নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৬:৫৭, ৫ জুন ২০২৬

সারাদেশে বজ্রপাতে ১২ জনের মৃত্যু

সারাদেশে বজ্রপাতে ১২ জনের মৃত্যু

ফাইল ছবি

দেশজুড়ে তীব্র দাবদাহের পর স্বস্তির বৃষ্টির সাথে নেমে এলো চরম বিপর্যয়। দেশের বিভিন্ন জেলায় মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে পৃথক বজ্রপাতের ঘটনায় অন্তত ১২ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। 

বৃহস্পতিবার (০৪ জুন) সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দেশের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া আকস্মিক ঝড়-বৃষ্টির সময় এই বজ্রপাতের ঘটনাগুলো ঘটে। 

জেলাভিত্তিক তথ্যানুযায়ী, সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে সীমান্তঘেঁষা জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জে। সেখানে নারী ও কিশোরসহ মোট ৬ জন মারা গেছেন। এছাড়া ময়মনসিংহে এক কলেজ শিক্ষকসহ ২ জন, এবং নাটোর, নীলফামারী, পঞ্চগড় ও বগুড়ায় ১ জন করে মোট ৬ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে। (উল্লেখ্য, কিছু প্রাথমিক সূত্রে শেরপুর, চুয়াডাঙ্গা বা গাইবান্ধার বিচ্ছিন্ন ঘটনার কথা এলেও, চূড়ান্ত যাচাইকৃত তথ্য ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবেদন অনুযায়ী মোট নিহতের সংখ্যা ১২ এবং জেলাভিত্তিক বিন্যাসে চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর, নীলফামারী, পঞ্চগড়, বগুড়া ও ময়মনসিংহ অঞ্চলেই মূল ক্ষয়ক্ষতি সীমাবদ্ধ ছিল)। অধিকাংশ দুর্ঘটনাই ঘটেছে খোলা মাঠে কৃষিকাজ করার সময়, আম কুড়াতে গিয়ে কিংবা গৃহপালিত পশু গোয়ালঘরে ফিরিয়ে আনার মুহূর্তে।

  • চাঁপাইনবাবগঞ্জে আম কুড়াতে ও মাঠে গিয়ে সর্বোচ্চ ৬ জনের মৃত্যু

বৃহস্পতিবার দুপুরের পর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার সদর, শিবগঞ্জ ও নাচোল উপজেলায় পৃথক বজ্রপাতে তিন নারীসহ মোট ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। এদের মধ্যে শিবগঞ্জ উপজেলাতেই তিনজনের প্রাণহানি ঘটে। 

শিবগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মতিউর রহমান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, নিহতরা হলেন চককীর্তি ইউনিয়নের চকনরেন্দ্র গ্রামের দুবাইপ্রবাসী আব্দুর রবের স্ত্রী মাহমুদা আক্তার (১৯), রানীবাড়ী-বাজারপাড়া (চাঁদপুর) এলাকার আবুল কাশেমের মেয়ে সাদিয়া খাতুন (১৬) এবং মোবারকপুর ইউনিয়নের শিকারপুর দক্ষিণপাড়ার ফিটু আলীর ছেলে মো. মেসবাউল (১৪)। দুপুরের পর আকস্মিক ঝড় ও বৃষ্টি শুরু হলে এই তিনজনই বাড়ির পাশের আমবাগানে আম কুড়াতে গিয়েছিলেন। ওই সময় প্রচণ্ড শব্দে বজ্রপাত হলে ঘটনাস্থলেই তাদের মৃত্যু হয়।

এদিকে সদর উপজেলার ঝিলিম ইউনিয়নের আতাহার এলাকায় বৃষ্টির সময় মাঠ থেকে গরু আনতে গিয়ে বজ্রপাতের শিকার হন মো. রাব্বিলের ছেলে আব্দুল্লাহ (১৭)। স্থানীয় বাসিন্দারা তাকে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে দ্রুত চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। সদর মডেল থানার ওসি একরামুল হোসাইন এই মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। অন্যদিকে, নাচোল উপজেলায় পৃথক দুটি ঘটনায় ২ জনের মৃত্যু হয়েছে। উপজেলার ফতেপুর লাহাবাড়ি গ্রামে মাঠে ঘাস কাটার পর বৃষ্টির মধ্যে বাড়ি ফেরার পথে বজ্রপাতে মারা যান সুমিয়ারা বেগম (৪০) নামের এক নারী। এই ঘটনায় জিয়াউর রহমান (৩৬) নামে আরও একজন আহত হয়েছেন। একই সময়ে নাচোল উপজেলার নিজামপুর (গোসাইপুর) এলাকায় আম কুড়াতে গিয়ে বজ্রাঘাতে প্রাণ হারান মো. শাফিউলের ছেলে হাসান আলী লালু (২১)। নাচোল থানার ওসি সুকোমল চন্দ্র দেবনাথ উপজেলার এই দুটি মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন।

  • ময়মনসিংহে কলেজ শিক্ষক ও তরুণসহ ২ জনের প্রাণহানি

ময়মনসিংহের পৃথক দুই উপজেলায় বজ্রপাতে গাবতলী ডিগ্রি কলেজের এক সহকারী অধ্যাপকসহ দুজনের মৃত্যু হয়েছে। প্রথম ঘটনাটি ঘটে মুক্তাগাছা উপজেলায়। দুপুর সোয়া ১টার দিকে উপজেলার বড়গ্রাম ইউনিয়নের রঘুনাথপুর রৌয়ারচর বাজার এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। নিহত এ.এস.এম খালেকুল আজাদ (৫৬) ওই গ্রামের মৃত হাজী ইউসুফ আলীর ছেলে এবং গাবতলী ডিগ্রি কলেজের গণিত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। 

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, কলেজ বন্ধ থাকায় তিনি নিজ গ্রামে একটি মসজিদের নির্মাণকাজ তদারকি করছিলেন। দুপুরে বৃষ্টির সঙ্গে আকস্মিক বজ্রপাত শুরু হলে উপস্থিত অন্যরা নিরাপদ স্থানে সরে গেলেও তিনি পাশের একটি আমগাছের নিচে আশ্রয় নেন। ঠিক ওই মুহূর্তে গাছের ওপর বজ্রপাত হলে তিনি মারাত্মকভাবে ঝলসে যান। 

মুক্তাগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. সায়েম তানভীর জানান, হাসপাতালে নিয়ে আসার আগেই তার মৃত্যু হয়েছিল। মুক্তাগাছা থানার ওসি মো. কামরুল হাসান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেন।

এর আগে, সকাল সাড়ে ১০টার দিকে গফরগাঁও উপজেলার পাগলা থানাধীন পাঁচবাগ ইউনিয়নের মধ্য লামকাইন গ্রামে মাঠে কাজ করার সময় সিয়ামুল ইসলাম সিয়াম (১৮/২৩) নামে এক তরুণের মৃত্যু হয়। নিহত সিয়াম ওই গ্রামের মৃত রুকন উদ্দিনের ছেলে। 

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বৃষ্টির সময় বাড়ির আঙিনায় ও ফসলি মাঠে ধানের কাজ করার সময় এবং কেউ কেউ বলছেন মাঠ থেকে গরু আনতে গিয়ে তিনি আকস্মিক বজ্রপাতের শিকার হন। তাকে উদ্ধার করে পাশ্ববর্তী হোসেনপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হলে জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। পাগলা থানার ওসি মো. আমিনুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

আরও পড়ুন: সন্ধ্যার মধ্যে ঢাকাসহ ১৯ জেলায় ঝড়ের আভাস

  • নাটোরে মাঠ থেকে গরু আনতে গিয়ে যুবকের মৃত্যু

নাটোরের সিংড়া উপজেলায় ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে মাঠ থেকে গরু আনতে গিয়ে বজ্রাঘাতে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার ঠিক কিছু আগে উপজেলার লালোর ইউনিয়নের বড় বারইহাটি গ্রামে এই ঘটনা ঘটে। নিহত যুবকের নাম মধু আলী (২৫), তিনি ওই গ্রামের আব্দুল আজিজের ছেলে। 

সিংড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল ইসলাম জানান, সন্ধ্যায় আকাশে মেঘ জমে ঝড়-বৃষ্টি শুরু হলে মধু তার গৃহপালিত গরুগুলো ফিরিয়ে আনতে বাড়ির পাশের একটি খোলা মাঠে যান। এ সময় হঠাৎ তীব্র বজ্রপাত হলে তিনি মাঠেই অচেতন হয়ে পড়েন। আশপাশের লোকজন দ্রুত তাকে উদ্ধার করে সিংড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন, তবে হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই পথিমধ্যে তার মৃত্যু হয়। কর্তব্যরত চিকিৎসক পরীক্ষা শেষে তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

  • নীলফামারীতে নিহত ১, চিকিৎসাধীন আশঙ্কামুক্ত গৃহবধূ

নীলফামারীর ডিমলা উপজেলায় বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় কালবৈশাখী ঝড় ও আকস্মিক বজ্রপাতে এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে এবং এক গৃহবধূ গুরুতর আহত হয়েছেন। উপজেলার নাউতারা ইউনিয়নের নিজপাড়া এলাকায় এই দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত ব্যক্তির নাম রবিউল আলম ইসলাম (৪০), তিনি ওই এলাকার নুরুল ইসলামের ছেলে। আহত গৃহবধূর নাম সেলিনা/সেরিনা বেগম (৩০)। 

স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাফিজুল ইসলাম বাবু ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, সন্ধ্যায় হঠাৎ আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হয়ে তীব্র বজ্রপাতসহ বৃষ্টি শুরু হয়। এ সময় নিজ বাড়ির পাশে কাজ করার সময় আকস্মিক বজ্রপাতের শিকার হয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান আলম ইসলাম। তার পাশেই থাকা প্রতিবেশী গৃহবধূ সেলিনা বেগম বজ্রপাতের তীব্রতায় গুরুতর আহত ও সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েন। স্থানীয়রা তাকে দ্রুত উদ্ধার করে ডিমলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন। 

ডিমলা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রাশেদুজ্জামান জানান, নিহতের মরদেহ হাসপাতালে আনা হয়েছিল এবং আহত গৃহবধূ বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ও আশঙ্কামুক্ত রয়েছেন। ডিমলা থানার ওসি শওকত আলী সরকার ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

  • পঞ্চগড়ে ভুট্টা পরিবহনের সময় বেলচা আনতে গিয়ে তরুণের মৃত্যু

পঞ্চগড় সদর উপজেলায় ফসলি জমি থেকে ভুট্টা বোঝাই করার সময় বজ্রপাতের শিকার হয়ে শাহাদাত হোসেন (১৯) নামের এক ট্র্যাক্টর সহকারীর মৃত্যু হয়েছে। বৃহস্পতিবার বিকেলে সদর উপজেলার অমরখানা ইউনিয়নের বানিয়াপাড়া এলাকায় এই হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে। নিহত শাহাদাত ওই এলাকার কেরামত আলীর ছেলে। অমরখানা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নুরুজ্জামান নুরু জানান, শাহাদাত পেশায় একজন ট্র্যাক্টরচালকের সহকারী ছিলেন। বিকেলে তিনি মাঠ থেকে ভুট্টা সংগ্রহ করে পরিবহনের কাজ করছিলেন। এ সময় বৃষ্টির কারণে মাঠের নরম মাটিতে ট্র্যাক্টরের চাকা দেবে যায়। বাড়ি কাছাকাছি হওয়ায় ট্র্যাক্টরটি টেনে তোলার জন্য একটি বেলচা আনতে শাহাদাত দৌড়ে বাড়িতে যান। বেলচা নিয়ে পুনরায় ঘটনাস্থলে ফেরার পথে মাঝমাঠে হঠাৎ বজ্রপাত হলে তিনি গুরুতর আহত হন। স্থানীয় শ্রমিক ও বাসিন্দারা তাকে উদ্ধার করে দ্রুত পঞ্চগড় আধুনিক সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

  • বগুড়ায় মরিচ ক্ষেতে কিশোরের মৃত্যু, মা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন

বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলায় মরিচ ক্ষেতে কাজ করার সময় বজ্রপাতে রাব্বী হোসেন (১৫) নামের এক কিশোরের মৃত্যু হয়েছে। এই ঘটনায় তার মা মনিকা বেগমও গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে ৫টা থেকে সন্ধ্যার মধ্যে উপজেলার সদর ইউনিয়নের তেঁতুলিয়া গ্রামের মাঠে এই ঘটনা ঘটে। নিহত রাব্বী ওই গ্রামের আফাল উদ্দিনের ছেলে। 

স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বিকেলে রাব্বী তার মা মনিকা বেগমসহ পরিবারের আরও কয়েকজন সদস্যের সঙ্গে তেঁতুলিয়া গ্রামের মাঠে নিজেদের মরিচ ক্ষেতে কাজ করছিলেন। এ সময় হঠাৎ আকাশ কালো করে বৃষ্টি ও বজ্রপাত শুরু হলে একটি তীব্র বজ্রাঘাত সরাসরি তাদের ওপর পড়ে। এতে ঘটনাস্থলেই কিশোর রাব্বীর মৃত্যু হয় এবং তার পাশে থাকা মা মনিকা বেগম গুরুতর আহত হন। স্বজনরা তাৎক্ষণিকভাবে মনিকা বেগমকে উদ্ধার করে আদমদীঘি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন। 

আদমদীঘি থানার ওসি কামরুজ্জামান মিয়া জানান, আইনি প্রক্রিয়া শেষে কিশোরের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়