চীনের সঙ্গে গভীর শিল্প অংশীদারিত্ব চায় বাংলাদেশ
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে কূটনীতি ও বাণিজ্য থেকে গভীরতর শিল্প অংশীদারিত্বে রূপান্তরের লক্ষ্য নিয়ে বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ফোরাম বা ইনভেস্ট বাংলাদেশ শীর্ষক এক গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলন।
বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) স্থানীয় সময় সকাল ১০টা ৩০ মিনিটে বেইজিংয়ের ঐতিহাসিক দিয়াওইউতাই স্টেট গেস্ট হাউসে আয়োজিত এই সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বাংলাদেশের বিনিয়োগ সম্ভাবনাকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরতে এবং চীনা উদ্যোক্তাদের বাংলাদেশে বিনিয়োগে আকৃষ্ট করতে এই আয়োজনটি ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
সম্মেলনের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীন সরকার ও জনগণের উষ্ণ আতিথেয়তার ভূয়সী প্রশংসা করেন। একই সঙ্গে, অনুষ্ঠানের প্রস্তুতির জন্য সিসিপিআইটি (CCPIT) দলের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান এবং ব্যস্ততার মধ্যেও সেমিনারে অংশ নেওয়ায় সিসিপিআইটি চেয়ারম্যান রেন হংবিনকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। নিজের বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ ও চীনের ঐতিহাসিক সম্পর্কের ভিত্তি স্থাপনে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সেই সম্পর্ককে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অবদানের কথা শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন।
তিনি বলেন, পারস্পরিক বিশ্বাস, সম্মান এবং বাস্তবধর্মী সহযোগিতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এই সম্পর্ক এখন সময়ের প্রয়োজনে শিল্পখাতে বিস্তৃত অংশীদারিত্বের নতুন যুগে প্রবেশ করেছে।
বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনে বর্তমান সরকারের দৃঢ় সংকল্পের কথা পুনর্ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ব্যবসার জন্য উন্মুক্ত এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত।
তিনি স্বীকার করেন যে, পূর্ববর্তী সরকারের আমলে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে কিছু প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছিল, তবে বর্তমান সরকার সেগুলো নিরসনে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
চীনের উৎপাদন ব্যবস্থার কিছু অংশ বর্তমানে নতুন এবং নির্ভরযোগ্য গন্তব্য খুঁজছে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশ সেই গন্তব্যে পরিণত হওয়ার সব সক্ষমতা রাখে।
চীনা কোম্পানিগুলোকে বাংলাদেশে তাদের ভ্যালু চেইন সম্প্রসারণের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশ থেকে তারা যেমন বিশ্ববাজারে প্রবেশ করতে পারবে, তেমনি দেশের ক্রমবর্ধমান অভ্যন্তরীণ বাজারের বিশাল সুবিধাও ভোগ করতে পারবে।
বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকার গৃহীত বিভিন্ন কাঠামোগত সংস্কারের বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
আরও পড়ুন: বেইজিংয়ে প্রধানমন্ত্রীকে লাল গালিচা সংবর্ধনা
তিনি জানান, সরকারি সেবার ডিজিটালাইজেশন, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা হ্রাস এবং নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে সরকার বর্তমানে ১৮০ দিনের একটি কঠোর কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। স্বচ্ছতা ও গতিশীলতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে নতুন ব্যবসার লাইসেন্স অনুমোদন প্রক্রিয়া ১৫ দিনের মধ্যে সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া, চীনা বিনিয়োগকারীদের বিশেষ সুবিধা দিতে বিডার ওয়েবসাইটে খাতভিত্তিক প্রণোদনার তথ্য সহজলভ্য করা হয়েছে এবং বিডার কার্যালয়ে বিশেষ সম্পর্ক ব্যবস্থাপনা ডেস্ক চালু করা হয়েছে।
সম্মেলনের অন্যতম বড় ঘোষণা হিসেবে প্রধানমন্ত্রী জানান, চীনা ব্যবসায়ীদের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দিতে খুব শিগগিরই চীনে বাংলাদেশের প্রথম বিনিয়োগ কার্যালয় খোলা হবে। এর ফলে চীনা বিনিয়োগকারীদের প্রাথমিক অনুসন্ধানের জন্য বাংলাদেশে আসার প্রয়োজন হবে না; বরং তাদের আগ্রহ থেকে বিনিয়োগের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া বেইজিং থেকেই ত্বরান্বিত হবে। এছাড়া, দুই দেশের মধ্যকার বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় বিনিয়োগ চুক্তি আধুনিকায়নের কাজ চলছে, যা বিনিয়োগকারীদের জন্য আরও শক্তিশালী আইনি সুরক্ষা ও আধুনিক কাঠামো নিশ্চিত করবে।
অনুষ্ঠানে বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বাংলাদেশে বিনিয়োগের সুযোগ-সুবিধা নিয়ে একটি বিস্তারিত প্রেজেন্টেশন উপস্থাপন করেন। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে আসে যে, বিশেষ শিল্প এলাকা হিসেবে চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল এবং মোংলায় দ্বিতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চলের কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে চলছে। সেখানে বন্দর সংযোগ, পরিবহন সুবিধা এবং দীর্ঘমেয়াদী শিল্প ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা হচ্ছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ওষুধ ও স্বাস্থ্যসেবা, ইলেকট্রনিকস, ডিজিটাল অবকাঠামো এবং উন্নত বস্ত্রশিল্পের মতো অগ্রাধিকার খাতগুলোতে বিনিয়োগকারীদের বিশেষ প্রণোদনা ও নীতি সহায়তা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
পরিশেষে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীনা উদ্যোক্তাদের বাংলাদেশ সফর করে নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেশটিকে দেখার আমন্ত্রণ জানান।
তিনি দৃঢ়তার সাথে বলেন, সরকার বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগের বিষয়ে অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং তাদের প্রবৃদ্ধিতে অংশীদার হতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আসুন, বাংলাদেশে বিনিয়োগ করুন সমতার ভিত্তিতে প্রকৃত অংশীদারিত্বের মাধ্যমে আমরা একসঙ্গে সমৃদ্ধ হব, এমন আশাবাদের মধ্য দিয়ে তিনি তার বক্তব্য শেষ করেন।
উল্লেখ্য, বেইজিংয়ে আয়োজিত এই সেমিনারে চীনের ১২৫ জন শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী, শিল্পপতি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী অংশগ্রহণ করেন। প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, বেসামরিক বিমান ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম. রাশিদুজ্জামান মিল্লাত, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ূন কবির, প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা ও শ্রমবিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন এবং প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমনসহ সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি/এনডি








