আন্তর্জাতিক ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১১:৪৬, ৭ জুন ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ইসরায়েলি নজরদারি, পেন্টাগনের উদ্বেগ

যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ইসরায়েলি নজরদারি, পেন্টাগনের উদ্বেগ

ফাইল ছবি

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি ও কৌশলগত অংশীদারিত্বের ইতিহাসে নজিরবিহীন এক টানাপোড়েন শুরু হয়েছে দুই পরম মিত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের ভবিষ্যৎ গতিপথ এবং আঞ্চলিক নীতি নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর মধ্যকার মতপার্থক্য এখন আর কেবল কূটনৈতিক টেবিলে সীমাবদ্ধ নেই; তা রূপ নিয়েছে ছায়াযুদ্ধে। 

মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মূল্যায়ন অনুযায়ী, ট্রাম্প প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত ও গোপন আলোচনার তথ্য হাতিয়ে নিতে মার্কিন শীর্ষ কর্মকর্তা ও সামরিক ঘাঁটিতে আগ্রাসী গোয়েন্দা তৎপরতা শুরু করেছে ইসরায়েল। এই আশঙ্কাজনক পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে মার্কিন প্রতিরক্ষা সদরদপ্তর পেন্টাগন ইসরায়েলের কাউন্টার-ইন্টেলিজেন্স বা প্রতি-গোয়েন্দা হুমকির স্তরকে সর্বোচ্চ অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন স্তর বা ‘ক্রিটিক্যাল’ (ঝুঁকিপূর্ণ) হিসেবে উন্নীত করেছে, যা দুই দেশের পারস্পরিক আস্থার সংকটের গভীরতাকে উস্কে দিয়েছে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসি নিউজ, নিউইয়র্ক টাইমস এবং ব্রিটিশ দৈনিক গার্ডিয়ানের সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে জানা গেছে, পেন্টাগনের ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি (ডিআইএ) সম্প্রতি ইসরায়েল সংক্রান্ত একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল অভ্যন্তরীণ নোটিশ জারি করেছে। 

এই নোটিশের সঙ্গে যুক্ত সাত পৃষ্ঠার একটি গোপন মূল্যায়ন নথিতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে, হিউম্যান ইন্টেলিজেন্স (মানুষের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ) এবং টেকনিক্যাল ইন্টেলিজেন্স (প্রযুক্তিগত তথ্য চুরি) উভয় ক্ষেত্রেই ইসরায়েলের সক্ষমতা ও বর্তমান তৎপরতাকে সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ স্তরে বিবেচনা করা উচিত। 

মার্কিন বর্তমান ও সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মতে, প্রতিবেদনে এমন কিছু সুনির্দিষ্ট ঘটনার বিবরণ ও চার্ট অন্তর্ভুক্ত রয়েছে যা মার্কিন নীতি নির্ধারকদের ওপর ইসরায়েলি নজরদারির প্রমাণ দেয়। 

ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংক ট্যাংক ‘সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ’ (সিএসআইএস)-এর প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট এমিলি হার্ডিং এই পরিস্থিতিকে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বলেন, ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ঐতিহাসিকভাবেই ‘অতি-আগ্রাসী’ এবং মার্কিন প্রশাসন কী ভাবছে বা কী করতে যাচ্ছে, তা জানার জন্য তারা সবসময়ই চরম উদ্‌গ্রীব থাকে। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে তাদের এই তৎপরতা মিত্র দেশগুলোর মধ্যে সাধারণত মেনে নেওয়া স্বাভাবিক গুপ্তচরবৃত্তির পরিধিকে ছাড়িয়ে গেছে।

ইসরায়েলি গোয়েন্দা হুমকির মাত্রা সর্বোচ্চ স্তরে উন্নীত হওয়ার পর থেকে ইসরায়েল সফরকারী কিংবা মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত মার্কিন কর্মকর্তা ও সামরিক কর্মীদের জন্য জরুরি ও কঠোর যোগাযোগ প্রোটোকল কার্যকর করা হয়েছে। এখন উচ্চ-পর্যায়ের সফরের সময় মার্কিন কর্মকর্তাদের সাময়িক কম্পিউটার এবং ‘বার্নার ফোন’ (একবার ব্যবহারযোগ্য ফোন) ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। 

সাবেক কূটনীতিক ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে মার্কিন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা ইসরায়েলে অবস্থানকালীন সময়ে হোটেল কক্ষ, লবি বা অন্য কোনো সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে সংবেদনশীল ও নীতিগত বিষয় নিয়ে আলোচনা সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলছেন। এমনকি ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফসহ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তার গতিবিধি ও কর্মকাণ্ডও ইসরায়েলি গোয়েন্দা নজরদারির লক্ষ্যবস্তু হয়েছে বলে নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এই কঠোর প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপগুলো মূলত তেল আবিবের আগ্রাসী তথ্য সংগ্রহের প্রচেষ্টাকে রুখে দেওয়ার জন্য নেওয়া হয়েছে।

ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা তৎপরতা শুধু মার্কিন কর্মকর্তাদের ওপরই সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা খোদ ইসরায়েলের মাটিতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতেও সম্প্রসারিত হয়েছে। 

আরও পড়ুন: ইরানের রাডার স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলা

ব্রিটিশ দৈনিক গার্ডিয়ানের একটি চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলে কিরিয়াত গাত শিল্পাঞ্চলে অবস্থিত যৌথ সামরিক ঘাঁটি ‘সিভিল-মিলিটারি কো-অর্ডিনেশন সেন্টারে’ (সিএমসিসি) মোতায়েনরত মার্কিন বাহিনী ও মিত্রদের ওপর ইসরায়েলি গোয়েন্দারা ব্যাপক নজরদারি ও রেকর্ডিং কার্যক্রম চালাচ্ছে। গত অক্টোবরে গাজায় যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণ, ত্রাণ সমন্বয় এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত ২০ দফা পরিকল্পনার আলোকে গাজার ভবিষ্যৎ নির্ধারণের জন্য এই কেন্দ্রটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। এই ঘাঁটিতে ইসরায়েলের গোপন রেকর্ডিংয়ের বিষয়টি আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার পর, ঘাঁটির মার্কিন কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল প্যাট্রিক ফ্রাঙ্ক অত্যন্ত কঠোর মনোভাব প্রদর্শন করেন। 

তিনি একজন ইসরায়েলি জেনারেলকে সরাসরি ডেকে এনে চরম অসন্তোষ প্রকাশ করে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, এখানে অবিলম্বে সব ধরনের রেকর্ডিং বন্ধ করতে হবে। 

যদিও মার্কিন সামরিক বাহিনী এবং ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) এই বিষয়ে আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, তবে অন্যান্য মিত্র দেশের প্রতিনিধিরা এই নজরদারি নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

এই নজিরবিহীন গোয়েন্দা দ্বন্দ্বের মূল উৎস নিহিত রয়েছে ইরান ও লেবানন ইস্যুতে ট্রাম্প এবং নেতানিয়াহুর সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী সামরিক ও কূটনৈতিক কৌশলের মধ্যে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলার মাধ্যমে শুরু হওয়া যুদ্ধের পর, এপ্রিলের শুরুতে একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। এরপর থেকেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তেহরানের সঙ্গে একটি স্থায়ী ও বিস্তৃত কূটনৈতিক চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য জোরদার প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন। বিপরীতে, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ওয়াশিংটনের এই কূটনৈতিক উদ্যোগের প্রকাশ্য বিরোধিতা করছেন এবং তেহরান কোনো সমঝোতা চুক্তি মেনে চলবে কি না, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে সংশয় প্রকাশ করছেন। একই সঙ্গে লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে পরিচালিত সামরিক অভিযান ও গাজায় দীর্ঘমেয়াদি অবরোধ ধরে রাখা নিয়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়েছে তেল আবিব। সম্প্রতি এক উত্তপ্ত ফোনালাপে দুই নেতার মধ্যকার এই উত্তেজনা চরম রূপ নেয়, যেখানে ট্রাম্প পরবর্তী সময়ে সাংবাদিকদের কাছে স্বীকার করেন যে তিনি নেতানিয়াহুকে ‘পাগল’ বলে সম্বোধন করেছিলেন। মূলত ট্রাম্প প্রশাসনের এই ইরান নীতি সংক্রান্ত অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্তের গতিপ্রকৃতি আগেভাগে জানতেই ইসরায়েল এই আগ্রাসী গোয়েন্দা অভিযান পরিচালনা করছে।

মিত্রদের মধ্যে সীমিত পরিসরে তথ্য সংগ্রহ নতুন কিছু না হলেও, বর্তমান পরিস্থিতিকে ঐতিহাসিক কিছু গোয়েন্দা কেলেঙ্কারির সঙ্গে তুলনা করছেন বিশেষজ্ঞরা। অতীতে ১৯৮০-এর দশকে মার্কিন নৌবাহিনীর গোয়েন্দা বিশ্লেষক জনাথন পোলার্ড যুক্তরাষ্ট্রের অত্যন্ত গোপনীয় নথিপত্র ইসরায়েলের কাছে পাচার করার দায়ে ধরা পড়েন এবং ৩০ বছর কারাভোগ করেন, যা সে সময় দুই দেশের সম্পর্কে বড় ধরনের ফাটল সৃষ্টি করেছিল। আবার ২০১৩ সালে এডওয়ার্ড স্নোডেনের ফাঁস করা নথিতে দেখা গিয়েছিল যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও জার্মানির তৎকালীন চ্যান্সেলর আঙ্গেলা মারকেলসহ তাদের মিত্রদের ওপর নজরদারি চালিয়েছিল। তবে চলমান ইরান সংকটের মতো একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল মুহূর্তে ইসরায়েলি গুপ্তচরবৃত্তির এই নতুন আশঙ্কা দুই দেশের পারস্পরিক বিশ্বাস ও কৌশলগত সহযোগিতাকে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত করার বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোর এই ধারাবাহিক বিস্ফোরক প্রতিবেদন ও পেন্টাগনের উদ্বেগের বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও মিথ্যা বলে উড়িয়ে দিয়েছে ইসরায়েল। 

ওয়াশিংটনে নিযুক্ত ইসরায়েলি দূতাবাসের একজন মুখপাত্র অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে এক বিবৃতিতে বলেছেন, এই দাবি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ও মিথ্যা। ইসরায়েল মার্কিন সরকারি কর্মকর্তা বা আমেরিকান কোনো প্রতিষ্ঠানের ওপর কখনোই গোয়েন্দা নজরদারি চালায় না। আমাদের সমস্ত গোয়েন্দা অভিযান কেবল শত্রুদের বিরুদ্ধে পরিচালিত হয়, মিত্রদের বিরুদ্ধে নয়। 
বিস্ময়করভাবে, হোয়াইট হাউসের একজন কর্মকর্তাও মার্কিন মিডিয়ার এই প্রতিবেদনকে অসত্য বলে দাবি করেছেন এবং বলেছেন যে, অভ্যন্তরীণ ঘটনা সম্পর্কে যাদের সঠিক জ্ঞান নেই, তাদের কাছ থেকেই এই তথ্য নেওয়া হয়েছে। তবে পেন্টাগন ও মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা আনুষ্ঠানিকভাবে এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি না হলেও তারা স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, কাউন্টার-ইন্টেলিজেন্স হুমকি বা এই উচ্চ সতর্কতার কারণে দুই দেশের মধ্যে চলমান গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় বা কৌশলগত সামরিক সহযোগিতা অপরিবর্তিত থাকবে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়