নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৬:৫৩, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জ্বালানি সংকটের মধ্যে লংমার্চ নিয়ে রিজভীর অভিযোগ

জ্বালানি সংকটের মধ্যে লংমার্চ নিয়ে রিজভীর অভিযোগ

ছবি: সংগৃহীত

জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয়, রংপুর অভিমুখী লংমার্চ, দেশের বিভিন্ন স্থানে অগ্নিসংযোগ ও ককটেল বিস্ফোরণ এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে একাধিক মন্তব্য করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক ও শিল্প মন্ত্রণালয়বিষয়ক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী। 

মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট আয়োজিত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সরকার ও বিরোধী দলের ভূমিকা শীর্ষক আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন তিনি। 

সভায় রিজভী দাবি করেন, জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন আন্দোলনে জামায়াতে ইসলামীর কার্যকর ভূমিকা নেই এবং জনগণের সঙ্গে বারবার প্রতারণার অভিযোগের কারণে দলটি চূড়ান্তভাবে জনআস্থা অর্জন করতে পারেনি। একই সঙ্গে দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক কর্মসূচি, নাশকতার ঘটনা এবং জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে বিরোধী দলগুলোর কর্মসূচির ধরন নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।

জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক ভূমিকা প্রসঙ্গে রিজভী বলেন, দেশের জনস্বার্থ, জাতীয়তাবাদী আন্দোলন এবং জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের জন্য অতীতে যেসব আন্দোলন হয়েছে, তার প্রত্যেকটির বিরোধিতা করেছে জামায়াত। তার ভাষ্য, জনগণের সঙ্গে বারবার প্রতারণার কারণে দলটি কখনো জনগণের চূড়ান্ত আস্থা অর্জন করতে পারেনি। 

রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনে ভাঙচুরের প্রসঙ্গ টেনে জামায়াতের উদ্দেশে তিনি বলেন, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কর্মসূচির পাশাপাশি পরিকল্পিত সন্ত্রাস ও সহিংসতার বিরুদ্ধেও প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ কর্মসূচি দেওয়া উচিত। তবে রাজশাহী রেলস্টেশনে সাম্প্রতিক ভাঙচুরের ঘটনায় প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে ঘটনাটির সূত্রপাত হিসেবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগ এবং পরবর্তী শিক্ষার্থী বিক্ষোভের কথা উঠে এসেছে। ওই ঘটনায় রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন এবং চার কর্মীকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে; অবরোধের কারণে একটি ট্রেনের যাত্রাও বাতিল হয়েছিল।

দেশের বিভিন্ন স্থানে বাস ও ট্রেনে আগুন এবং ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনাও আলোচনায় আনেন রিজভী। তিনি বলেন, রাজধানীর মধ্যবাড্ডা, উত্তরা, মিরপুর ও কাফরুল এলাকায় বাসে আগুন, ট্রেনে আগুন এবং হাইকোর্ট ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে ককটেল বিস্ফোরণের মতো ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার সঙ্গে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের যোগসূত্র রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। একই সঙ্গে শুধু পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাই এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত কি না, নাকি বিরোধী দলের ভেতরের অন্য পক্ষও জড়িত সে প্রশ্ন তোলেন তিনি। 

২০ সেপ্টেম্বর হাইকোর্টের সামনে ককটেল বিস্ফোরণের একটি ঘটনা নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে; সেখানে ঘটনাটি আওয়ামী লীগের ডাকা লকডাউন কর্মসূচির সময় ঘটেছে বলে উল্লেখ করা হয়। রিজভী দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে যারা লংমার্চসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছেন, তাদের এসব সহিংসতা ও নাশকতার বিরুদ্ধেও প্রতিবাদ কর্মসূচি দেওয়ার আহ্বান জানান।

রংপুর অভিমুখী লংমার্চ নিয়েও বিরোধী দলগুলোর কর্মসূচির সমালোচনা করেন রিজভী। তার দাবি, জ্বালানি সংকটের মধ্যে প্রায় সাড়ে চারশ গাড়ি নিয়ে ঢাকার বাইরে লংমার্চ করা হয়েছে এবং পথে কিছু গাড়ি টোলও পরিশোধ করেনি। 

তিনি প্রশ্ন তোলেন, যখন দেশে জ্বালানি সংকট চলছে, তখন এত বিপুলসংখ্যক গাড়ি নিয়ে দীর্ঘপথে যাতায়াতের কারণে যে জ্বালানি ব্যয় হয়েছে, তা কীভাবে সংকটের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ১৯ সেপ্টেম্বর জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলের রংপুর অভিমুখী লংমার্চের বহর যমুনা সেতু অতিক্রম করার সময় প্রায় ৪৩০ থেকে ৪৫০টি গাড়ি ছিল বলে সেতুর টোল প্লাজা সূত্রের বরাতে একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। রিজভীর অভিযোগের বিষয়ে গাড়িগুলোর টোল না দেওয়ার দাবির স্বাধীন কোনো সরকারি নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি; ফলে বিষয়টি তার বক্তব্য হিসেবেই উপস্থাপন করা হচ্ছে।

আরও পড়ুন: তেলের দাম বাড়ানোর পরও প্রতি লিটারে ১৪ টাকা ভর্তুকি দিতে হবে: রিজভী

আলোচনার বড় অংশজুড়ে ছিল জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় ও সরকারের লোকসানের হিসাব। রিজভী বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার সময় প্রতি লিটার ডিজেল কিনতে সরকারের প্রায় ২০৫ টাকা ব্যয় হলেও দেশে দীর্ঘদিন ১১৫ টাকা দরে তা বিক্রি করা হয়েছে। ফলে লিটারপ্রতি প্রায় ৯০ টাকা লোকসান হয়েছে। সম্প্রতি ডিজেলের দাম ২০ টাকা বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা করা হলেও সেই ঘাটতি পুরোপুরি কাটেনি; এখনো প্রতি লিটারে সরকারের প্রায় ৭০ টাকা লোকসান হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি। ২১ সেপ্টেম্বর নয়াপল্টনে বিএনপির সংবাদ সম্মেলনেও একই হিসাব দিয়েছিলেন রিজভী। সে সময় প্রকাশিত প্রতিবেদনে তিনি দেশে বছরে প্রায় ৭০ লাখ মেট্রিক টন জ্বালানি তেল ব্যবহারের কথা এবং এর একটি বড় অংশ ডিজেল বলে উল্লেখ করেছিলেন।

জ্বালানি তেলের দাম নিয়ে রিজভীর বক্তব্যের পাশাপাশি সরকারের পক্ষ থেকেও মূল্য সমন্বয়ের কারণ ব্যাখ্যা করা হয়েছে। জ্বালানি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। 

সর্বশেষ সমন্বয়ে ডিজেলের দাম ২০ টাকা বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা করা হয়েছে। একই সময়ে সরকারের দেওয়া তুলনামূলক হিসাবে কলকাতায় ডিজেলের দাম প্রায় ১৩৪ টাকা ৭৬ পয়সা, মিয়ানমারে ১৬৪ টাকা ৮৩ পয়সা, নেপালে ১৬১ টাকা ২৪ পয়সা এবং শ্রীলঙ্কায় ১৭৯ টাকা ৪২ পয়সা উল্লেখ করা হয়েছে। সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, দেশের বাজারে জ্বালানির দাম তুলনামূলক কম থাকায় সীমান্তপথে পাচারের ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল এবং মূল্য সমন্বয়ের অন্যতম কারণ ছিল সেই ঝুঁকি কমানো।

বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের ডিজেলের দামের তুলনাও তুলে ধরে রিজভী বলেন, নেপালে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম প্রায় ১৬১ টাকা, মিয়ানমারে ১৬৪ টাকা, শ্রীলঙ্কায় ১৭৯ টাকা ৪২ পয়সা এবং ফিলিপাইনে প্রায় ১৮৮ টাকা ৫০ পয়সা; ভারতেও দাম ১৩৪ টাকার বেশি। তার বক্তব্য, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়ে যাওয়ার সময়ও বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ১১৫ টাকা দরে ডিজেল বিক্রি করা হয়েছে এবং ২০ টাকা দাম বাড়ানোর পরও সরকারকে লিটারপ্রতি প্রায় ৭০ টাকা লোকসান বহন করতে হচ্ছে। তবে বিভিন্ন প্রতিবেদনে রিজভীর বক্তব্যে ডিজেলের আন্তর্জাতিক ক্রয়মূল্য কখনো ২০৫ টাকা, আবার কোথাও ২৫০ টাকা হিসেবে উদ্ধৃত হয়েছে। তাই এ দুটি সংখ্যাকে একই হিসাব হিসেবে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই; তার মূল বক্তব্য ছিল, মূল্য সমন্বয়ের পরও সরকারকে প্রতি লিটারে উল্লেখযোগ্য ঘাটতি বহন করতে হচ্ছে।

রাজনৈতিক পরিবেশ নিয়ে রিজভী বলেন, অপপ্রচার চালিয়ে সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত করা যাবে না এবং জনমনে ধোঁয়াশা তৈরি করতেই বিরোধী দল বিভিন্ন কর্মসূচি দিচ্ছে। 

তার দাবি, বিরোধী দলের কর্মসূচিতে কোনো ধরনের বাধা না থাকা দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ থাকার প্রমাণ। এর আগে ২১ সেপ্টেম্বরও তিনি অভিযোগ করেছিলেন, জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত সরকারের জনস্বার্থে নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ থেকে মানুষের দৃষ্টি সরিয়ে দিতে পরিকল্পিতভাবে অপপ্রচার ও অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা চলছে।

জ্বালানি সংকটের সঙ্গে রাজনৈতিক কর্মসূচির সম্পর্ক টেনে রিজভী আরও বলেন, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি বিবেচনা না করে সরকারের ওপর সব দায় চাপিয়ে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, দেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপর আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার প্রভাব রয়েছে এবং এমন পরিস্থিতিতে জ্বালানি ব্যবহারের প্রতিটি ক্ষেত্র বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। তিনি রংপুর অভিমুখী লংমার্চে ব্যবহৃত বিপুলসংখ্যক গাড়ির জ্বালানি ব্যয়ের প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেন, সংকটের সময় এই অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যয়ও জাতীয়ভাবে সাশ্রয় করা সম্ভব ছিল।

জাতীয়তাবাদী সমমনা জোটের ওই আলোচনা সভায় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খান, জোটের প্রধান সমন্বয়কারী ব্যারিস্টার নাসিম খান এবং মুখপাত্র এস এম শাহাদাতসহ অন্যরা বক্তব্য দেন। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক কর্মসূচি, জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয়, দ্রব্যমূল্য, চাঁদাবাজি, দুর্নীতি এবং বিভিন্ন স্থানে সহিংসতার অভিযোগ এসব বিষয়কে কেন্দ্র করেই সভায় সরকার ও বিরোধী দলের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হয়।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়