স্পোর্টস ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৭:৩৫, ৮ জুন ২০২৬

অপরাধ কমলেও টিআইবির প্রতিবেদন ‘কাটিং’ নির্ভর: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

অপরাধ কমলেও টিআইবির প্রতিবেদন ‘কাটিং’ নির্ভর: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

ফাইল ছবি

দেশে গত বছরের (২০২৫ সালের) একই সময়ের তুলনায় চলতি সময়ে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা ও অপরাধ পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে বলে দাবি করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। 

তিনি জানিয়েছেন, চলতি বছরের বিগত তিন মাসে ডাকাতি, খুন, ধর্ষণ ও অপহরণসহ প্রায় প্রতিটি ক্যাটাগরিতেই অপরাধের গ্রাফ নিচের দিকে নেমেছে। দেশের এই প্রকৃত অপরাধচিত্র জেলা পর্যায় থেকে সংগৃহীত পুলিশের প্রাতিষ্ঠানিক পরিসংখ্যান থেকে পাওয়া গেছে। 

অন্যদিকে, বর্তমান সরকারের প্রথম ১০০ দিনের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) যে উদ্বেগজনক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, তা মাঠপর্যায়ের কোনো নিজস্ব তদন্ত নয়, বরং কেবল ‘পত্রিকার কাটিং’ বা সংবাদপত্রের খবরের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। 

সোমবার (০৮ জুন) সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আয়োজিত এক বিশেষ সংবাদ সম্মেলন ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।

গত রবিবার (০৭ জুন) টিআইবি তাদের এক গবেষণা প্রতিবেদনে দাবি করে, বর্তমান সরকারের প্রথম ১০০ দিনে দেশে ৬০৫টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে এবং ২০৯ জন নারী ও শিশু ধর্ষণ ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। 

এই প্রতিবেদনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, টিআইবি কোনো সরকারি সংস্থা নয় এবং তারা প্রকৃত ঘটনা সরেজমিনে জাজ (যাচাই) না করেই ঢালাও স্টেটমেন্ট দেয়। 

সংবাদপত্রের স্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি উল্লেখ করেন যে, প্রতিদিন সকালে ও সারাদিনে পত্রিকায় প্রকাশিত অপরাধের খবরগুলো মন্ত্রণালয় নজরে নেয় এবং তা যথাযথ পরীক্ষার জন্য সংশ্লিষ্ট ডিপার্টমেন্টে পাঠানো হয়। তবে পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিটি ঘটনাই যে শতভাগ সঠিক বা সত্য, তা বলা যাবে না। ফলে শুধু পেপার কাটিংয়ের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা টিআইবির এই মূল্যায়নকে বাস্তব পরিস্থিতির প্রকৃত প্রতিফলন হিসেবে দেখছে না সরকার। নির্দিষ্ট অপরাধের চূড়ান্ত পরিসংখ্যান এই মুহূর্তে হাতের কাছে না থাকায় তিনি তা গণমাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে তুলে ধরতে না পারলেও, সরকারের অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নে ২০২৫ সালের তুলনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি অত্যন্ত স্পষ্ট।

সংবাদ সম্মেলনে পুলিশের ভাবমূর্তি এবং সংস্কার প্রসঙ্গও গুরুত্বের সাথে আলোচিত হয়। জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে কর্মস্থলে যোগ না দিয়ে আত্মগোপনে থাকা বা পলাতক পুলিশ কর্মকর্তাদের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কড়া বার্তা দেন। 

তিনি জানান, প্রায় শখানেকের মতো পলাতক পুলিশ সদস্যের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে বিভাগীয় মামলা রুজু করা হয়েছে এবং এসব মামলার কার্যক্রম বর্তমানে শেষের দিকে রয়েছে। কর্মকর্তাভেদে এই তদন্ত প্রতিবেদন প্রস্তুতের পর রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরসহ চূড়ান্ত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা কার্যকর করা হচ্ছে। এর বাইরেও পলাতকদের অনেকের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) এবং দণ্ডবিধির (পেনাল কোড) অধীনে নিয়মিত মামলা চলমান রয়েছে, যার কারণে তারা সাধারণ আদালতের মাধ্যমে আইনমাফিক বিচারের মুখোমুখি হবেন। আইনি বাধ্যবাধকতা ও বিভাগীয় তদন্তের কারণে এই প্রক্রিয়া ধাপে ধাপে সম্পন্ন হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

আরও পড়ুন: রামিসা হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচারে আইনমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে প্রধানমন্ত্রীর ধন্যবাদ

পুলিশের পেশাদারত্ব বাড়াতে সরকার ‘পুরস্কার ও শাস্তি’ (রিওয়ার্ড অ্যান্ড পানিশমেন্ট) নীতিতে কঠোরভাবে বিশ্বাসী বলে পুনর্ব্যক্ত করেন সালাহউদ্দিন আহমদ। 

তিনি বলেন, ভালো কাজের জন্য যেমন স্বীকৃতি থাকবে, তেমনি দায়িত্ব অবহেলা বা অনিয়মের ক্ষেত্রে কঠোর তিরস্কার ও শাস্তির ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পুলিশের ভাবমূর্তি নিয়ে চূড়ান্ত মূল্যায়ন দেশের জনগণ করবে উল্লেখ করে মন্ত্রী দাবি করেন, বর্তমান সরকার পুলিশকে একটি জনবান্ধব ও গণমুখী বাহিনীতে রূপান্তর করতে ইতিমধ্যে ইতিবাচক ফল পেতে শুরু করেছে। তবে বাহিনীর সদস্যদের নৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় তাদের উৎসাহিত করা জরুরি। এই প্রসঙ্গে তিনি পুলিশের বিদ্যমান আর্থিক সংকটের বিষয়টিও স্বীকার করেন। একজন তদন্ত কর্মকর্তা মাত্র ৬ হাজার টাকা পান সাংবাদিকদের এমন তথ্যের জবাবে মন্ত্রী বলেন, তদন্ত কার্যক্রম, ময়নাতদন্ত রিপোর্ট এবং নিয়মিত পুলিশি টহলের জন্য যেন মাঠপর্যায়ে পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ দেওয়া যায়, তা নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কাজ করছে।

এর আগে, দেশের তিনটি বহুল আলোচিত ও গুরুত্বপূর্ণ অপরাধের রহস্য উদঘাটন, আসামি গ্রেপ্তার এবং জানমাল রক্ষায় পেশাদারিত্ব ও সাহসিকতার পরিচয় দেওয়ায় পুলিশের ১৫ জন সদস্যকে আনুষ্ঠানিকভাবে পুরস্কৃত ও আর্থিক সম্মাননা প্রদান করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। পুরস্কারপ্রাপ্তদের প্রত্যেককে নগদ ২০ হাজার টাকা এবং একটি করে সম্মাননা সনদপত্র তুলে দেওয়া হয়, পাশাপাশি বিশেষ অবদানের জন্য তিনজনকে আইজিপি ব্যাজ পরিয়ে দেওয়া হয়। 

অতীতে সাহসিকতার জন্য এভাবে আনুষ্ঠানিক পুরস্কার দেওয়ার রেওয়াজ ছিল না উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, পুলিশ বাহিনীকে বুস্ট-আপ বা অনুপ্রাণিত করতেই এই নতুন উদ্যোগের সূচনা করা হলো, যা পর্যায়ক্রমে সারা দেশে চালু করা হবে।

পুরস্কৃত হওয়া ঘটনাগুলোর মধ্যে প্রথমটি ছিল রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলা। এই ঘটনার দ্রুততম সময়ে ডিএনএ টেস্ট ও ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করে আদালতে নিখুঁত চার্জশিট দাখিল ও আসামি গ্রেপ্তারে গতিশীল ভূমিকার জন্য পল্লবী থানার ৯ জন পুলিশ সদস্যকে পুরস্কৃত করা হয়। দ্বিতীয় ঘটনাটি ছিল রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া (গোয়ালন্দ) ফেরিঘাটে নৌ-পুলিশের দায়িত্বশীলতা। সেখানে ফেরিঘাটে কর্মরত অবস্থায় অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে একটি বড় ধরনের নৌ-দুর্ঘটনা থেকে প্রায় ৫০ জন বাসযাত্রীর সম্ভাব্য নিশ্চিত প্রাণহানি রোধ করায় নৌ-পুলিশের ৩ জন সদস্যকে পুরস্কৃত ও আইজিপি ব্যাজ প্রদান করা হয়। এছাড়া মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় এক কিশোরী হত্যা ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ক্লুলেস মামলার দ্রুত রহস্য উদঘাটন এবং চার আসামিকে গ্রেফতারে বিশেষ পারদর্শিতা দেখানোর স্বীকৃতিস্বরূপ পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) ৩ জন সদস্যকে এই আর্থিক পুরস্কার ও বিশেষ সম্মাননা ব্যাজ প্রদান করা হয়। 

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, এই ধরনের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পুরো বাহিনীর মনোবল বাড়াতে এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠায় ‘দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন’ নীতি বাস্তবায়নে বিশেষ ভূমিকা রাখবে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়