নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ২০:৪৮, ২৭ জুলাই ২০২৬

গ্যাস সংকট স্বাভাবিক হতে আরও ১০-১৫ দিন লাগবে: জ্বালানিমন্ত্রী

গ্যাস সংকট স্বাভাবিক হতে আরও ১০-১৫ দিন লাগবে: জ্বালানিমন্ত্রী

ছবি: সংগৃহীত

মহেশখালীতে মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে (এফএসআরইউ) অগ্নিকাণ্ড ও মারাত্মক যান্ত্রিক ত্রুটির জেরে দেশজুড়ে তীব্র গ্যাস সংকট সৃষ্টি হয়েছে। এই পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে আরও ১০ থেকে ১৫ দিন সময় লাগবে বলে স্পষ্ট জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। 

সোমবার (২৭ জুলাই) বিকেলে রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই তথ্য জানান।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজ (বিআইপিএসএস) আয়োজিত নেভিগেটিং গ্লোবাল শিফটস: ফস্টারিং এনার্জি সিকিউরিটি অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স ইন বাংলাদেশ শীর্ষক এই উচ্চপর্যায়ের গোলটেবিল বৈঠকে দেশের জ্বালানি খাতের বিশিষ্ট নীতিনির্ধারক, সরকারি-বেসরকারি বিশেষজ্ঞ এবং জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন। বৈঠকের মডারেটর ছিলেন বিআইপিএসএসের প্রেসিডেন্ট মেজর জেনারেল (অব.) এ এন এম মুনিরুজ্জামান।

জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বৈঠকে জানান, গত ২১ জুলাই কক্সবাজারের মহেশখালীতে মার্কিন জ্বালানি কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে হঠাৎ আগুনের সূত্রপাত ঘটে। টার্মিনালটি দ্রুত বন্ধ করার প্রক্রিয়ার মধ্যে এর প্রধান বয়লার মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই অপ্রত্যাশিত বিভ্রাটের কারণে বর্তমানে দুটি বড় এলএনজি কার্গো খালাস করা সম্পূর্ণ অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এফএসআরইউ দ্রুত মেরামতের জন্য ইতোমধ্যে বিদেশ থেকে বিশেষায়িত প্রকৌশলীদের একটি দল আনা হয়েছে এবং তারা দিনরাত কাজ করে যাচ্ছেন।

পেট্রোবাংলা এবং জ্বালানি খাতের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দেশে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রূপান্তর ও জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের জন্য মহেশখালীতে দুটি ভাসমান টার্মিনাল বা এফএসআরইউ রয়েছে। একটি পরিচালনা করে মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জি এবং অন্যটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সামিট গ্রুপ। এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশের এলএনজি সরবরাহ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ভেঙে পড়েছে।

বৈঠকে জ্বালানিমন্ত্রী দেশের সামগ্রিক গ্যাসের চাহিদা এবং সরবরাহের যে পরিসংখ্যান তুলে ধরেছেন, তাতে এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে ওঠে। বর্তমানে প্রতিশ্রুত গ্রাহকদের দৈনিক প্রকৃত চাহিদা প্রায় ৫৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট। তবে বাস্তবসম্মতভাবে ৪০০০ মিলিয়ন ঘনফুট চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে অতীতে কমবেশি ২৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হতো। কিন্তু একটি ভাসমান টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর এই সরবরাহ নাটকীয়ভাবে কমে দৈনিক ২১৪৫ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে এসেছে। 

পেট্রোবাংলার সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দিনে এলএনজি থেকে সর্বোচ্চ সরবরাহ ১০৫ কোটি ঘনফুট হলেও অগ্নিকাণ্ডের পর তা গত বৃহস্পতিবার ৫৬ কোটি ঘনফুটে এবং রবিবার ৫০ কোটি ঘনফুটের নিচে নেমে গেছে। এর ফলে সামগ্রিক গ্যাস সরবরাহ ২১৫ কোটি ঘনফুটের নিচে ঠেকেছে, যা দিয়ে রান্নার চুলা থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলোর চাহিদা মেটানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

আরও পড়ুন: গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হতে আরও এক সপ্তাহ

অন্যদিকে, দেশীয় গ্যাস ফিল্ডগুলো থেকেও প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে। একসময়ে দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে দৈনিক ২৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদিত হলেও মজুদ নিঃশেষ হয়ে আসায় বর্তমানে তা কমে মাত্র ১৬৪৫ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে এসেছে। ঘাটতি মেটানোর উদ্দেশ্যে ২০১৮ সাল থেকে এলএনজি আমদানি শুরু করা হয়েছিল। দুটি এফএসআরইউর মাধ্যমে সর্বোচ্চ ১১০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হলেও একটি বন্ধ থাকায় প্রায় ৫৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ চিরতরে সংকুচিত হয়ে গেছে।

দেশীয় উৎপাদন হ্রাসের কারণে দেশের অর্থনীতিকে এখন পুরোপুরি এলএনজি, এলপিজিসহ বিভিন্ন জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার কারণে সরকারের ওপর বড় ধরনের আর্থিক বোঝা তৈরি হয়েছে। 

মন্ত্রী জানান, বিগত মাত্র ছয় মাসে প্রায় ৩ দশমিক ১৯৬৫ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি আমদানি করতে হয়েছে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর এক বিশাল চাপ সৃষ্টি করেছে।

বাংলাদেশের গ্যাস খাত বর্তমানে এক ঐতিহাসিক ও ভয়াবহ সংকটের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে উল্লেখ করে জ্বালানিমন্ত্রী বলেন, বাড়ন্ত চাহিদার বিপরীতে দেশীয় উৎপাদন যেমন কমছে, তেমনি চাইলেই তাৎক্ষণিকভাবে আমদানি বহুগুণ বাড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে এলএনজি আমদানি বাড়াতে হলে নতুন স্থায়ী এলএনজি টার্মিনাল এবং দীর্ঘ পাইপলাইন স্থাপন করা আবশ্যক, যা অত্যন্ত সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। এই কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে শঙ্কা রয়েছে যে, আগামী ২০২৭ ও ২০২৮ সালে দেশের গ্যাস সংকট আরও অনেক বেশি প্রকট আকার ধারণ করতে পারে। অথচ এই দীর্ঘমেয়াদী সংকট মোকাবেলায় অতীতে যে ধরনের কার্যকর ও সময়োপযোগী উদ্যোগ নেওয়া দরকার ছিল, তাতে কাঙ্ক্ষিত গতি দৃশ্যমান ছিল না।

বৈঠকে গ্যাস সংকটের পাশাপাশি বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক সংকটের প্রসঙ্গও অত্যন্ত জোরালোভাবে উঠে আসে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে বিদ্যুৎ খাতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এর অভ্যন্তরীণ আর্থিক দুরবস্থা। বিগত সরকারের আমলে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর (আইপিপি) মালিকদের প্রায় ৫৬ হাজার কোটি টাকার বকেয়া বিল পরিশোধ করা বাকি রয়েছে। বর্তমান সরকারকে এই বিপুল পরিমাণ নিয়মিত বিল পরিশোধের জন্য বড় অঙ্কের ভর্তুকি প্রদান করতে হচ্ছে, যা জাতীয় বাজেটের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।

ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, বিদ্যুৎ খাতের প্রধান সংকট এখন আর্থিক সমস্যা। অতীতে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিকদের হাজার হাজার কোটি টাকার বিল বকেয়া রাখা হয়েছে। সেই বকেয়া ও নিয়মিত বিল পরিশোধে সরকারকে বড় অংকের ভর্তুকি দিতে হচ্ছে।

এই সামগ্রিক আর্থিক ও জ্বালানি সংকট উত্তরণে বর্তমান সরকার জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে সর্বোচ্চ মনোযোগ বাড়িয়েছে বলে জানান মন্ত্রী। 

তিনি উল্লেখ করেন, সরকার সম্প্রতি একটি আধুনিক নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি ঘোষণা করেছে, যার মূল লক্ষ্য আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে অন্তত ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন নিশ্চিত করা। আগামী আগস্ট মাসের মধ্যেই এই কার্যক্রম সফলভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সাথে দরকষাকষি এবং জমি বরাদ্দের জটিল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়