তদবির ও বিতর্কের জেরে পুলিশ পদক প্রদান স্থগিত
ফাইল ছবি
রাজারবাগের প্যারেড গ্রাউন্ডে বর্ণাঢ্য কুচকাওয়াজের মধ্য দিয়ে পুলিশ সপ্তাহ-২০২৬ শুরু হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে স্থগিত করা হয়েছে বাংলাদেশ পুলিশের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ স্বীকৃতিগুলোর একটি ‘বাংলাদেশ পুলিশ পদক (বিপিএম)’ ও ‘রাষ্ট্রপতির পুলিশ পদক (পিপিএম)’ প্রদান অনুষ্ঠান।
সাহসিকতা ও সেবামূলক কাজের জন্য মনোনীতদের তালিকায় সাবেক সরকারের আস্থাভাজন এবং বিতর্কিত কর্মকর্তাদের নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়ার অভিযোগে শেষ মুহূর্তে পদক প্রদান স্থগিত করেছে সরকার। গত কয়েকদিন ধরে বাহিনীর ভেতরে-বাইরে এ নিয়ে তীব্র সমালোচনার মুখে প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের হস্তক্ষেপে এই নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো। মূলত দলীয় আনুগত্য ও তদবিরের মাধ্যমে পদক বাগিয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টায় বাহিনীর ভাবমূর্তি সংকটের মুখে পড়লে পুরো তালিকাটি পুনরায় যাচাই-বাছাইয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রবিবার (১০ মে) সকালে রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স মাঠে বার্ষিক পুলিশ প্যারেডের মধ্য দিয়ে ‘আমার পুলিশ, আমার দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’ এই প্রতিপাদ্যে চার দিনব্যাপী (১০-১৩ মে) পুলিশ সপ্তাহের উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন কন্টিনজেন্টের সুশৃঙ্খল প্যারেড পরিদর্শন ও অভিবাদন গ্রহণ করার পাশাপাশি বাহিনীর সদস্যদের উদ্দেশ্যে দিকনির্দেশনামূলক ভাষণ দেবেন। তবে পূর্বনির্ধারিত সূচি অনুযায়ী আজ বিপিএম ও পিপিএম পদক তুলে দেওয়ার কথা থাকলেও তা সিডিউল থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স মাঠে বর্ণাঢ্য বার্ষিক পুলিশ প্যারেডের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এবারের আয়োজনের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল ‘বাংলাদেশ পুলিশ পদক (বিপিএম)’ ও ‘রাষ্ট্রপতির পুলিশ পদক (পিপিএম)’ প্রদান অনুষ্ঠান। তবে শেষ মুহূর্তে সেই আয়োজন স্থগিত করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, পদকের তালিকায় বিতর্কিত কর্মকর্তা, রাজনৈতিক বিবেচনা, তদবির এবং অতীতে সুবিধাভোগী হিসেবে পরিচিত কয়েকজন সদস্যের নাম উঠে আসায় পুরো তালিকা পুনরায় যাচাই-বাছাইয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তর, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ১০৭ থেকে ১০৯ জন কর্মকর্তা ও সদস্যকে পদকের জন্য মনোনীত করা হয়েছিল। তাদের মধ্যে সাহসিকতা, বীরত্বপূর্ণ কাজ, গুরুত্বপূর্ণ মামলার রহস্য উদঘাটন, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, দক্ষতা, কর্তব্যনিষ্ঠা, সততা ও শৃঙ্খলামূলক আচরণের স্বীকৃতিস্বরূপ বিপিএম, পিপিএম, বিপিএম-সেবা ও পিপিএম-সেবা পদক দেওয়ার প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছিল। গত ২ মে থেকে রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স মাঠে পদকপ্রত্যাশীদের প্যারেড ও আনুষ্ঠানিকতার মহড়াও চলছিল।
কিন্তু শনিবার (০৯ মে) রাত পর্যন্ত পদকপ্রাপ্তদের নামে প্রয়োজনীয় সরকারি আদেশ (জিও) জারি হয়নি। নিয়ম অনুযায়ী জিও ছাড়া পদক প্রদান সম্ভব নয়। পরে রাতেই পুলিশ সপ্তাহের সূচি থেকে পদক প্রদান অনুষ্ঠান বাদ দেওয়া হয়।
পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) খন্দকার রফিকুল ইসলাম বিভিন্ন গণমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, এবারের পুলিশ সপ্তাহে পদক প্রদান অনুষ্ঠান থাকছে না। পদকের তালিকা আরও যাচাই-বাছাই করে সুবিধাজনক সময়ে অনুষ্ঠান আয়োজন করা হবে।
তিনি জানান, ১০৭টি পদক দেওয়ার প্রস্তাব ছিল, যা আপাতত স্থগিত করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে নতুন করে যাচাই শেষে পদক দেওয়া হতে পারে। একইসঙ্গে তিনি আরেক ব্যাখ্যায় বলেন, রাষ্ট্রপতি বিদেশ সফরে থাকায় জিও জারি করা সম্ভব হয়নি। তবে এর পাশাপাশি আরও যাচাই-বাছাইয়ের প্রয়োজনীয়তাও রয়েছে।
আরও পড়ুন: পুলিশের প্রতি আস্থা ফেরানোই মূল লক্ষ্য: প্রধানমন্ত্রী
পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা জানান, পুরো বিষয়টি এখনো একটি প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। গভীর যাচাইয়ে বর্তমান তালিকা থেকে কেউ বাদ পড়তে পারেন, আবার নতুন কেউ যুক্তও হতে পারেন। এর মধ্যেই পুলিশের ভেতরে এবং বাইরে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ভাষ্য, পুলিশ সপ্তাহ শুরু হওয়ার পর পদক প্রদান স্থগিত হওয়ার ঘটনা প্রায় নজিরবিহীন।
পুলিশ ও প্রশাসন-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, পদকের তালিকায় অন্তত ১১ জন এমন কর্মকর্তার নাম ছিল, যারা বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ও পদক পেয়েছিলেন অথবা রাজনৈতিক আনুগত্যের কারণে সুবিধাভোগী হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
অভিযোগ রয়েছে, তাদের মধ্যে কেউ কথিত জঙ্গি দমনের বিতর্কিত অভিযানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, কেউ প্রভাবশালী ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ঘনিষ্ঠতার কারণে সুযোগ পেয়েছেন, আবার কেউ আলোচিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা সাইবার সংশ্লিষ্ট বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার পরও পদকের জন্য মনোনীত হন।
এ নিয়ে মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের মধ্যেও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। অনেক কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন, দীর্ঘদিন ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব পালন, গুরুত্বপূর্ণ মামলার রহস্য উদঘাটন কিংবা সফল অভিযান পরিচালনার পরও তারা পদকের জন্য বিবেচিত হননি। বরং রাজনৈতিক যোগাযোগ, তদবির কিংবা অভ্যন্তরীণ প্রভাবের ভিত্তিতে অনেকে তালিকায় স্থান পেয়েছেন।
কয়েকজন বঞ্চিত কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, অতীতেও তাদের কাজের কৃতিত্ব ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নিজেদের নামে নিয়ে পদক পেয়েছেন। এবারও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে তারা মনে করছেন।
সম্প্রতি কয়েকটি জাতীয় দৈনিকে পুলিশ পদক নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। প্রতিবেদনে তদবির সিন্ডিকেট, রাজনৈতিক প্রভাব, বিতর্কিত কর্মকর্তাদের অন্তর্ভুক্তি এবং যোগ্য সদস্যদের বঞ্চনার অভিযোগ তুলে ধরা হয়। এরপর প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটেই পুরো তালিকা পুনর্মূল্যায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
পুলিশ কর্মকর্তাদের একাংশের মতে, অতীতে রাজনৈতিক বিবেচনায় পদক দেওয়ার কারণে এই সম্মানজনক স্বীকৃতির মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকার পুনরায় যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে পদক প্রক্রিয়াকে আরও গ্রহণযোগ্য ও বিতর্কমুক্ত করার চেষ্টা করছে বলে তারা মনে করছেন। তবে অন্যদিকে, পদক অনুষ্ঠান স্থগিত হওয়াকে বাহিনীর অভ্যন্তরীণ সমন্বয়হীনতা এবং বাছাই প্রক্রিয়ার দুর্বলতার প্রতিফলন বলেও মনে করছেন অনেকে।
এদিকে পুলিশ সপ্তাহ-২০২৬-এর অন্যান্য কর্মসূচি পূর্বনির্ধারিত সূচি অনুযায়ী অনুষ্ঠিত হচ্ছে। রোববার সকালে রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স মাঠে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পুলিশের বিভিন্ন কন্টিনজেন্ট ও পতাকাবাহী দলের সুশৃঙ্খল ও বর্ণিল প্যারেড পরিদর্শন এবং অভিবাদন গ্রহণ করেন। তিনি পুলিশ সদস্যদের উদ্দেশে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে। এবারের বার্ষিক পুলিশ প্যারেডে নেতৃত্ব দিচ্ছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার হাসান মোহাম্মদ নাছের রিকাবদার।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সরকারের ব্যয়সংকোচন নীতির কারণে এবারের পুলিশ সপ্তাহের আয়োজনেও কাটছাঁট করা হয়েছে। অতীতে সাতদিনব্যাপী আয়োজন হলেও এবার তা চারদিনে সীমিত রাখা হয়েছে। কমানো হয়েছে বিভিন্ন ইভেন্ট ও অতিথির সংখ্যাও। তবে পুলিশ সপ্তাহের কর্মসূচিতে পুনাক স্টল পরিদর্শন, কল্যাণ প্যারেড, আইজিপি ব্যাজ প্রদান, শিল্ড প্যারেড, অস্ত্র ও মাদক উদ্ধারে পুরস্কার বিতরণ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময়সহ বিভিন্ন কার্যক্রম থাকছে।
পুলিশ সপ্তাহ উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী এবং পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির পৃথক বাণী দিয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট মহল বলছে, পুলিশ পদক কেবল একটি আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি নয়; এটি বাহিনীর সদস্যদের কর্মস্পৃহা, পেশাগত মর্যাদা এবং সাহসিকতার প্রতীক। ফলে পদক প্রদানের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা না গেলে বাহিনীর ভেতরে হতাশা ও বিভাজন আরও বাড়তে পারে। এখন দেখার বিষয়, পুনরায় যাচাই-বাছাই শেষে কাদের নাম চূড়ান্ত তালিকায় থাকে এবং স্থগিত হওয়া এই পদক অনুষ্ঠান কবে অনুষ্ঠিত হয়।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








