দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে বাংলাদেশ-মিয়ানমার বৈঠক
ছবি: সংগৃহীত
দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণ, দীর্ঘদিন ধরে স্থগিত থাকা সীমান্ত বাণিজ্য পুনরায় চালু করা, সরাসরি নৌ যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা, এলএনজি আমদানি এবং বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নিরাপদ প্রত্যাবাসনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোকে সামনে রেখে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।
রবিবার (০২ আগস্ট) বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের সঙ্গে বাংলাদেশে নিযুক্ত মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত কিয়াও সোয়ে মো (Kyaw Soe Moe) এই বৈঠকে মিলিত হন। বৈঠকে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ককে আরও অর্থবহ, গতিশীল ও নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়।
বৈঠকে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্পর্ক আরও জোরদার করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। ভৌগোলিক নৈকট্য এবং দুই দেশের মধ্যকার অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগানোর মাধ্যমে পারস্পরিক আমদানি-রপ্তানি বৃদ্ধি করার বিষয়ে উভয় পক্ষ ঐকমত্যে পৌঁছায়।
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির জানান যে, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে পারস্পরিক সম্মান, আস্থা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার ভিত্তিতে সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করতে বাংলাদেশ সর্বদা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বাণিজ্য, পরিবহন, বিনিয়োগ এবং সীমান্ত যোগাযোগসংক্রান্ত যেসব বিষয় অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছে, সেগুলোকে দ্রুত আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের মাধ্যমে পর্যালোচনা করা হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট যেকোনো জটিলতা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করে দুই দেশের অর্থনৈতিক অংশীদারত্বকে আরও গতিশীল করতে উভয় পক্ষ একযোগে কাজ করবে।
মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত কিয়াও সোয়ে মো দুই দেশের মধ্যকার বাণিজ্যের পরিমাণ আরও বহুগুণ বাড়ানোর গভীর আগ্রহ প্রকাশ করেন।
তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন যে, দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ বা স্থগিত থাকা সীমান্ত বাণিজ্য পুনরায় চালু করা সম্ভব হলে উভয় দেশের সাধারণ মানুষ এবং ব্যবসায়ীরা সমানভাবে উপকৃত হবেন। বর্তমান বাস্তবতায় প্রয়োজনে প্রাথমিকভাবে একটি সীমিত বা অস্থায়ী পরিসরে সীমান্ত বাণিজ্য চালুর বিষয়টি বিবেচনা করার প্রস্তাব দেন তিনি।
দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক পণ্যের তালিকা দীর্ঘ করার লক্ষ্যে কৃষিপণ্য, মৎস্যপণ্য, চাল, ওষুধ এবং হিমায়িত খাদ্যের মতো সম্ভাবনাময় বিভিন্ন খাতের পণ্য বিনিময় ও বাণিজ্য বৃদ্ধির সুযোগ নিয়ে বিস্তারিত মতবিনিময় হয়। কেবল রাষ্ট্রীয় পর্যায় নয়, বরং দুই দেশের ব্যবসায়ী সমাজের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ বা বিজনেস-টু-বিজনেস (B2B) কার্যক্রম আরও জোরালো করার ওপরও বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়, যা ভবিষ্যতে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
আরও পড়ুন: পুলিশ কোনো দলের লাঠিয়াল বাহিনী নয়
বাণিজ্য বৃদ্ধিতে যোগাযোগের বাধা দূর করার অংশ হিসেবে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে সরাসরি নৌ ও শিপিং যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার ওপর সর্বোচ্চ জোর দেওয়া হয়।
এই সংক্রান্ত প্রস্তাবিত চুক্তিটি দ্রুত চূড়ান্ত করার তাগিদ দিয়ে উভয় পক্ষ মত প্রকাশ করেন যে, সরাসরি নৌ যোগাযোগ চালু হলে পণ্য পরিবহনে অতিরিক্ত ব্যয় ও দীর্ঘ সময় উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাবে এবং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। এর পাশাপাশি বৈঠকে জ্বালানি খাতের সহযোগিতার অংশ হিসেবে এলএনজি আমদানি এবং পারস্পরিক বিনিয়োগের সুযোগ সম্প্রসারণের বিভিন্ন দিক নিয়েও আলোচনা করা হয়।
বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক আলোচনার পাশাপাশি বাংলাদেশে দীর্ঘকাল ধরে আশ্রয় নেওয়া জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সংকট নিরসনের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে স্থান পায়। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গাদের একটি নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, টেকসই ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের বিষয়ে নিজেদের জোরালো ও অটল অবস্থান স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়।
জবাবে মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত জানান যে, প্রত্যাবাসনের জন্য বাংলাদেশ থেকে পাঠানো তালিকাগুলোর যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া বর্তমানে চলমান রয়েছে। নিরাপত্তা ও মাঠপর্যায়ের সার্বিক পরিস্থিতি পুরোপুরি অনুকূলে এলে এই প্রত্যাবাসন কার্যক্রম আরও গতিশীল ও কার্যকর করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। তবে বাণিজ্যমন্ত্রী দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি এবং এ বিষয়ে দৃশ্যমান ও ফলপ্রসূ অগ্রগতি নিশ্চিত করার ওপর জোর তাগিদ দেন।
দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ও সহযোগিতা নিয়মিত পর্যালোচনার জন্য উভয় পক্ষ নিয়মিত প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনা এবং যৌথ কমিটির বৈঠক আয়োজনের ব্যাপারে একমত পোষণ করেন। এরই ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে বাংলাদেশে পরবর্তী যৌথ বৈঠক আয়োজনের একটি প্রস্তাব নিয়েও ইতিবাচক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
উক্ত উচ্চপর্যায় বৈঠকে অন্যান্যদের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আতাউর রহমান খান, অতিরিক্ত সচিব (এফটিএ) আয়েশা আক্তার এবং মিয়ানমার দূতাবাসের সম্মানিত কাউন্সিলর মিয়াত লুইন (ম্যাট লুইন)।
বৈঠক শেষে উভয় পক্ষ আশা প্রকাশ করেন যে, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, পরিবহন যোগাযোগ এবং আঞ্চলিক সংযোগ বৃদ্ধির এই প্রচেষ্টা ভবিষ্যতে দুই দেশের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক অংশীদারত্বকে এক অনন্য উচ্চতায় উন্নীত করবে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








