আন্তর্জাতিক ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ২১:০৪, ৫ জুন ২০২৬

‘অবৈধ বাংলাদেশিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে ভারত’

‘অবৈধ বাংলাদেশিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে ভারত’

ছবি: সংগৃহীত

ভারতে অবৈধভাবে অবস্থানরত বাংলাদেশিসহ সমস্ত বিদেশি নাগরিককে চিহ্নিত করে নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে অভ্যন্তরীণ আইন ও বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় চুক্তি অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে নয়াদিল্লি। একই সঙ্গে ভারতে অবৈধভাবে অনুপ্রবেশকারী বা অবস্থানকারীদের নাগরিকত্ব যাচাইয়ের প্রক্রিয়া দ্রুততম সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করতে বাংলাদেশের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে ভারত সরকার। 

ভারত সরকারের দাবি, প্রায় ৩ হাজার নাগরিকত্ব যাচাইয়ের আবেদন বর্তমানে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের কাছে বিচারাধীন রয়েছে, যা নিষ্পত্তি হলেই আনুষ্ঠানিক নির্বাসন বা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু হবে।

শুক্রবার (০৫ জুন) নয়াদিল্লিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত সাপ্তাহিক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল। 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এএনআই ও উইওন (ইয়ন)-এর বরাতে এই ব্রিফিংয়ের বিস্তারিত তথ্য জানা গেছে। ভারতের এই বক্তব্যের বিপরীতে বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও ইতিবাচক কিন্তু নিয়মতান্ত্রিক অবস্থান ব্যক্ত করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, যথাযথ আন্তর্জাতিক ও আইনি নিয়ম মেনে পরিচয় নিশ্চিত হওয়া সাপেক্ষে প্রকৃত বাংলাদেশি নাগরিকদের ফিরিয়ে আনতে ঢাকা প্রস্তুত।

সাপ্তাহিক সংবাদ ব্রিফিংয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল স্পষ্ট করে বলেন, ভারতে অবৈধভাবে বসবাসকারী বিদেশি নাগরিকদের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের শিথিলতা দেখানো হবে না। 

তিনি উল্লেখ করেন, ভারতে অবস্থানরত সব বিদেশি নাগরিকের ক্ষেত্রে, তারা বাংলাদেশি হোক বা অন্য যেকোনো দেশের নাগরিক হোক তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আমাদের নির্দিষ্ট দেশীয় আইন রয়েছে এবং সেই আইন অনুযায়ীই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

অবৈধ অভিবাসীদের পুশ-ব্যাক বা জোরপূর্বক সীমান্ত পার করে দেওয়ার মতো বিতর্কিত প্রক্রিয়ার পরিবর্তে নয়াদিল্লি এবার প্রাতিষ্ঠানিক ও দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক যোগাযোগের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে বলে জানান জয়সওয়াল। 

তিনি বলেন, বাংলাদেশিদের ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে একটি সুনির্দিষ্ট এবং কার্যকর দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থা বা সমঝোতা বিদ্যমান রয়েছে। এই প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত স্বচ্ছ এবং আইনি কাঠামো মেনে পরিচালিত হচ্ছে। ভারতের এই মন্তব্য মূলত সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক অবৈধ পুশ-ইনের অভিযোগের প্রেক্ষাপটে ভারতের আইনি অবস্থানকে স্পষ্ট করার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ভারতের পররাষ্ট্র মুখপাত্র ব্রিফিংয়ে জানান, ইতিমধ্যে ভারতে আটক বা চিহ্নিত সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের একটি তালিকা তৈরি করে তাদের নাগরিকত্ব নিশ্চিত করার জন্য বাংলাদেশের কাছে প্রয়োজনীয় নথিপত্র ও আবেদন পাঠানো হয়েছে। 

জয়সওয়াল বলেন, বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের কাছে বর্তমানে এ সংক্রান্ত প্রায় ৩ হাজার আবেদন বিচারাধীন বা ঝুলে রয়েছে। আমরা প্রত্যাশা করি যে, যত দ্রুত সম্ভব এই আবেদনগুলোর নিষ্পত্তি করা হবে, যাতে ভারতে অবৈধভাবে অবস্থানরত ব্যক্তিদের প্রত্যাবাসন বা নির্বাসন প্রক্রিয়া মসৃণ, সুন্দর এবং দক্ষতার সাথে এগিয়ে নেওয়া যায়।

আরও পড়ুন: ভারত ছাড়তে মরিয়া নথিপত্রহীন অভিবাসীরা

নয়াদিল্লির মতে, এই প্রত্যাবাসন কার্যক্রম সুষ্ঠু ও কার্যকরভাবে এগিয়ে নেওয়া উভয় দেশের সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য জরুরি। তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের জাতীয়তা যাচাইয়ের বিষয়ে ঢাকার কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক ও ইতিবাচক জবাব পাওয়ার পরই ভারত সরকার তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর চূড়ান্ত আইনি প্রক্রিয়া শুরু করতে পারবে।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত সাংবাদিকরা সম্প্রতি বাংলাদেশের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) কর্তৃক জোরপূর্বক মানুষকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর (পুশ-ইন) অভিযোগের বিষয়ে মুখপাত্রের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। এর জবাবে রণধীর জয়সওয়াল সরাসরি পুশ-ইনের অভিযোগ স্বীকার বা অস্বীকার না করে ভারতের আইনি কাঠামোর দিকে ইঙ্গিত করেন। 

তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন যে, অনুপ্রবেশকারীদের সাথে কোনো অপেশাদার আচরণ নয়, বরং ভারতের নিজস্ব আইন অনুযায়ীই তাদের সঙ্গে আচরণ করা হবে এবং দ্বিপক্ষীয়ভাবে নাগরিকত্ব যাচাই করেই তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হবে।

ভারতের এই প্রকাশ্য বক্তব্যের আগে, গত মঙ্গলবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এই বিষয়ে ঢাকার সুনির্দিষ্ট নীতিগত অবস্থান পরিষ্কার করেছিলেন। 

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, কোনো ব্যক্তি যদি প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের নাগরিক হন এবং তিনি অবৈধভাবে অন্য কোনো দেশে অবস্থান করেন, তবে আন্তর্জাতিক আইন ও দ্বিপক্ষীয় নিয়ম মেনে তাকে ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশের কোনো আপত্তি নেই।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, কোনো ব্যক্তি যদি প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের নাগরিক হন এবং অন্য দেশে অবস্থান করেন, তাহলে সংশ্লিষ্ট দেশের কেন্দ্রীয় সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে তালিকা পাঠিয়ে পরিচয় যাচাইয়ের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারে। সেই ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ও আইনগত নিয়ম মেনে প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তবে ভারতের ৩ হাজার আবেদন ঝুলে থাকার দাবির বিপরীতে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কিছুটা ভিন্ন তথ্য দেন। 

তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমানে এই ধরনের কোনো আনুষ্ঠানিক আবেদন বাংলাদেশ সরকারের কাছে বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রক্রিয়াধীন বা ঝুলে নেই। ফলে, ভারতের পাঠানো কথিত তালিকা বা আবেদনগুলো আসলে কোন পর্যায়ে বা কোন দপ্তরে রয়েছে, তা নিয়ে দুই দেশের কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক পর্যায়ে নতুন করে সমন্বয়ের প্রয়োজন হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক মহল।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ভারতের এই দ্বিপক্ষীয় প্রক্রিয়ার ওপর জোর দেওয়ার বক্তব্যটি দুই দেশের সীমান্ত উত্তেজনা কমাতে সহায়ক হতে পারে। তবে ৩ হাজার আবেদনের বিচারাধীন থাকার দাবি এবং বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ‘আবেদন ঝুলে না থাকার’ বক্তব্যের মধ্যে যে তথ্যের অমিল রয়েছে, তা দ্রুত দূর করা প্রয়োজন। দুই দেশের সীমান্ত ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের মাধ্যমে এই তালিকা দ্রুত যাচাই-বাছাই করা গেলে অবৈধ অভিবাসন ও সীমান্ত পুশ-ইনের মতো দীর্ঘদিনের সংবেদনশীল রাজনৈতিক ইস্যুটির একটি টেকসই ও আইনি সমাধান সম্ভব হবে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়