নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১২:৪০, ২ আগস্ট ২০২৬

‘পুলিশ কোনো দলের লাঠিয়াল বাহিনী নয়’

‘পুলিশ কোনো দলের লাঠিয়াল বাহিনী নয়’

ছবি: সংগৃহীত

পুলিশ কোনো রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠীর লাঠিয়াল বাহিনী নয়; বরং দলীয় প্রভাবমুক্ত, পেশাদার, আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও মানবিক বাহিনী হিসেবে জনগণের আস্থা অর্জন করাই হতে হবে পুলিশের প্রধান লক্ষ্য বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। 

তিনি বলেছেন, বর্তমান সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করছে। সেই নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাংলাদেশ পুলিশকেও সততা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ভিত্তিতে দায়িত্ব পালন করতে হবে। কোনো ব্যক্তি যেন সেবা নিতে এসে হয়রানির শিকার না হন, কোনো অনিয়ম, দুর্নীতি কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার যেন পুলিশ সদস্যদের গ্রাস করতে না পারে সেদিকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে।

রবিবার (০২ আগস্ট) সকালে রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার সারদায় বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমিতে ২৭তম বিসিএস (পুলিশ) ব্যাচের প্রথম পর্যায়ের শিক্ষানবিশ সহকারী পুলিশ সুপারদের (এএসপি) ছয় মাসব্যাপী মৌলিক প্রশিক্ষণের সমাপনী কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে কুচকাওয়াজ পরিদর্শন ও অভিবাদন গ্রহণের পাশাপাশি বিভিন্ন বিষয়ে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনকারী প্রশিক্ষণার্থীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন তিনি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ পুলিশ জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার দায়িত্বে নিয়োজিত একটি সাংবিধানিক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান। ফলে কোনো রাজনৈতিক দল, ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষার পরিবর্তে সংবিধান, আইন ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ থেকেই দায়িত্ব পালন করতে হবে। জনগণের আস্থা ও বিশ্বাসই হবে পুলিশের সবচেয়ে বড় শক্তি। 

তিনি বলেন, বিগত সময়ে নানা কারণে পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে এসে পেশাদারিত্ব, নিরপেক্ষতা, মানবিক আচরণ এবং সেবামুখী মনোভাবের মাধ্যমে জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশের মানুষের মধ্যে যে নতুন প্রত্যাশা সৃষ্টি হয়েছে, সেই প্রত্যাশা পূরণে পুলিশকে আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করতে হবে। মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং ২০২৪ সালের ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের আত্মত্যাগের আদর্শ ধারণ করে নবীন কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালন করতে হবে। দীর্ঘ সময়ের বঞ্চনার পর নতুন বাস্তবতায় যাত্রা শুরু করা এই কর্মকর্তাদের চেইন অব কমান্ড বজায় রেখে বৈষম্যহীন সমাজ গঠন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং মানুষের মনে নিরাপত্তা ও স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।

ডিজিটাল যুগের চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সাইবার অপরাধ, ডিজিটাল প্রতারণা, অনলাইন জালিয়াতি ও তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ দ্রুত বাড়ছে। এসব অপরাধ দমন এবং জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ সদস্যদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও কারিগরি দক্ষতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে হবে। আধুনিক তদন্ত পদ্ধতি, ডিজিটাল ফরেনসিক সক্ষমতা এবং তথ্যপ্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার ছাড়া ভবিষ্যতের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা কার্যক্রম সফল করা সম্ভব হবে না। নবীন কর্মকর্তাদের সাধারণ মানুষের অকৃত্রিম বন্ধু ও সেবক হিসেবে নিজেদের গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।

আরও পড়ুন: মানবপাচার-অনলাইন স্ক্যাম প্রতিরোধে কঠোর অবস্থানে সরকার

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, দায়িত্ব পালনের সময় সততা, শৃঙ্খলা, পেশাদারিত্ব ও মানবিক মূল্যবোধকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। কোনো মানুষ যেন থানায় বা পুলিশের অন্য কোনো সেবাকেন্দ্রে গিয়ে হয়রানি, হয়রানিমূলক আচরণ কিংবা অযৌক্তিক ভোগান্তির শিকার না হন, সে বিষয়ে প্রতিটি পুলিশ সদস্যকে সচেতন থাকতে হবে। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি জনগণের আস্থা অর্জনই পুলিশের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের মূল ভিত্তি হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

সমাপনী কুচকাওয়াজের মধ্য দিয়ে ২৭তম বিসিএস (পুলিশ) ব্যাচের প্রথম পর্যায়ের ৫৮ জন শিক্ষানবিশ সহকারী পুলিশ সুপার ছয় মাসব্যাপী মৌলিক প্রশিক্ষণ সফলভাবে শেষ করে আনুষ্ঠানিকভাবে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন। ২০২৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই প্রশিক্ষণে শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, আইন, অপরাধ তদন্ত, অস্ত্রচালনা, ফিল্ড ক্রাফট, নেতৃত্ব, প্রশাসন, জনসম্পৃক্ত পুলিশিং, তথ্যপ্রযুক্তি, সাইবার অপরাধ দমন, মানবাধিকার, শৃঙ্খলা ও পেশাগত নৈতিকতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে নিবিড় প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। 

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, প্রশিক্ষণ শেষে নবীন কর্মকর্তাদের বাংলাদেশ পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটে বাস্তবমুখী সংযুক্তি (অ্যাটাচমেন্ট) প্রশিক্ষণের জন্য পদায়ন করা হবে।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ভূমিমন্ত্রী মো. মিজানুর রহমান মিনু, পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন ফকির এবং বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমির প্রিন্সিপাল অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (অতিরিক্ত আইজিপি) জি এম আজিজুর রহমান। এছাড়া পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, প্রশিক্ষক, আমন্ত্রিত অতিথি এবং প্রশিক্ষণার্থীদের স্বজনরা উপস্থিত ছিলেন।

সমাপনী কুচকাওয়াজে প্যারেড কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন শিক্ষানবিশ সহকারী পুলিশ সুপার ড. মো. নূরুল হুদা ভূঁইয়া। তিনি প্রশিক্ষণে সামগ্রিক কৃতিত্বের স্বীকৃতি হিসেবে বেস্ট প্রবেশনার এবং বেস্ট ইন ফিল্ড অ্যাক্টিভিটিজ এই দুটি মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার অর্জন করেন। বেস্ট একাডেমিক অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন শিক্ষানবিশ সহকারী পুলিশ সুপার আবু নুমান মোহাম্মদ খাইরুল ইসলাম এবং বেস্ট শুটার নির্বাচিত হন শিক্ষানবিশ সহকারী পুলিশ সুপার এ বি এম মামুন।

অনুষ্ঠান শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনকারী প্রশিক্ষণার্থীদের হাতে পুরস্কার তুলে দিয়ে তাদের ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের সাফল্য কামনা করেন। 

তিনি আশা প্রকাশ করেন, প্রশিক্ষণ ও অর্জিত অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে নবীন পুলিশ কর্মকর্তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, আইনের শাসন, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং জনগণের প্রত্যাশার প্রতি দায়বদ্ধ থেকে একটি দক্ষ, জবাবদিহিমূলক, মানবিক ও জনবান্ধব পুলিশ বাহিনী গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়