News Bangladesh

নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ২০:৫৯, ২ জুন ২০২৬

নেপালে অনলাইন প্রতারণা চক্রে ১৫ বাংলাদেশি আটক

নেপালে অনলাইন প্রতারণা চক্রে ১৫ বাংলাদেশি আটক

ছবি: সংগৃহীত

দক্ষিণ এশিয়ার পর্যটন ও বিনোদনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডু। তবে সাম্প্রতিক সময়ে হিমালয়কন্যা এই দেশটির ভৌগোলিক ও কৌশলগত অবস্থানকে পুঁজি করে গড়ে উঠছে আন্তর্জাতিক সাইবার অপরাধ ও অনলাইন প্রতারণার এক শক্তিশালী নেটওয়ার্ক। সম্প্রতি কাঠমান্ডুর প্রধান পর্যটন কেন্দ্র থামেল সংলগ্ন একটি হোটেল থেকে বড় ধরনের এক আন্তর্জাতিক অনলাইন স্ক্যাম (প্রতারণা) চক্রের সন্ধান পেয়েছে দেশটির আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। 

নেপাল পুলিশের কাঠমান্ডু ভ্যালি ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন অফিসের এক ঝটিকা অভিযানে এই আন্তর্জাতিক চক্রের ১৯ জন সক্রিয় সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়েছে। 

চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে ১৫ জনই বাংলাদেশের নাগরিক এবং বাকি চারজন প্রতিবেশী দেশ ভারতের। একটি বহিরাগত চীনা চক্রের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে কম্বোডিয়া ও মিয়ানমারের আদলে এই সুসংগঠিত সাইবার ক্রাইম ডেন বা অনলাইন প্রতারণা কেন্দ্রটি পরিচালিত হয়ে আসছিল বলে নিশ্চিত করেছে স্থানীয় প্রশাসন।

স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ‘রাতোপতি’ ও বিশ্বস্ত পুলিশ সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গত শুক্রবার কাঠমান্ডু মহানগরীর ১৬ নম্বর ওয়ার্ডের পাকনাজোলে অবস্থিত ‘হোটেল এস’ নামের একটি আবাসিক স্থাপনায় বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। কাঠমান্ডু ভ্যালি ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন অফিসের একটি চৌকস দল পুরো হোটেলটি অবরুদ্ধ করে তল্লাশি চালায়। অভিযানে অপরাধ চক্রটির ব্যবহৃত বিপুল পরিমাণ কম্পিউটার, অত্যাধুনিক স্মার্টফোন এবং নেটওয়ার্কিং ও অন্যান্য ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম জব্দ করা হয়। 

প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, এই বিশাল প্রতারণা সাম্রাজ্যের মূল হোতা একজন চীনা নাগরিক। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ এড়াতে এবং নির্বিঘ্নে সাইবার অপরাধের নেটওয়ার্ক পরিচালনা করতে ওই চীনা অপারেটর থামেল এলাকার এই পুরো হোটেলটিই দীর্ঘমেয়াদে ভাড়া নিয়েছিলেন। হোটেলটির মালিক প্রতি মাসে ৭ লাখ নেপালি রুপির (NPR) বিনিময়ে ওই চীনা নাগরিকের কাছে সম্পূর্ণ ভবনটি লিজ দেন, যা মূলত একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রতারণা কেন্দ্র বা ‘স্ক্যাম সেন্টার’ হিসেবে রূপান্তরিত করা হয়েছিল। বর্তমানে ওই চীনা মাস্টারমাইন্ড পলাতক রয়েছেন এবং তাকে গ্রেফতারে বিশেষ অভিযান চলমান রয়েছে বলে জানিয়েছেন ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন অফিসের মুখপাত্র তথা পুলিশ সুপার (এসপি) রামেশ্বর কার্কি।

আরও পড়ুন: ভারত ছাড়তে মরিয়া নথিপত্রহীন অভিবাসীরা

নেপাল পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদে এই সিন্ডিকেটের মারাত্মক অপরাধ কৌশলের চিত্র উঠে এসেছে। চক্রটি মূলত ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করত। তারা ভুয়া বা প্রলুব্ধকর প্রোফাইল তৈরি করে সুকৌশলে বিভিন্ন নারীদের আপত্তিকর বা সংবেদনশীল ছবি সংগ্রহ বা এডিট করত। পরবর্তীতে সেই ছবিগুলো সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পাঠিয়ে সামাজিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করার ভয় দেখিয়ে বড় অঙ্কের অর্থ বা মুক্তিপণ দাবি করা হতো। 

তদন্তে সবচেয়ে উদ্বেগজনক যে তথ্যটি জানা গেছে তা হলো, এই চক্রটি স্থানীয় নেপালি নাগরিকদের টার্গেট করত না। তাদের প্রধান টার্গেট বা শিকার ছিল বাংলাদেশ এবং ভারতের সাধারণ ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা। নিজেদের দেশের নাগরিকদের মাধ্যমেই নিজ নিজ দেশের সাধারণ মানুষকে ফাঁদে ফেলে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়াই ছিল এই আন্তর্জাতিক চক্রের মূল ব্লুপ্রিন্ট।

গ্রেফতারকৃত বাংলাদেশি তরুণদের জিজ্ঞাসাবাদে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মানবপাচার ও সাইবার দাসত্বের (Cyber Slavery) এক ভয়াবহ রুট উন্মোচিত হয়েছে। 

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আসামিরা স্বীকার করেছেন যে, তাদের বড় একটি অংশ পূর্বে কম্বোডিয়ায় অবস্থান করছিলেন এবং সেখানেও তারা এই ধরনের অনলাইন স্ক্যাম সেন্টারে কাজ করেছেন। কম্বোডিয়ায় অবস্থানকালেই এই কুখ্যাত চীনা অপারেটরদের সঙ্গে তাদের পরিচয় ও নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে। পরবর্তীতে কম্বোডিয়া ও মিয়ানমারে আন্তর্জাতিক কড়াকড়ি ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর অবস্থানের কারণে এই অপরাধ চক্রটি তাদের নিরাপদ আস্তানা হিসেবে নেপালকে বেছে নেয়। কম্বোডিয়ার সেই পরিচিত চীনা অপারেটররাই উচ্চ বেতনের প্রলোভন কিংবা পূর্ববর্তী অপরাধের ধারাবাহিকতায় এই তরুণদের সুকৌশলে নেপালে নিয়ে আসে। অর্থাৎ, এটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন সাইবার অপরাধের ঘটনা নয়, বরং কম্বোডিয়া থেকে নেপাল পর্যন্ত বিস্তৃত এক আন্তর্জাতিক মানবপাচার ও সংগঠিত অপরাধের স্পষ্ট সংযোগ।

আইনি প্রক্রিয়া ও স্বচ্ছতার স্বার্থে নেপাল পুলিশ গ্রেফতারকৃত ১৫ জন বাংলাদেশি নাগরিকের পরিচয় প্রকাশ করেছে। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে তরুণদের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি, যাদের বয়স ১৯ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। 

তারা হলেন মজিদুল ইসলাম রিদয় (২৫), শফিউল ইসলাম (২২), আব্দুল্লাহ আল জোবায়ের (২৬), আপন চন্দা সাহা (২২), আবুল হাসনাইন (২৬), আল শাহরিয়ার (২৪), ফয়সাল (৩০), আজাদ হোসেন (৩৫), মো. আজমাইন (১৯), তামিম হাসান সৌরভ (২০), জাকারিয়া জান্নাত (২০), শাকিল আনোয়ার (২৪), বিল্লাল রাফাত (২১), অমিত হাসান সৈকত (২৫) এবং ইসমাম হাসান স্বাধীন (৩০)।

নেপাল পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সাইবার অপরাধের গুরুতর অভিযোগ থাকলেও প্রথম ধাপে এই বিদেশিদের বিরুদ্ধে অভিবাসন আইন লঙ্ঘনের কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। পর্যটক ভিসায় এসে অবৈধভাবে অবস্থান এবং বাণিজ্যিক বা অপরাধমূলক কার্যক্রম পরিচালনার দায়ে গ্রেফতারকৃত ১৫ জন বাংলাদেশি এবং ৪ জন ভারতীয়সহ মোট ১৯ জনকেই পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নেপালের ইমিগ্রেশন বিভাগের (Department of Immigration) কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। 

ইমিগ্রেশন আইন অনুযায়ী, তাদের পাসপোর্ট ও ভিসার কার্যকারিতা বাতিল করে বড় অঙ্কের জরিমানা আদায় এবং চূড়ান্তভাবে ‘ডিপোর্ট’ বা নিজ নিজ দেশে জোরপূর্বক ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে নেপালের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট অনুষদ ও ঢাকাস্থ দূতাবাসের সঙ্গে এই চক্রের মূল শিকড় ও বাংলাদেশে তাদের অন্য কোনো সহযোগী রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ রক্ষা করছে। পলাতক চীনা নাগরিক গ্রেফতার হলে এই চক্রের আর্থিক লেনদেনের পরিমাণ এবং আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সূত্র: বিবিসি নিউজ ও রাতোপতি (কাঠমান্ডু ব্যুরো)

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়