্র দুটি জয় বোর্ডের মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
অন্যদিকে লিটন দাস এরই মধ্যে টি-টোয়েন্টি দলের অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পূর্ণকালীন ওয়ানডে অধিনায়ক হওয়ার আগে সাতটি ওয়ানডেতে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। এর মধ্যে তিনটিতে জয়, তিনটিতে হার এবং একটি ম্যাচ পরিত্যক্ত হয়েছে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, সাদা বলের ক্রিকেটে নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা এবং একই অধিনায়কের অধীনে সীমিত ওভারের দুই সংস্করণ পরিচালনার পরিকল্পনাই তাকে নতুন দায়িত্ব দেওয়ার পেছনে বড় কারণ হিসেবে দেখছে বোর্ড।
এই সিদ্ধান্তের ফলে বাংলাদেশের নেতৃত্ব কাঠামোয় নতুন ভারসাম্য তৈরি হলো। টেস্ট ক্রিকেটে নাজমুল হোসেন শান্ত লাল বলের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় মনোযোগ দেবেন, আর ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টিতে লিটন দাস নেতৃত্ব দেবেন সীমিত ওভারের ক্রিকেটে।
বোর্ডের প্রত্যাশা, এই বিভাজনের ফলে অধিনায়কদের ওপর চাপ কমবে, দলভিত্তিক পরিকল্পনা আরও সুসংগঠিত হবে এবং খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্সেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। একই সঙ্গে তাওহীদ হৃদয়কে সাদা বলের সহ-অধিনায়ক করায় ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির দিকেও নজর দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের সামনে আগামী এক বছরে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় সিরিজ এবং আইসিসির বড় আসর রয়েছে। সেই প্রস্তুতিকে সামনে রেখেই নেতৃত্বে এই পরিবর্তন আনা হয়েছে বলে বিসিবি সূত্র জানিয়েছে। বোর্ডের বিশ্বাস, লিটনের নেতৃত্বে সাদা বলের ক্রিকেটে ধারাবাহিকতা ফিরবে এবং মিরাজ অধিনায়কত্বের চাপমুক্ত হয়ে আবারও নিজের স্বাভাবিক অলরাউন্ড নৈপুণ্যে ফিরতে পারবেন। একই সঙ্গে লাল বলে শান্তর নেতৃত্ব অব্যাহত থাকায় টেস্ট দলের পরিকল্পনাতেও কোনো বিঘ্ন ঘটবে না। সব মিলিয়ে বিশ্বকাপকে সামনে রেখে বাংলাদেশ ক্রিকেটে এটি সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক সিদ্ধান্তগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








