প্রধানমন্ত্রীকে সভাপতি করে পার্বত্য চট্টগ্রাম জাতীয় কমিটি পুনর্গঠন
ফাইল ছবি
পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা, উন্নয়ন ও আন্তঃসংস্থা কার্যক্রমে সমন্বয় জোরদার করতে উচ্চপর্যায়ের তিনটি কমিটি গঠন করেছে সরকার। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সভাপতি করে ১৯ সদস্যের পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক জাতীয় কমিটি, স্বরাষ্ট্রসচিবকে সভাপতি করে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক নির্বাহী কমিটি এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণ কমিটির চেয়ারম্যানকে সভাপতি করে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক পরামর্শক কমিটি গঠন করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) রাতে এ-সংক্রান্ত পৃথক প্রজ্ঞাপন জারি করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। পরদিন বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রজ্ঞাপনের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশিত হয়।
সরকারের নতুন কাঠামোয় প্রধানমন্ত্রীকে সভাপতি করে গঠিত জাতীয় কমিটিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জাতীয় পর্যায়ে অগ্রাধিকার নির্ধারণ, বিভিন্ন উদ্যোগের আন্তঃসংস্থা বাস্তবায়ন তদারকি এবং নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কার্যপরিধি নির্ধারণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে জাতীয় কর্মকৌশল চূড়ান্ত করা এবং তা বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে এই কমিটিকে। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে নীতি নির্ধারণ, নিরাপত্তা সমন্বয় ও উন্নয়ন কার্যক্রমের মধ্যে একটি কেন্দ্রীয় সমন্বয় কাঠামো তৈরির উদ্যোগ হিসেবে নতুন এই কমিটিকে দেখা হচ্ছে।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, জাতীয় কমিটির সদস্য হিসেবে রয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী, পররাষ্ট্র মন্ত্রী, ভূমি মন্ত্রী, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী। এর বাইরে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী-১ এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীকেও সদস্য করা হয়েছে। কমিটির প্রধান সমন্বয়কের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের উপদেষ্টাকে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, তিন পার্বত্য জেলা রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার এবং জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) মহাপরিচালকও কমিটির সদস্য হিসেবে থাকছেন। প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) মহাপরিচালক সদস্যসচিবের দায়িত্ব পালন করবেন।
জাতীয় কমিটির দায়িত্বের মধ্যে শুধু নীতিগত অগ্রাধিকার নির্ধারণ নয়, বরং পার্বত্য চট্টগ্রাম-সংক্রান্ত বিভিন্ন কার্যক্রমের বাস্তবায়ন পরিস্থিতি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যয়-ব্যবস্থাপনাও তদারকির বিষয় রয়েছে। একই সঙ্গে অঞ্চলে দায়িত্ব পালনকারী বিভিন্ন নিরাপত্তা বাহিনী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার কার্যপরিধি ও কর্মক্ষেত্র নির্ধারণে কমিটি ভূমিকা রাখবে। প্রয়োজন অনুযায়ী সশস্ত্র বাহিনী, নিরাপত্তা বাহিনী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা অন্য কোনো সরকারি সংস্থার প্রধান, কর্মকর্তা কিংবা প্রয়োজনীয় ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কমিটিতে সদস্য বা সহায়তাদানকারী কর্মকর্তা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগও রাখা হয়েছে।
কমিটির সচিবালয় পরিচালনার দায়িত্বও প্রজ্ঞাপনে নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ডিজিএফআই কমিটির সচিবালয়ের জন্য প্রয়োজনীয় জনবল ও অবকাঠামোগত সুবিধা দেবে। তবে কমিটির সিদ্ধান্ত এবং সভাপতির নির্দেশক্রমে পরবর্তী সময়ে অন্য কোনো গোয়েন্দা সংস্থা, নিরাপত্তা বাহিনী বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে নির্দিষ্ট মেয়াদে সচিবালয়ের দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে।
আরও পড়ুন: কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্র গঠনে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর
জাতীয় কমিটির পাশাপাশি গঠিত নির্বাহী কমিটিকে মূলত মাঠপর্যায়ে নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা ও বাস্তবায়ন-সংক্রান্ত কর্মকৌশল প্রণয়ন এবং জাতীয় কমিটির সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে কার্যকর ভূমিকার জন্য রাখা হয়েছে। এই কমিটির সদস্যদের মধ্যে ভূমি, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব, পুলিশ মহাপরিদর্শক, এনএসআই মহাপরিচালক, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের মহাপরিচালক, বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর মহাপরিচালক, ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি, চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার, পুলিশের বিশেষ শাখার অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের অপারেশনস ও পরিকল্পনা পরিদপ্তরের মহাপরিচালক এবং এনএসআইয়ের সীমান্ত ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক পরিচালক রয়েছেন। এই কমিটিতে ডিজিএফআই মহাপরিচালক প্রধান সমন্বয়ক এবং সোশ্যাল স্ট্যাবিলিটি ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর পরিচালক সদস্যসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
নির্বাহী কমিটিকে পার্বত্য চট্টগ্রামে সন্ত্রাস ও বিচ্ছিন্নতাবাদ দমন, সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখা এবং অঞ্চলের সব সম্প্রদায়ের জীবনমান উন্নয়নে জাতীয় কর্মকৌশল প্রণয়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে টেকসই নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিদ্যমান আইন, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির শর্ত এবং সংশ্লিষ্ট বিধি-বিধান পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সংশোধন, সংস্কার কিংবা নতুন আইন ও বিধি প্রণয়নের সুপারিশ করার বিষয়টিও এই কমিটির কার্যপরিধিতে রাখা হয়েছে। নির্বাহী কমিটিকে এসব বিষয়ে আগামী দুই মাসের মধ্যে জাতীয় কমিটির কাছে সুপারিশ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
অন্যদিকে, পার্বত্য চট্টগ্রাম-সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে অভিজ্ঞতা ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মতামতকে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যুক্ত করার জন্য গঠন করা হয়েছে পরামর্শক কমিটি। এতে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের চেয়ারম্যান, ভারত প্রত্যাগত পাহাড়ি শরণার্থী প্রত্যাবাসন ও পুনর্বাসন এবং অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু নির্দিষ্টকরণ ও পুনর্বাসনবিষয়ক টাস্কফোর্সের চেয়ারম্যান, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যানের প্রতিনিধি রয়েছেন। তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানদেরও এই কমিটিতে সদস্য করা হয়েছে। এই কমিটিকে উন্নয়ন, নিরাপত্তা, সন্ত্রাস দমন ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় নির্বাহী কমিটির কাছে সুপারিশ দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এবং এ জন্য দুই মাসের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।
সরকারের এই উদ্যোগের পেছনে পার্বত্য চট্টগ্রামের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক, প্রশাসনিক, নিরাপত্তা ও উন্নয়ন-সংক্রান্ত জটিলতার প্রেক্ষাপট রয়েছে। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর তৎকালীন সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ওই চুক্তির বাস্তবায়ন কাঠামোর অংশ হিসেবে পরবর্তীতে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ গঠিত হয় এবং ১৯৯৯ সালের ২৭ মে প্রতিষ্ঠানটির আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, আঞ্চলিক পরিষদের অন্যতম দায়িত্ব হচ্ছে তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর সার্বিক তত্ত্বাবধান ও সমন্বয় করা।
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির বাস্তবায়নকে কেন্দ্র করে ভূমি বিরোধ, প্রত্যাগত শরণার্থী ও অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু পুনর্বাসন, স্থানীয় সরকার ও আঞ্চলিক পরিষদের ক্ষমতা, নিরাপত্তা এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ড দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় রয়েছে। এ কারণে নতুন তিন স্তরের কমিটি গঠনের মাধ্যমে সরকার একদিকে জাতীয় পর্যায়ে নীতিনির্ধারণ ও অগ্রাধিকার নির্ধারণ, অন্যদিকে মাঠপর্যায়ে নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক বাস্তবায়ন এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মতামত গ্রহণ এই তিনটি বিষয়কে পৃথক কাঠামোর আওতায় আনতে চেয়েছে বলে প্রজ্ঞাপনের কার্যপরিধি থেকে প্রতীয়মান হয়।
নতুন জাতীয় কমিটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এতে রাজনৈতিক নেতৃত্বের পাশাপাশি অর্থ, স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র, ভূমি, আইন ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিত্ব রাখা হয়েছে। একই কাঠামোয় মন্ত্রিপরিষদ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ এবং জাতীয় ও সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে উন্নয়ন, ভূমি, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা, সীমান্ত নিরাপত্তা ও জাতীয় নিরাপত্তার মতো পরস্পরসম্পর্কিত বিষয়গুলোকে একই নীতিনির্ধারণী প্ল্যাটফর্মে সমন্বয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, নতুন কাঠামো কার্যকর হওয়ার পর পার্বত্য চট্টগ্রাম-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও কর্মকৌশল নির্ধারণে জাতীয় কমিটি সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী স্তরে কাজ করবে, নির্বাহী কমিটি মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়ন ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত বিষয় এগিয়ে নেবে এবং পরামর্শক কমিটি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও অভিজ্ঞ মহলের মতামত ও সুপারিশ নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় যুক্ত করবে। প্রয়োজন অনুযায়ী তিন কমিটিই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বা ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য যুক্ত করতে পারবে। এর ফলে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে সরকারের নতুন কাঠামোটি শুধু একটি কমিটি গঠনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে নীতি নির্ধারণ, বাস্তবায়ন ও পরামর্শ তিন স্তরে বিস্তৃত একটি সমন্বিত ব্যবস্থায় রূপ পেয়েছে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








