নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৮:৪৫, ৩১ জুলাই ২০২৬

সংকটের মাঝেই গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব পেট্রোবাংলার

সংকটের মাঝেই গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব পেট্রোবাংলার

ফাইল ছবি

দেশের জ্বালানি খাতে চলমান তীব্র সংকট এবং মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে সৃষ্ট ভয়াবহ গ্যাস ঘাটতির মাঝেই নতুন করে দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজসম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা)। সংস্থাটি মূলত বিদ্যুৎ উৎপাদন ও যানবাহনে ব্যবহৃত সংকুচিত প্রাকৃতিক গ্যাসের (সিএনজি) দাম একলাফে ৫০ শতাংশের বেশি বাড়ানোর প্রস্তাব জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগে পাঠিয়েছে। 

আন্তর্জাতিক বাজারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) দাম বৃদ্ধি, ডলার সংকটে আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং সরকারের ওপর চেপে বসা ভর্তুকির পাহাড় সামাল দিতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে পেট্রোবাংলা ও মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে। বর্তমানে প্রস্তাবটি জ্বালানি বিভাগে যাচাই-বাছাই পর্যায়ে রয়েছে এবং সেখান থেকে অনুমোদিত হওয়ার পর তা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কাছে পাঠানো হবে।

পেট্রোবাংলার পাঠানো প্রস্তাবনায় বিদ্যুৎকেন্দ্রে সরবরাহ করা গ্যাসের দাম প্রতি ঘনমিটার ১৬ টাকা থেকে ৫৬ দশমিক ২৫ শতাংশ বাড়িয়ে ২৫ টাকা করার কথা বলা হয়েছে। একইসঙ্গে যানবাহনে ব্যবহৃত সিএনজির দাম ৪৩ টাকা থেকে ৫১ দশমিক ১৬ শতাংশ বাড়িয়ে প্রায় ৬৫ টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে। 

তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এবার মূলত বিদ্যুৎ ও সিএনজি খাতেই দাম বাড়ানোর ছক কষা হয়েছে; আপাতত আবাসিক চুলা, বাণিজ্যিক সংযোগ বা বিদ্যমান শিল্প কারখানার গ্রাহকদের জন্য নতুন করে দাম বাড়ানোর কোনো প্রস্তাব দেওয়া হয়নি। এর আগে গত ২০২৫ সালের এপ্রিলে নতুন শিল্পে ব্যবহৃত গ্যাসের দাম প্রতি ঘনমিটার ৩০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪০ টাকা এবং একই বছরের নভেম্বরে সার কারখানায় ব্যবহৃত গ্যাসের দাম ১৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৯ টাকা ২৫ পয়সা করা হয়েছিল। এক দশকের বেশি সময় ধরে সিএনজি বিক্রির কমিশন না বাড়ানোয় সিএনজি স্টেশন মালিকদের সংগঠনও তাদের কমিশন বাড়াতে সরকারের উচ্চমহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।

গ্যাসের দাম বাড়ানোর যৌক্তিকতা হিসেবে পেট্রোবাংলা আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির মূল্যবৃদ্ধি ও নিজেদের বিপুল আর্থিক ঘাটতির কথা তুলে ধরেছে। 

সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিভিন্ন উৎস থেকে কেনা গ্যাসের গড় ক্রয়মূল্য ছিল প্রতি ঘনমিটার ৩১ টাকা ৬৫ পয়সা, যার বিপরীতে গড় বিক্রয়মূল্য ছিল ২৩ টাকা ৬৩ পয়সা। এতে প্রতি ঘনমিটারে প্রায় ৮ টাকা শূন্য ২ পয়সা ঘাটতি তৈরি হয়। পরবর্তীতে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালি ঘিরে অস্থিরতার কারণে জানুয়ারি থেকে মার্চ সময়ে গ্যাসের গড় ক্রয়মূল্য ২৭ টাকা ৬৪ পয়সা থাকলেও, এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে তা লাফিয়ে ৪৫ টাকা ৭৯ পয়সায় গিয়ে ঠেকে। ফলে প্রতি ঘনমিটারে পেট্রোবাংলার লোকসান বেড়ে দাঁড়ায় ২১ টাকা ৮২ পয়সায়। সামগ্রিকভাবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পেট্রোবাংলার মোট আর্থিক ঘাটতি দাঁড়ায় প্রায় ১৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, যার বিপরীতে সরকার ভর্তুকি দিয়েছে প্রায় ১৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। দেশীয় উৎস থেকে ১ থেকে ৪ টাকায় গ্যাস পাওয়া গেলেও, কাতার ও ওমান থেকে আমদানি করা এলএনজি এবং বহুজাতিক কোম্পানির গ্যাসের উচ্চমূল্যই এই বিশাল ঘাটতির প্রধান কারণ।

গ্যাসের মূল্যের পাশাপাশি গ্রাহকের পকেট কাটতে বিতরণ মাশুল বাড়ানোর আবেদন করে বসে আছে গ্যাস বিতরণে নিয়োজিত সরকারি কোম্পানিগুলোও। তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসি অনুমোদিত সিস্টেম লস ৫ শতাংশ বিবেচনায় প্রতি ঘনমিটারে ৩৫ পয়সা এবং ২ শতাংশ বিবেচনায় ১ টাকা ৪ পয়সা বিতরণ চার্জ নির্ধারণের বিকল্প প্রস্তাব দিয়েছে। 

আরও পড়ুন: তীব্র গ্যাস সংকট নিয়ে আবারও সতর্ক করল তিতাস

এছাড়া কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি বর্তমান ৩৭ পয়সার পরিবর্তে ১ টাকা ২১ পয়সা, বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি ৩০ পয়সা থেকে ৯০ পয়সা, পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানি ২৪ পয়সা থেকে ৪১ পয়সা, জালালাবাদ গ্যাস ১৮ পয়সা থেকে ৬৩ পয়সা এবং সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানি ২৪ পয়সা থেকে ১ টাকা ৫ পয়সা মাশুল করার আবেদন করেছে। কোম্পানিগুলোর দাবি, বর্তমান মাশুল দিয়ে তাদের পরিচালন ব্যয় মেটানো সম্ভব হচ্ছে না; দীর্ঘদিন এই অবস্থা চলতে থাকলে প্রতিষ্ঠানগুলো গভীর আর্থিক সংকটে পড়বে।

এদিকে দাম বাড়ানোর এই তোড়জোড়ের মধ্যেই দেশে স্মরণকালের অন্যতম ভয়াবহ গ্যাস সংকট চলছে। মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে (এফএসআরইউ) কারিগরি ত্রুটির কারণে টানা দশ দিনের বেশি সময় ধরে গ্যাস সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। দেশে দৈনিক প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে বর্তমানে সরবরাহ নেমে এসেছে মাত্র ২২০ কোটি ঘনফুটে। ফলে প্রায় ৪৫ শতাংশ ঘাটতি নিয়ে আবাসিক গ্রাহকদের চুলা জ্বলছে না, শিল্পোৎপাদনে ধস নেমেছে এবং সিএনজি স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়েছে। 

দেশের শীর্ষ গ্যাস বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান তিতাস এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানিয়েছে, মহেশখালীর টার্মিনাল থেকে সরবরাহ প্রায় ৫৫০ এমএমসিএফডি কমে যাওয়ায় পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত গ্রাহকদের তীব্র স্বল্প চাপের মুখে পড়তে হবে। টার্মিনাল মেরামতে বিলম্বের কারণে এই সংকট আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, দীর্ঘদিন ধরে পর্যাপ্ত অনুসন্ধান কার্যক্রম না চালিয়ে শুধুমাত্র আমদানিনির্ভর নীতির কারণেই আজকের এই ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। ১৯৯৫ সালের জাতীয় জ্বালানি নীতিতে প্রতিবছর অন্তত চারটি অনুসন্ধান কূপ খননের লক্ষ্য থাকলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। বর্তমানে মোট গ্যাস সরবরাহের ৭০ শতাংশ দেশীয় উৎস থেকে এবং ৩০ শতাংশ আমদানির মাধ্যমে আসে। 

তবে পেট্রোবাংলার পূর্বাভাস বলছে, ২০৩০ সালের মধ্যে এই চিত্র সম্পূর্ণ উল্টে যাবে; তখন দেশের মোট গ্যাসের প্রায় ৭০ শতাংশই আমদানি করতে হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ডলার সংকটের এই সময়ে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনে জরুরি ভিত্তিতে বিনিয়োগ না বাড়িয়ে কেবল আমদানিনির্ভরতা বাড়ালে ভবিষ্যতে গ্যাসের দাম ও ভর্তুকির চাপ সামলানো রাষ্ট্রের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়বে। 

উল্লেখ্য, প্রস্তাবিত দাম বৃদ্ধির বিষয়ে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. আব্দুল মান্নান এবং জ্বালানি সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা সাড়া দেননি। 

তবে বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানিয়েছেন, প্রস্তাব হাতে পেলে আইন অনুযায়ী গণশুনানি ও আর্থিক বিশ্লেষণের পর নতুন দামের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। বর্তমান আইনে পেট্রোবাংলার প্রস্তাব সরাসরি কার্যকর হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়