৩ লাখ রোহিঙ্গা ফেরত নেবে মিয়ানমার
ছবি: সংগৃহীত
রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটিয়ে বড় ধরনের একটি কূটনৈতিক অগ্রগতির ইঙ্গিত মিলেছে। দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত ৫ হাজার এবং বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৩ লাখ রোহিঙ্গাকে নিজ দেশে ফিরিয়ে নিতে সম্মত হয়েছে মিয়ানমার।
বুধবার (২৯ জুলাই) মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী দাতুক সেরি আনোয়ার ইব্রাহিম সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ফ্রি মালয়েশিয়া টুডে, দ্য স্টার এবং তুর্কি বার্তা সংস্থা আনাদোলু এজেন্সির প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। আঞ্চলিক এই শরণার্থী সংকটের দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী সমাধান খুঁজে বের করতে মিয়ানমারের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা অব্যাহত রাখার ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন মালয়েশীয় প্রধানমন্ত্রী।
মালয়েশিয়ার উত্তরাঞ্চলীয় পেনাং রাজ্যের একটি অস্থায়ী বসতি ছেড়ে শতাধিক রোহিঙ্গা শরণার্থী রাজধানী কুয়ালালামপুরে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর)-এর কার্যালয়ের সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শনের কয়েক দিন পরেই এই বড় ঘোষণাটি আসে। ওই ঘটনার পর মালয়েশীয় কর্তৃপক্ষ ত্বরিত পদক্ষেপ নিয়ে কুয়ালালামপুর, সেলাঙ্গর এবং পেনাংয়ের বিভিন্ন অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে তাদের স্থানান্তর করে।
দেশের চেন্নাহ এলাকায় স্থানীয় ভোটারদের সঙ্গে এক বৈঠকে এবং পরবর্তী অন্যান্য অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম জানান, মিয়ানমারের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার মাধ্যমেই এই অভাবনীয় সাফল্য অর্জিত হয়েছে।
তিনি বলেন, অনেকে প্রশ্ন তোলেন রোহিঙ্গাদের কেন ফেরত পাঠানো হচ্ছে না? কিন্তু তাদের কোথায় পাঠানো হবে? এতদিন তো মিয়ানমার তাদের গ্রহণ করতে অস্বীকার করে আসছিল। ঠিক এ কারণেই দেশটির সঙ্গে নিবিড় কূটনৈতিক সম্পর্ক রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি ছিল। আমাদের সতর্ক ও বিচক্ষণ কূটনীতির ফলেই মিয়ানমার প্রথম ধাপে মালয়েশিয়া থেকে ৫ হাজার এবং বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৩ লাখ রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নিতে সম্মত হয়েছে। তবে এই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ঠিক কবে থেকে শুরু হবে কিংবা এর সুনির্দিষ্ট কোনো বাস্তবায়ন কৌশল বা সময়সীমা কী হবে, সে বিষয়ে মিয়ানমার বা মালয়েশিয়া সরকারের পক্ষ থেকে এখনো কোনো স্পষ্ট রূপরেখা ঘোষণা করা হয়নি।
আরও পড়ুন: মার্কিন বিশেষ দূত সার্জিও গোরের ঢাকা সফর
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে দেশের অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছেন।
তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, মালয়েশিয়ায় বসবাসকারী রোহিঙ্গা সম্প্রদায়কে অবশ্যই স্থানীয় আইনকানুন কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে এবং সাধারণ জনগণের জন্য কোনো ধরনের জনদুর্ভোগ বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা থেকে বিরত থাকতে হবে। রাস্তাঘাট কিংবা জনবহুল পাবলিক প্লেসে কোনো প্রকার বিশৃঙ্খলা বা আইন অমান্যের ঘটনা বরদাস্ত করা হবে না উল্লেখ করে তিনি দেশটির পুলিশের মহাপরিদর্শককে (আইজিপি) এ বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে এটি সার্বভৌম মালয়েশিয়া রাষ্ট্র, এবং এখানে স্থানীয় আইনের পরিপন্থী কোনো কার্যকলাপ মেনে নেওয়া হবে না।
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা ধারাবাহিক বৈষম্য, চরম নির্যাতন, রাষ্ট্রহীনতা এবং জাতিগত সহিংসতার শিকার হয়ে আসছে সংখ্যালঘু মুসলিম জনগোষ্ঠী রোহিঙ্গা। ২০১৭ সালে মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর ইতিহাসের নৃশংসতম সামরিক অভিযান ও দমনপীড়ন শুরু হলে লাখ লাখ রোহিঙ্গা প্রাণ বাঁচাতে সীমান্ত পেরিয়ে পার্শ্ববর্তী বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণ করে। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রায় ১৩ লাখেরও বেশি বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা বাংলাদেশের বিভিন্ন ক্যাম্পে অত্যন্ত মানবেতর ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছেন। নিজ দেশে মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের কোনো সুনির্দিষ্ট নিশ্চয়তা না থাকায় এবং ক্যাম্পের অভ্যন্তরে অনিশ্চয়তা ও অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ায় বহু রোহিঙ্গা জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়ে বিপজ্জনক সমুদ্রপথ ও দুর্গম স্থলপথ পাড়ি দিয়ে ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার মতো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে অবৈধভাবে প্রবেশের মরিয়া চেষ্টা চালিয়ে আসছেন। আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক মহলের দীর্ঘদিনের চাপ ও উদ্বেগের মুখে মিয়ানমারের পক্ষ থেকে সাড়ে তিন লাখ রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের এই প্রাথমিক সম্মতিকে সংকট সমাধানের দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় একটি সম্ভাব্য মাইলফলক হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








