৫ বছরে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে ৮ বিলিয়ন ডলার: সংসদে বাণিজ্যমন্ত্রী
ছবি: সংগৃহীত
দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য ঘাটতি। গত পাঁচ অর্থবছরের ব্যবধানে দেশের সামগ্রিক বাণিজ্য ঘাটতি প্রায় ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বৃদ্ধি পেয়ে সদ্য সমাপ্ত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২৪.১৬ বিলিয়ন ডলারে এসে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে বাণিজ্যের আড়ালে যেকোনো ধরনের অবৈধ অর্থ পাচার ও মূলধনী কারসাজির ঘটনা ঘটলে তদন্ত সাপেক্ষে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
সোমবার (০৮ জুন) জাতীয় সংসদের চলমান বাজেট অধিবেশনের দ্বিতীয় দিনে নির্ধারিত তারকা চিহ্নিত ও সম্পূরক প্রশ্নোত্তর পর্বে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এসব তথ্য ও সরকারের দৃঢ় অবস্থানের কথা জানান। সরকারের বর্তমান মেয়াদে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিতিশীলতা কাটিয়ে রপ্তানি বৃদ্ধিতে বহুমুখী কৌশলগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে বলেও তিনি সংসদকে আশ্বস্ত করেন।
জাতীয় সংসদে ঢাকা ও চট্টগ্রামের সংসদীয় আসনের একাধিক সদস্যের প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী দেশের আমদানি-রপ্তানি চিত্রের একটি সামগ্রিক পরিসংখ্যান ও তুলনামূলক পর্যালোচনা উপস্থাপন করেন।
বিশেষ করে চট্টগ্রাম-১৪ আসনের সরকারি দলের সদস্য জসীম উদ্দিন আহমেদের তারকাচিহ্নিত প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী জানান, পূর্ববর্তী সরকারের আমলের বেশ কিছু ভুল অর্থনৈতিক নীতি ও কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে এই বাণিজ্য ঘাটতি ক্রমান্বয়ে প্রকট হয়েছে। এর পাশাপাশি বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যমূল্য বৃদ্ধি, তীব্র ডলার সংকট এবং সামগ্রিক আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতির প্রতিকূলতাও এই ঘাটতি তৈরিতে অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। বিশেষ করে জ্বালানি তেল, জরুরি খাদ্যসামগ্রী এবং শিল্প খাতের কাঁচামাল আমদানিতে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হলেও সেই তুলনায় রপ্তানি আয়ের প্রবৃদ্ধি ধীরগতির হওয়ায় এই ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে।
সংসদে বাণিজ্যমন্ত্রীর পক্ষ থেকে উপস্থাপিত সরকারি পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২০-২১ অর্থবছরে দেশের বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ ছিল ১৬.২৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। পরবর্তী ২০২১-২২ অর্থবছরে আমদানি ব্যয় একলাফে ৮৯.১০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছালে বাণিজ্য ঘাটতি সর্বকালের রেকর্ড ভেঙে ২৮.১৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়। এরপর ২০২২-২৩ অর্থবছরে ঘাটতি কিছুটা কমে ২৭.১৮ বিলিয়ন ডলার এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা আরও হ্রাস পেয়ে ২১.৫০ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। তবে সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আমদানি ব্যয় পুনরায় বৃদ্ধি পেয়ে ৭৯.৩৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর বিপরীতে রপ্তানি আয় হয়েছে ৫৫.১৯ বিলিয়ন ডলার, যার ফলে বছরের ব্যবধানে ঘাটতি আবার বেড়ে ২৪.১৬ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। নিচে গত পাঁচ অর্থবছরের পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক চিত্র তুলে ধরা হলো:
২০২০-২১ অর্থবছর: রপ্তানি আয় ৪৫.৩৬ বিলিয়ন ডলার | আমদানি ব্যয় ৬১.৬০ বিলিয়ন ডলার | মোট বাণিজ্য ঘাটতি ১৬.২৪ বিলিয়ন ডলার।
২০২১-২২ অর্থবছর: রপ্তানি আয় ৬০.৯৭ বিলিয়ন ডলার | আমদানি ব্যয় ৮৯.১০ বিলিয়ন ডলার | মোট বাণিজ্য ঘাটতি ২৮.১৩ বিলিয়ন ডলার।
২০২২-২৩ অর্থবছর: রপ্তানি আয় ৫৩.৯২ বিলিয়ন ডলার | আমদানি ব্যয় ৭৮.২৯ বিলিয়ন ডলার | মোট বাণিজ্য ঘাটতি ২৭.১৮ বিলিয়ন ডলার।
২০২৩-২৪ অর্থবছর: রপ্তানি আয় ৫১.১১ বিলিয়ন ডলার | আমদানি ব্যয় ৭২.৬১ বিলিয়ন ডলার | মোট বাণিজ্য ঘাটতি ২১.৫০ বিলিয়ন ডলার।
২০২৪-২৫ অর্থবছর: রপ্তানি আয় ৫৫.১৯ বিলিয়ন ডলার | আমদানি ব্যয় ৭৯.৩৫ বিলিয়ন ডলার | মোট বাণিজ্য ঘাটতি ২৪.১৬ বিলিয়ন ডলার।
আরও পড়ুন: অপরাধ কমলেও টিআইবির প্রতিবেদন ‘কাটিং’ নির্ভর: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
এই বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনার লক্ষ্যে সরকার বর্তমান বাণিজ্য নীতিতে বড় ধরনের সংস্কার ও রপ্তানি ঝুড়ি বহুমুখীকরণের ওপর বিশেষ জোর দিচ্ছে। বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, সদ্য সমাপ্ত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ বিশ্বের প্রায় ২০২টি দেশে পণ্য রপ্তানি করতে সক্ষম হয়েছে, যা দেশের ভৌগোলিক বাজার সম্প্রসারণের একটি ইতিবাচক দিক। তবে সামগ্রিক রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৪ শতাংশই এককভাবে তৈরি পোশাক খাত থেকে আসায় এই খাতের ওপর অতি-নির্ভরতা তৈরি হয়েছে, যা যেকোনো অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। এই ঝুঁকি এড়াতে ও একক নির্ভরতা কমাতে সরকার চামড়া, পাট ও পাটজাত পণ্য, কৃষিপণ্য, ওষুধ, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি), হালকা প্রকৌশল, হিমায়িত খাদ্য ও মাছ এবং প্লাস্টিক খাতকে বিশেষ সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে চিহ্নিত করেছে এবং এসব খাতের রপ্তানিকারকদের ব্যাংক গ্যারান্টির বিপরীতে বিশেষ বন্ড সুবিধা প্রদান শুরু করেছে।
রপ্তানি বাজারের পরিধি বাড়াতে ও আন্তর্জাতিক শুল্কমুক্ত সুবিধা নিশ্চিত করতে মালয়েশিয়া, তুরস্ক ও নিউজিল্যান্ডসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) স্বাক্ষরের জোরালো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুরের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরের লক্ষ্য নিয়ে আগামী ২০২৬ সালের আগস্ট মাসে ঢাকায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তৃতীয় দফা দ্বিপাক্ষিক আলোচনা অনুষ্ঠিত হওয়ার দিনক্ষণ চূড়ান্ত হয়েছে বলে বাণিজ্যমন্ত্রী সংসদকে অবহিত করেন।
সংসদ অধিবেশনে চলমান কোরবানি ঈদ-পরবর্তী চামড়া সংগ্রহ ও বাজারজাতকরণ সংক্রান্ত অন্য এক প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির চলতি বছর সরকারের চামড়া সংগ্রহ অভিযানকে সামগ্রিকভাবে সন্তোষজনক বলে মূল্যায়ন করেন।
তিনি উল্লেখ করেন, মাঠপর্যায়ে কঠোর তদারকি ও সমন্বয়ের কারণে চামড়ার ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি এবং সংরক্ষণ প্রক্রিয়া অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে সুশৃঙ্খল ছিল। তবে এই ব্যবস্থার আরও টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে আগামী বছর থেকে চামড়া সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণের জন্য আরও আধুনিক, পরিবেশবান্ধব ও যুগোপযোগী কার্যকর প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে, যাতে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাতের কাঁচামাল নষ্ট না হয়। একই সঙ্গে জেলাভিত্তিক অর্থনৈতিক সম্ভাবনা জাগিয়ে তুলতে ‘একটি জেলা একটি পণ্য’ (ওডিওপি) কর্মসূচি পুরোদমে চালু করা হয়েছে, যার প্রাথমিক পর্যায়ে দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ১৪টি সুনির্দিষ্ট পণ্যকে আন্তর্জাতিক মানের ব্র্যান্ডিংয়ের জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে।
অধিবেশনে আইনপ্রণেতাদের উদ্বেগের জবাবে পণ্যের মূল্য বাড়িয়ে বা কমিয়ে দেখানোর মাধ্যমে বাণিজ্যের আড়ালে দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচারের অভিযোগ প্রসঙ্গে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি পুনর্ব্যক্ত করেন বাণিজ্যমন্ত্রী।
তিনি কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, দেশের রপ্তানি কিংবা আমদানি বাণিজ্যের আড়ালে যদি কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে টাকা পাচারের সুনির্দিষ্ট ঘটনা ঘটে থাকে, তবে দেশের প্রচলিত আইনের আলোকে কঠোরতম ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সরকারের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) যৌথভাবে কাজ করছে। তদন্তে বাণিজ্যের আড়ালে অবৈধ লেনদেন বা মূলধন পাচারের সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হলেই জড়িতদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি ও কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে, এতে কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা ব্যবসায়িক অনুকম্পা দেখানো হবে না।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








