দুর্যোগ মোকাবিলায় নীতিমালা আধুনিকায়ন ও নতুন মহাপরিকল্পনা সরকারের
ছবি: সংগৃহীত
জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান নেতিবাচক প্রভাব এবং উপর্যুপরি প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনতে বিদ্যমান জাতীয় নীতিমালাগুলো ব্যাপক আধুনিকায়নের হাত দিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উদ্বেগজনক হারে বাড়তে থাকা বজ্রপাতে প্রাণহানি ঠেকাতে মাঠপর্যায়ে নানামুখী আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর সমন্বিত কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
সোমবার (০৮ জুন) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনে সংসদ সদস্যদের টেবিল উত্থাপিত লিখিত প্রশ্নের জবাবে সরকারের এসব দূরদর্শী পরিকল্পনার কথা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু। ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উক্ত অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে মন্ত্রী জলবায়ু সহনশীল বাংলাদেশ বিনির্মাণে সরকারের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ রূপরেখা সংসদকে অবহিত করেন।
সংরক্ষিত নারী আসন-১০ এর সংসদ সদস্য নিলোফার চৌধুরী মনির এক প্রশ্নের লিখিত জবাবে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশ একটি অন্যতম দুর্যোগপ্রবণ দেশ হওয়ায় ঘূর্ণিঝড়, কালবৈশাখী, টর্নেডো, বন্যা, খরা ও নদীভাঙনের মতো ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি ও ঝুঁকি কমাতে বর্তমান সরকার পূর্বপ্রস্তুতি ও ব্যবস্থাপনাগত কাঠামো তৈরিতে বরাবরই গুরুত্ব দিয়ে আসছে। এরই ধারাবাহিকতায় দেশে ইতোমধ্যে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন-২০১২, জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নীতিমালা-২০১৫, জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা (২০২১-২০২৫) এবং অত্যন্ত কার্যকর ‘স্ট্যান্ডিং অর্ডারস অন ডিজাস্টার (এসওডি)’ বা দুর্যোগ বিষয়ক স্থায়ী আদেশাবলী প্রণয়ন করা হয়েছে, যা মাঠপর্যায়ে দুর্যোগ মোকাবিলায় আইনি ও প্রশাসনিক ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে।
তবে পরিবর্তিত বৈশ্বিক জলবায়ু পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে এবং দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসের এই সামগ্রিক প্রক্রিয়াকে আরও বেশি সময়োপযোগী, বাস্তবসম্মত ও কার্যকর করতে সরকার বিদ্যমান পরিকল্পনাগুলোকে হালনাগাদ করার কাজ শুরু করেছে।
আরও পড়ুন: ৫ বছরে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে ৮ বিলিয়ন ডলার: সংসদে বাণিজ্যমন্ত্রী
ত্রাণমন্ত্রী সংসদকে আশ্বস্ত করে জানান, এই আধুনিকায়ন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে মাঠপর্যায়ের কাজের প্রধান নির্দেশিকা ‘এসওডি’ সংশোধন করার কাজ চলছে। এর পাশাপাশি চলমান মেয়াদের ধারাবাহিকতায় আগামী ২০২৬ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যবর্তী মেয়াদের জন্য একটি সম্পূর্ণ নতুন ‘জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা’ প্রণয়নের চূড়ান্ত উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। দেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার এই মহাপরিকল্পনাকে কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না রেখে মাঠপর্যায়ে এর সফল বাস্তবায়নের জন্য প্রশিক্ষিত জনবল গঠন, প্রযুক্তিগত সক্ষমতার যুগোপযোগী উন্নয়ন এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণা কার্যক্রম গতিশীল করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। আর এই লক্ষ্যপূরণেই স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট’-এর নির্মাণকাজের শুভ উদ্বোধন করেছেন, যা দেশের সার্বিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে ও আরও শক্তিশালী করতে মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে।
সংসদ অধিবেশনে সংরক্ষিত নারী আসন-২ এর সংসদ সদস্য শিরীন সুলতানার অপর এক প্রশ্নের জবাবে ত্রাণমন্ত্রী দেশের অন্যতম প্রধান প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে আবির্ভূত হওয়া বজ্রপাতের ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানি হ্রাসে সরকারের গৃহীত নানামুখী সমন্বিত ব্যবস্থার কথা তুলে ধরেন।
তিনি জানান, দেশের বজ্রপাতপ্রবণ বিশেষ অঞ্চলগুলোতে মানুষের জীবন বাঁচাতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর এবং স্থানীয় জেলা-উপজেলা প্রশাসন সম্মিলিতভাবে কাজ করে যাচ্ছে। সরকারের এই উদ্যোগের প্রধান চালিকাশক্তি হলো আধুনিক আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার সঠিক ব্যবহার। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে বজ্রপাতের নিখুঁত পূর্বাভাস তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে, যা পরবর্তীতে তথ্যপ্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহারের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। চিরাচরিত গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাশাপাশি প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কাছে দ্রুত সতর্কবার্তা পৌঁছাতে ‘ইন্টিগ্রেটেড ভয়েস রেসপন্স’ বা আইভিআর (IVR) প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে, যাতে করে ঝড়ের পূর্বমুহূর্তেই মাঠের কৃষক কিংবা সাধারণ মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেতে পারেন।
প্রযুক্তির ব্যবহারের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধিকে সরকার সমান গুরুত্ব দিচ্ছে উল্লেখ করে আসাদুল হাবিব দুলু জানান, প্রত্যন্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে নিয়মিত লিফলেট বিতরণ, পোস্টার প্রচার এবং বিশেষ মহড়ার আয়োজন করা হচ্ছে, যার মাধ্যমে সাধারণ মানুষ বজ্রপাতের সময় করণীয় সম্পর্কে বাস্তব জ্ঞান লাভ করতে পারছে। শুধু সচেতনতা তৈরিই নয়, সরকার মাঠপর্যায়ে বেশ কিছু দৃশ্যমান ও দীর্ঘমেয়াদী প্রকল্প বাস্তবায়নেরও উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো খোলা মাঠে কাজ করা কৃষকদের তাৎক্ষণিক সুরক্ষার জন্য বজ্রপাতপ্রবণ এলাকায় আধুনিক প্রযুক্তি সম্বলিত ‘কৃষক ছাউনি-কাম-বজ্রনিরোধক দণ্ড’ স্থাপন করা। একই সঙ্গে প্রকৃতির অকৃত্রিম ঢাল হিসেবে কাজ করতে দেশের বিভিন্ন গ্রামীণ ও উন্মুক্ত অঞ্চলের সড়ক ও বাঁধের পাশে ব্যাপক হারে তালগাছ রোপণের মতো দূরদর্শী ও পরিবেশবান্ধব প্রকল্প গ্রহণের কাজও পুরোদমে এগিয়ে চলছে। সরকারের এই বহুমাত্রিক দূরদর্শী পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়িত হলে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলা এবং বজ্রপাতে প্রাণহানির সংখ্যা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে মন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








