জিদানের হাতে ফ্রান্সের দায়িত্ব
ফ্রান্সের নতুন কোচ জিনেদিন জিদান। ছবি: সংগৃহীত
অবশেষে সমস্ত জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে ফরাসি ফুটবলের ডাগআউটে শুরু হলো এক নতুন ও রোমাঞ্চকর অধ্যায়। দীর্ঘ ১৪ বছরের দিদিয়ের দেশম যুগের সফল সমাপ্তির পর, ফ্রান্স জাতীয় ফুটবল দলের নতুন প্রধান কোচ হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন দেশটির সর্বকালের সেরা ফুটবলারদের একজন জিনেদিন জিদান।
ফরাসি ফুটবল ফেডারেশন (এফএফএফ)-এর সভাপতি ফিলিপ দিয়ালো প্যারিসে ফেডারেশনের সদর দপ্তরে এক সংবাদ সম্মেলনে এই যুগান্তকারী নিয়োগের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন। ফেডারেশনের সঙ্গে জিদানের চুক্তিটি ২০৩০ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হবে, যার ফলে আগামী চার বছর এমবাপ্পে-ডেম্বেলদের ডাগআউটের সর্বেসর্বা হিসেবে দেখা যাবে এই ফরাসি মাস্টারমাইন্ডকে।
২০১২ সাল থেকে টানা এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ফরাসি জাতীয় দলকে অত্যন্ত সফলভাবে কোচিং করিয়েছেন দিদিয়ে দেশম। তার সুদীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য এই শাসনামলে ২০১৮ সালে রাশিয়া বিশ্বকাপে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বজয়ের স্বাদ পায় ফরাসিরা। এছাড়া ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালে দলকে রানার্সআপ করা এবং ২০১৬ সালের ইউরো কাপের ফাইনালে তোলার ক্ষেত্রেও তার অবদান অনস্বীকার্য। তবে সদ্য সমাপ্ত ২০২৬ বিশ্বকাপে দল সেমিফাইনালে স্পেনের কাছে পরাজিত হওয়ার পর এবং পরবর্তী সময়ে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে হারের মধ্য দিয়ে দেশম তার কোচিং অধ্যায়ের ইতি টানেন। টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই দেশম ঘোষণা দিয়েছিলেন যে ফলাফল যাই হোক না কেন, এটিই হবে তার শেষ মিশন।
তার উত্তরসূরি হিসেবে জিদানের নাম বাতাসে ভাসছিল বহু দিন ধরেই। ২০২১ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে স্প্যানিশ জায়ান্ট রিয়াল মাদ্রিদের ডাগআউট ছাড়ার পর থেকে দীর্ঘদিন যাবৎ পেশাদার কোচিংয়ের বাইরে ছিলেন ৫৪ বছর বয়সী এই কোচ। ক্লাব ফুটবলে রিয়ালের হয়ে তার অবিশ্বাস্য সাফল্যের খতিয়ান আধুনিক ফুটবলে বিরল। ২০১৬ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত টানা তিন মৌসুমে রিয়াল মাদ্রিদকে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতিয়ে ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন তিনি।
এছাড়া দুই দফায় সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে দায়িত্ব পালনকালে দুটি লা লিগা, দুটি উয়েফা সুপার কাপ, দুটি ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপ এবং স্প্যানিশ সুপার কাপের শিরোপাসহ মোট ১১টি বড় ট্রফি জয় করেন।
ফরাসি সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, রিয়াল ছাড়ার পর বিশ্বের বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় ক্লাব ও জাতীয় দল থেকে মোটা অঙ্কের প্রস্তাব পেলেও জাতীয় দলের ডাগআউটে বসার সুপ্ত বাসনায় সেসব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন জিদান।
দায়িত্ব নেওয়ার পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় জিনেদিন জিদান ফরাসি ফুটবল ফেডারেশনের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তার ভবিষ্যৎ উচ্চাকাঙ্ক্ষার কথা জানান।
আরও পড়ুন: মেসি-এমবাপ্পেকে পেছনে ফেলে বিশ্বকাপের সেরা গোলের পুরস্কার জিতলেন কাবরাল
তিনি বলেন, ফ্রান্স জাতীয় দলের চেয়ে বড় আর কিছু নেই এবং এই দলের দায়িত্ব নেওয়া তার জীবনের অন্যতম বড় গর্ব ও আনন্দের বিষয়। একই সঙ্গে এটি একটি বিশাল দায়িত্ব বলেও উল্লেখ করেন তিনি। জিদানের মতে, রিয়ালের ডাগআউটের অভিজ্ঞতা এবং বর্তমান প্রজন্মের বিশ্বমানের ফুটবলারদের স্বাধীনভাবে নিজের সেরাটা নিংড়ে দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়াই হবে তার মূল কৌশল। কিলিয়ান এমবাপ্পে, ওসমান ডেম্বেল ও মাইকেল ওলিসেসহ বর্তমান স্কোয়াডের তরুণ ও অভিজ্ঞ তারকাদের নিয়ে একটি অপ্রতিরোধ্য দল গড়ে তোলাই এখন তার প্রাথমিক লক্ষ্য।
কোচিংয়ের পাশাপাশি খেলোয়াড় হিসেবেও ফরাসি ফুটবলের ইতিহাসে জিদানের অবদান স্বর্ণাক্ষরে লেখা। ১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপে ঘরের মাঠে ফাইনালে ব্রাজিলের বিপক্ষে ৩-০ গোলের ঐতিহাসিক জয়ে দুটি গোল করে দলকে প্রথম বিশ্বসেরার মুকুট এনে দিয়েছিলেন তিনি। এর দুই বছর পর ২০০০ সালে নেদারল্যান্ডস ও বেলজিয়ামের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপে ফ্রান্সকে শিরোপা জেতাতে প্রধান ভূমিকা পালন করেন এবং সেই বছরই মর্যাদাপূর্ণ ব্যালন ডিঅর অর্জন করেন। দেশের হয়ে ১০৮টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে ৩১টি গোল করা এই কিংবদন্তি প্লেমেকারের ক্যারিয়ারের শেষ মুহূর্তটিও ছিল আলোচিত। ২০০৬ জার্মানি বিশ্বকাপ ফাইনালে ইতালির বিপক্ষে প্যানেঙ্কা স্টাইলে গোল করার পর অতিরিক্ত সময়ে মার্কো মাতেরাজ্জিকে মাথা দিয়ে আঘাত করে লাল কার্ড দেখার ঘটনাটি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত ও স্মরণীয় অধ্যায়। মজার ব্যাপার হলো, জিদানের এই দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে ফ্রান্স জাতীয় দলে আরও এক ১৯৯৮ বিশ্বকাপজয়ী সতীর্থের কোচ হিসেবে পদার্পণ ঘটল। এর আগে লরেন ব্লাঁ (২০১০-২০১২) এবং দিদিয়ে দেশম (২০১২-২০২৬) এই পদে দায়িত্ব পালন করেছেন।
কোচিং ক্যারিয়ারের এই নতুন ধাপে জিদানের সামনে হাতছানি দিচ্ছে এক বিরল ইতিহাস গড়ার সুবর্ণ সুযোগ। ফুটবল ইতিহাসে এখন পর্যন্ত খেলোয়াড় এবং কোচ উভয় ভূমিকায় বিশ্বকাপ জয়ের দুর্লভ কীর্তি রয়েছে কেবল তিন জনের: ব্রাজিলের মারিও জাগালো, জার্মানির ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার এবং ফ্রান্সেরই বিদায়ী কোচ দিদিয়ের দেশম। জিদান যদি ২০৩০ সালের মধ্যে ফ্রান্সকে বিশ্বকাপ এনে দিতে পারেন, তবে চতুর্থ ব্যক্তি হিসেবে এই এলিট ক্লাবে নাম লেখাবেন তিনি।
খুব বেশি সময় বিশ্রামের সুযোগ পাচ্ছেন না নতুন কোচ। আগামী সেপ্টেম্বরেই উয়েফা নেশনস লিগের কঠিন ম্যাচ দিয়ে শুরু হতে যাচ্ছে জিদান যুগের প্রথম অ্যাসাইনমেন্ট।
নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী, আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর নেশন্স লিগের ম্যাচে তুরস্কের মাঠে তাদের আতিথ্য নেবে ফরাসিরা। এর ঠিক তিন দিন পর ২৮ সেপ্টেম্বর বেলজিয়ামের বিরুদ্ধে আরেকটি কঠিন অ্যাওয়ে ম্যাচ খেলবে দলটি। এরপর ঘরের মাঠে ফেরার পালা; আগামী ২ অক্টোবর ঐতিহাসিক স্তাদে দে ফ্রান্সে ইতালিকে আতিথ্য জানাবে জিদানের শিষ্যরা। ঘরোয়া ও আন্তর্জাতিক ফুটবলের এই বড় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে ফরাসি ফুটবলপ্রেমীরা এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন মাঠের ফুটবলে জিজুর জাদুকরী স্পর্শ দেখার জন্য।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








