‘গ্যাস সংকটে পাশে থাকার আশ্বাস মালয়েশিয়ার’
ফাইল ছবি
মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউতে (FSRU) গত ২১ জুলাই সংঘটিত অগ্নিকাণ্ড ও কারিগরি ত্রুটির কারণে সৃষ্ট তীব্র জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের কাছে আনুষ্ঠানিক সহযোগিতা চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সংকট নিরসনে মালয়েশিয়ার সরকার ও দেশটির রাষ্ট্রীয় জ্বালানি খাতের সংশ্লিষ্টদের মাধ্যমে দ্রুত সম্ভাব্য সব ধরনের সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন কুয়ালালামপুর।
মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত এই তথ্য নিশ্চিত করেন।
প্রতিমন্ত্রী জানান, উদ্ভূত পরিস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজে উদ্যোগী হয়ে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে টেলিফোনে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা করেছেন এবং সংকট সমাধানে আন্তর্জাতিক ও দ্বিপক্ষীয় অংশীদারিত্বের ওপর জোর দিয়েছেন।
জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানান, গত সোমবার সংকট নিরসনের সুনির্দিষ্ট অনুরোধ জানিয়ে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের কাছে একটি বিশেষ চিঠি পাঠান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
মঙ্গলবার সকালে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিন কুয়ালালামপুরে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর কাছে সেই চিঠি হস্তান্তর করেন। এরপর বাংলাদেশ সময় দুপুর ২টায় দুই দেশের সরকারপ্রধানের মধ্যে সরাসরি ফোনালাপ অনুষ্ঠিত হয়।
ফোনালাপে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের বর্তমান জ্বালানি পরিস্থিতি এবং গ্যাস সরবরাহ ঘাটতির চিত্র তুলে ধরে মালয়েশিয়ার সহযোগিতা কামনা করেন। জবাবে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম উষ্ণ সাড়া দিয়ে জানান, বাংলাদেশের এই সংকট নিরসনে মালয়েশিয়ার পক্ষ থেকে যা কিছু করার সুযোগ রয়েছে, সে বিষয়ে তিনি দ্রুততম সময়ের মধ্যে তার দেশের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিশেষজ্ঞ টিমের সঙ্গে আলোচনা করবেন। আলোচনা শেষে সহযোগিতার ক্ষেত্র এবং সময়সীমা সম্পর্কে বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করা হবে বলে তিনি আশ্বাস দেন।
সংবাদ সম্মেলনে জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী জানান, মহেশখালীর ওই ভাসমান এলএনজি টার্মিনালটি থেকে এতদিন প্রতিদিন প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হতো। কিন্তু ২১ জুলাই সংঘটিত অগ্নিকাণ্ডে টার্মিনালটির বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা, ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা (কন্ট্রোল সিস্টেম) এবং বিভিন্ন সংবেদনশীল যন্ত্রের ডেটা কেবল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর ফলে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট পর্যন্ত কমে গেছে।
আরও পড়ুন: গ্যাস সংকট স্বাভাবিক হতে আরও ১০-১৫ দিন লাগবে: জ্বালানিমন্ত্রী
ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনালটি পরিচালনাকারী মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির আঞ্চলিক ভাইস প্রেসিডেন্ট আজিজ কাসিমের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল মঙ্গলবার সকালে জ্বালানি বিভাগে এসে সরকারের কাছে তাদের সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরে। বৈঠকে কোম্পানিটির পক্ষ থেকে ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করা হয়।
প্রতিমন্ত্রী জানান, দেশীয় প্রকৌশলীদের পাশাপাশি যুক্তরাজ্য, রোমানিয়া ও সিঙ্গাপুরের আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা টার্মিনালটি সচল করতে দিনরাত কাজ করছেন। এক্সিলারেট এনার্জির পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ এগিয়ে গেলে আগামী সপ্তাহের শুরুতে দৈনিক ২৮০ থেকে ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ পুনরায় চালু করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এরপর পর্যায়ক্রমে পরবর্তী সপ্তাহের শেষের দিকে পুরো এফএসআরইউ সম্পূর্ণ ফাংশনাল ও সচল হবে।
সরকারের দায়িত্বশীল অবস্থান তুলে ধরে জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, এফএসআরইউ বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত একটি স্থাপনা হতে পারে, কিন্তু বর্তমান সরকার জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত। জনগণের প্রতি সরকারের সাংবিধানিক দায়বদ্ধতা রয়েছে বলেই এই সংকটকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে দিনরাত কাজ করছে মন্ত্রণালয় ও এর অধীনস্থ সংস্থা পেট্রোবাংলা ও আরপিজিসিএল। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রতি মুহূর্তে পরিস্থিতির খোঁজখবর নিচ্ছেন এবং সমাধানের জন্য ব্যক্তিগতভাবে তদারকি করছেন।
এর আগে গত ২২ জুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফরকালে প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে দুই দেশের মধ্যে এলএনজি সরবরাহ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং পেট্রোলিয়াম পণ্যের বাণিজ্যে দীর্ঘমেয়াদী সহযোগিতা এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছিল। মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রীয় জ্বালানি জায়ান্ট পেট্রোনাস এবং বাংলাদেশের পেট্রোবাংলার মধ্যে সরাসরি এলএনজি আমদানির প্রক্রিয়া নিয়েও ইতিপূর্বে আলোচনা চলেছে। বর্তমান সংকটের প্রেক্ষাপটে সেই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ভিত্তিকেই কাজে লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শুধু মালয়েশিয়া নয়, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বহুমুখী কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক বিকল্পের ওপর জোর দিচ্ছে সরকার।
জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী জানান, মালয়েশিয়ার পাশাপাশি মঙ্গলবার জাপানের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের সঙ্গেও দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের দীর্ঘমেয়াদী সহযোগিতা এবং স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্প নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।
সংকট নিরসনে সরকারের সীমিত বিকল্পের কথা স্বীকার করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, একটিমাত্র মহেশখালীর এফএসআরইউর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার কারণে এই আকস্মিক দুর্যোগে সমগ্র দেশকে ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে। তবে এই সংকট থেকে শিক্ষা নিয়ে সরকার ভবিষ্যতে জ্বালানি খাতের সাপ্লাই চেইন আরও সুরক্ষিত ও বহুমুখী করতে সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। সাধারণ মানুষের এই সাময়িক কষ্ট লাঘবে সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিটি বিভাগ সর্বোচ্চ আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








