এবার বিশ্বকাপ বর্জনের হুমকি ইউরোপের দেশগুলোর
ছবি: সংগৃহীত
বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রণ সংস্থা ফিফা এবং ইউরোপীয় ফুটবলের প্রধান সংস্থা উয়েফার মধ্যে নতুন করে চরম সংঘাতের আবহ তৈরি হয়েছে। ফিফার একটি সুদূরপ্রসারী ও উচ্চাভিলাষী বাণিজ্যিক পরিকল্পনাকে কেন্দ্র করে এই বিরোধের সূত্রপাত হয়েছে, যা বাস্তবায়িত হলে ফুটবলের ঐতিহ্য ও প্রশাসনিক কাঠামোতে বেসরকারি খাতের একচ্ছত্র প্রভাব ও বাণিজ্যিকীকরণ বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছে ইউরোপের প্রভাবশালী দেশগুলো।
এই পরিস্থিতিতে কেবল কূটনৈতিক বিরোধই নয়, বরং ফিফার প্রস্তাবিত মেগা টুর্নামেন্ট ও আসন্ন বিশ্বকাপ আসরগুলো বয়কটের মতো কঠোর পথ বেছে নেওয়ার কথাও বিবেচনা করছে ইউরোপের দেশগুলো।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফিফা বিশ্বজুড়ে তাদের ফুটবল সাম্রাজ্যের বাণিজ্যিক কার্যক্রম ঢেলে সাজানোর জন্য ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ (FFE) নামক একটি নতুন সহায়ক বা সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান গঠনের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এই নতুন কোম্পানির অধীনে ফিফার সমস্ত লাভজনক বাণিজ্যিক কার্যক্রম যেমন সম্প্রচার ও ডিজিটাল স্বত্ব, স্পন্সরশিপ, টিকিট বিক্রি, লাইসেন্সিং এবং পুরুষ, নারী ও যুব ফুটবলের সব আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার অপারেশনাল ডেলিভারি একত্রে পরিচালিত হবে।
বিশ্বখ্যাত আর্থিক প্রতিষ্ঠান জেপি মরগানের (J.P. Morgan) সহযোগিতায় এই পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
ফিফার লক্ষ্য হলো, নবগঠিত এই কোম্পানির সম্ভাব্য মূল্য প্রায় ২ হাজার কোটি (২০ বিলিয়ন) মার্কিন ডলার নির্ধারণ করে এর থেকে প্রায় ৪২০ কোটি (৪.২ বিলিয়ন) ডলারের সংখ্যালঘু বা মাইনরিটি শেয়ার বাইরের বা বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করা। এই বিনিয়োগের প্রক্রিয়ায় জোশ কুশনারের প্রতিষ্ঠিত প্রাইভেট ইনভেস্টমেন্ট ফার্ম থ্রাইভ এটার্নাল-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পৃক্ততার আলোচনা রয়েছে।
ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর দাবি, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে ফুটবলের বাণিজ্যিক সম্ভাবনাকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে এবং বিশ্বজুড়ে সদস্যদেশগুলোর ফুটবল উন্নয়নে পর্যাপ্ত অর্থের জোগান নিশ্চিত করা যাবে।
ফিফা সদস্যদেশগুলোর সমর্থন আদায়ের জন্য নতুন ফিফা ফাস্ট-ফরোয়ার্ড প্রোগ্রাম-এর আওতায় বড় অঙ্কের আর্থিক বরাদ্দের লোভনীয় প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ফিফার বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী ২০২৭-৩০ বাণিজ্যিক চক্রে প্রতিটি সদস্য ফেডারেশনকে ৮ মিলিয়ন ডলার দেওয়া হলেও, নতুন এই বাণিজ্যিক রূপরেখা বাস্তবায়িত হলে পরবর্তী চক্রগুলোতে তা বাড়িয়ে যথাক্রমে ২০ মিলিয়ন, ২২ মিলিয়ন এবং ২৪ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে ফিফা বারবার এটি স্পষ্ট করার চেষ্টা করছে যে, নবগঠিত এফএফই কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণভাবে ফিফার হাতেই থাকবে এবং ফুটবলের মূল নিয়ন্ত্রণ, গভর্ন্যান্স, ম্যাচ ক্যালেন্ডার বা ক্রীড়া সংক্রান্ত নীতিমালার ওপর কোনো বাইরের হস্তক্ষেপ থাকবে না। তাছাড়া সদস্য ফেডারেশনগুলো এই আর্থিক কার্যক্রমে স্বেচ্ছায় যুক্ত হতে পারবে বলেও জানানো হয়েছে।
তা সত্ত্বেও, সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে অনুষ্ঠিত ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে টিকিট ও হসপিটালিটি থেকে রেকর্ড প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার আয় করার পর ফিফার এই নতুন বাণিজ্যিক আগ্রাসনকে অনেকেই বারতি মুনাফা লোটার কৌশল হিসেবে দেখছেন। বিশেষ করে, ২০৩০ সালের বিশ্বকাপ যৌথভাবে স্পেন, পর্তুগাল ও মরক্কোতে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকায় এই নতুন রূপরেখা টুর্নামেন্টের সার্বিক প্রস্তুতি ও স্থিতিশীলতাকে অনিশ্চয়তার মুখে ফেলে দিয়েছে।
আরও পড়ুন: দলীয় শিরোপা ছাড়াই কি ব্যালন ডিঅর জিতবেন এমবাপ্পে?
ফিফার এই আকস্মিক ও একতরফা ঘোষণার পরই তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা।
উয়েফার মতে, ফিফা এমন একটি স্পর্শকাতর ও বিপজ্জনক সীমা অতিক্রম করেছে, যা কোনো বৈশ্বিক ক্রীড়া নিয়ন্ত্রক সংস্থার কস্মিনকালেও করা উচিত নয়। এক অত্যন্ত কড়া ও মারমুখী বিবৃতিতে উয়েফা সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, ফুটবলের আত্মা, ঐতিহ্য এবং এর শাসনব্যবস্থা কোনো বেচাকেনার বা ব্যবসার বস্তু হতে পারে না।
বিশেষ করে, এই বিপুল পরিমাণ আর্থিক লেনদেনের পেছনে কারা গোপনে লাভবান হচ্ছে এবং এর দীর্ঘমেয়াদী স্বচ্ছতা কোথায় তা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন তুলেছে ইউরোপীয় সংস্থাটি।
উয়েফার ভাষ্যমতে, ফুটবল পৃথিবীর কারও কোনো ব্যক্তিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক সম্পত্তি নয়, তাই এটি যত্রতত্র বিক্রি করে দেয়ার একচ্ছত্র অধিকার ফিফার নেই। উয়েফা ছাড়াও ইংলিশ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এফএ) এবং কনকাকাফসহ বিভিন্ন প্রভাবশালী সংস্থা এই পরিকল্পনা সম্পর্কে আগে থেকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রাখা হয়েছিল বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে।
এমনকি যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যামও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (পূর্বে টুইটার) এই পরিকল্পনার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় লিখেছেন, ফুটবল কোনো বিনিয়োগকারীর সম্পত্তি নয়; এটি সেই লাখো সমর্থকের, যারা মাঠে গিয়ে নিজেদের দলকে সমর্থন জানান।
এই নজিরবিহীন ক্ষমতার দ্বন্দ্বে পরিস্থিতি সামাল দিতে উয়েফা চলতি সপ্তাহেই তাদের অধীনস্থ ৫৫টি সদস্য দেশের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনকে নিয়ে একটি জরুরি ভার্চ্যুয়াল বৈঠক আহ্বান করেছে।
আন্তর্জাতিক ক্রীড়া মাধ্যম ইএসপিএন এবং স্কাই স্পোর্টসের তথ্য অনুযায়ী, এই জরুরি বৈঠকে ফিফার পরিকল্পনাকে রুখে দেওয়ার জন্য যৌথ কৌশল নির্ধারণ করা হবে।
পরিস্থিতি এতটাই জটিল যে, প্রয়োজনে ফিফার প্রধান টুর্নামেন্টগুলো বিশেষ করে ক্লাব বিশ্বকাপ কিংবা ভবিষ্যতের বিশ্বকাপ আসরগুলো বয়কটের মতো চরম ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে আলোচনায় রাখা হয়েছে। এর আগেও ২০২১ সালে ফিফা যখন প্রতি দুই বছর অন্তর বিশ্বকাপ আয়োজনের বিতর্কিত পরিকল্পনা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল, সেবারও উয়েফার পক্ষ থেকে প্রবল বয়কটের হুশিয়ারি আসার পর ফিফা সেই পরিকল্পনা থেকে পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিল। বর্তমান পরিস্থিতিতেও সেই একই পুরনো কৌশল বা হাতিয়ার ব্যবহার করে জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর প্রশাসনকে চাপে ফেলতে বদ্ধপরিকর ইউরোপের দেশগুলো।
সব মিলিয়ে, ফিফার এই বহু কোটি ডলারের বাণিজ্যিক সাম্রাজ্য বিস্তারের উদ্যোগ বিশ্ব ফুটবলকে এক গভীর শাসনতান্ত্রিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। উয়েফার আসন্ন এই জরুরি বৈঠকে নেওয়া সিদ্ধান্তই নির্ধারিত করে দেবে যে, ফিফা ও উয়েফার মধ্যকার এই স্নায়ুযুদ্ধ কেবল সুপ্ত কূটনৈতিক বিরোধে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি তা বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসর ও টুর্নামেন্টগুলোর ভবিষ্যৎকে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








