বাংলাদেশ-তুরস্ক বৈঠক: এলো যেসব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও প্রস্তাব
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যে দীর্ঘদিনের ভ্রাতৃপ্রতিম সম্পর্ককে একটি নতুন কৌশলগত উচ্চতায় নিয়ে যেতে এবং দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার পরিধি আরও বিস্তৃত করতে সম্মত হয়েছে উভয় দেশ। প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা জোরদার, মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) স্বাক্ষর এবং দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ বর্তমানের ১.৩ বিলিয়ন ডলার থেকে দ্রুত ২ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার ক্ষেত্রে দুই দেশ যৌথ অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশে তুর্কি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে একটি সুনির্দিষ্ট ‘বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল’ (এসইজেড) প্রতিষ্ঠার আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিয়েছে ঢাকা।
শুক্রবার (০৫ জুন) রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান এবং সফররত তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের মধ্যে এক দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ ও বন্ধুভাবাপন্ন পরিবেশে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে দুই দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বিভিন্ন ইস্যুর পাশাপাশি রোহিঙ্গা সংকট এবং মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বৈঠক শেষে আয়োজিত এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আলোচনার বিস্তারিত তথ্য গণমাধ্যমের সামনে তুলে ধরেন।
তিন দিনের সরকারি সফরে গত বৃহস্পতিবার (০৪ জুন) রাতে ঢাকায় পৌঁছান তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান, যা এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে তাঁর চলতি সফরের সমাপনী পর্যায়।
সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান জানান, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিশেষ নির্দেশনা অনুযায়ী তুরস্কের সঙ্গে একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) অথবা একটি অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (পিটিএ) স্বাক্ষরের সম্ভাবনা নিয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে।
বর্তমানে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর সুযোগ নিয়ে আলোচনা করেছি। দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই বাণিজ্যের পরিমাণ ১.৩ বিলিয়ন থেকে ২ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করতে আমরা বদ্ধপরিকর।
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য বাংলাদেশ সরকারের দেওয়া বিভিন্ন আকর্ষণীয় প্রণোদনার কথা তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে অবহিত করার পাশাপাশি বাংলাদেশের বিভিন্ন বেসরকারি ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে তুর্কি উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগের আহ্বান জানানো হয়েছে। বিশেষ করে তুরস্কের জন্য একটি ডেডিকেটেড বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবকে এই বিনিয়োগ অংশীদারিত্বের ক্ষেত্রে একটি বড় মাইলফলক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
আরও পড়ুন: বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য আরও বাড়াতে চায় তুরস্ক
বাংলাদেশ বস্ত্র ও তৈরি পোশাক শিল্প, প্রতিরক্ষা উৎপাদন, জাহাজ নির্মাণ, ওষুধ শিল্প, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) এবং বেসামরিক বিমান চলাচলের মতো সম্ভাবনাময় খাতগুলোতে তুর্কি বিনিয়োগ ও শিল্প অংশীদারিত্বের ওপর জোর দিয়েছে।
দ্বিপক্ষীয় এই বৈঠকে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক ফোরামে পারস্পরিক সহযোগিতার বিষয়টিও গুরুত্বের সাথে উঠে আসে। সম্প্রতি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদে বাংলাদেশের প্রার্থিতার প্রতি তুরস্ক সরকারের এবং ব্যক্তিগতভাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের অমূল্য ও দৃঢ় সমর্থনের জন্য গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন ড. খলিলুর রহমান।
তিনি বলেন, নির্বাচনে জয়ের ঠিক পরপরই গতকাল আমি দেশে ফিরেছি এবং আজ ঢাকায় আপনাকে স্বাগত জানাতে পেরে অত্যন্ত আনন্দিত। ব্যক্তিগতভাবে আপনার কাছ থেকে আমি যে সমর্থন ও উৎসাহ পেয়েছি, তা অবিস্মরণীয়।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে উল্লেখ করেন যে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের পররাষ্ট্রনীতি ‘বাংলাদেশ বিফোর অল’ (সবার আগে বাংলাদেশ) দর্শন দ্বারা পরিচালিত, যা দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং জনগণের কল্যাণ রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও টেকসই উন্নয়নের পক্ষে অংশীদার ও বন্ধুদের সঙ্গে সমতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে কাজ করে যাবে। বৈঠক শেষে দুই দেশের মধ্যে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষরিত হয়, যা দুই দেশের সাংস্কৃতিক বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করবে। এছাড়া ঢাকায় একটি আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতাল ও নার্সিং ইনস্টিটিউট স্থাপন এবং বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য তুর্কি বৃত্তির সংখ্যা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান এবং মিয়ানমারে তাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের বিষয়ে তুরস্কের সক্রিয় সহযোগিতা চেয়েছে বাংলাদেশ। জবাবে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশের মানবিক ভূমিকা ও ঐতিহাসিক ত্যাগের ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এই সংকটকে জিইয়ে রাখতে আঙ্কারার কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দেন।
তিনি জানান, সফরসূচির অংশ হিসেবে তিনি কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনে যাবেন এবং সেখানে তুরস্কের বিভিন্ন মানবিক সহায়তা সংস্থা যেমন তুর্কি সহযোগিতা ও সমন্বয় সংস্থা (TIKA), দুর্যোগ ও জরুরি ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ (AFAD), তুর্কি রেড ক্রিসেন্ট, তুর্কি দিয়ানেট ফাউন্ডেশন এবং তুরস্কের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় পরিচালিত মানবিক প্রকল্প ও তুর্কি ফিল্ড হাসপাতালের কার্যক্রম সশরীরে পরিদর্শন করবেন।
হাকান ফিদান আরও উল্লেখ করেন যে, গাজা সংকটসহ বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক নানা ইস্যুতে বাংলাদেশ ও তুরস্কের অবস্থান অভিন্ন এবং দুই দেশের প্রতিরক্ষা শিল্পে যৌথ উদ্যোগের বিশাল সুযোগ রয়েছে। সফরকালে তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গেও একটি সৌজন্য সাক্ষাৎকারে মিলিত হবেন বলে নির্ধারিত রয়েছে, যা দুই দেশের সম্পর্ককে কৌশলগত অংশীদারিত্বের এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








