আন্তর্জাতিক ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ২০:৩৫, ২৯ মে ২০২৬

ভারত ছাড়তে মরিয়া নথিপত্রহীন অভিবাসীরা

ভারত ছাড়তে মরিয়া নথিপত্রহীন অভিবাসীরা

ছবি: সংগৃহীত

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও আসাম রাজ্যে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং নথিপত্রবিহীন অভিবাসীদের বিরুদ্ধে আইনি ও প্রশাসনিক কড়াকড়ির জেরে বাংলাদেশ সীমান্তে এক নজিরবিহীন মানবিক সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। ভারতের ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সাম্প্রতিক নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ও কট্টর জাতীয়তাবাদী অবস্থানের বাস্তবায়ন শুরু হতেই রাজ্য দুটিতে বসবাসকারী লাখ লাখ মুসলিম ও কথিত অনথিভুক্ত অভিবাসীদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। আইনি সুরক্ষার অভাব, জাতিগত প্রোফাইলিং এবং ভারতের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক চাপের মুখে হাজার হাজার মানুষ এখন যেকোনো মূল্যে বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা চালাচ্ছেন। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগনার হাকিমপুর সীমান্তচৌকিতে গত কয়েক দিন ধরে সন্তান ও পরিবার নিয়ে শত শত মানুষ চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিনাতিপাত করছেন। 

সীমান্তজুড়ে কঠোর নজরদারি সত্ত্বেও রাতের অন্ধকারে নদী ও উন্মুক্ত সীমান্ত পথ ব্যবহার করে পুশব্যাকের শিকার এবং আতঙ্কিত মানুষের দল বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টা চালাচ্ছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার দুই প্রতিবেশী দেশের ভূরাজনীতি ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় নতুন করে বড় ধরনের উত্তেজনা ও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।

চলতি মে মাসের শুরুতে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে জয়লাভ করে ভারতের কেন্দ্রীয় ক্ষমতাসীন দল বিজেপি সেখানে নতুন রাজ্য সরকার গঠন করে। নির্বাচনী প্রচারণার শুরু থেকেই দলটির প্রধান এজেন্ডা ছিল রাজ্যে বসবাসকারী তথাকথিত নথিপত্রবিহীন অবৈধ অভিবাসীদের, যাদের তারা মূলত ‘বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা’ হিসেবে দাবি করে আসছে, তাদের প্রথমে চিহ্নিত করা, এরপর ভোটার তালিকা ও নাগরিক সুবিধা থেকে বাদ দেওয়া এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে বহিষ্কার বা বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো। সরকার গঠনের পর পরই এই ‘শনাক্তকরণ ও বহিষ্কার’ নীতির আগ্রাসী বাস্তবায়ন শুরু হলে সীমান্ত এলাকাগুলোতে রাতারাতি প্রশাসনিক তৎপরতা ও কড়াকড়ি বৃদ্ধি পায়। এরই অংশ হিসেবে গত সপ্তাহে পশ্চিমবঙ্গ সরকার নথিপত্রবিহীন বা সন্দেহভাজন বিদেশিদের আটকে রাখার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ‘হোল্ডিং সেন্টার’ বা আটক কেন্দ্র (ডিটেনশন ক্যাম্প) নির্মাণের আনুষ্ঠানিক নির্দেশ জারি করেছে। রাজ্য সরকারের এই একটি মাত্র প্রশাসনিক পদক্ষেপ পশ্চিমবঙ্গের প্রায় ৩ কোটি ৫০ লাখ মুসলিম জনগোষ্ঠীর মনে বড় ধরনের মনস্তাত্ত্বিক আঘাত হেনেছে। 

মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, নাগরিকত্বের সঠিক কাগজপত্র না থাকা লাখ লাখ দরিদ্র শ্রমজীবী মানুষ এখন রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়ার এবং বন্দিশিবিরে নিক্ষিপ্ত হওয়ার আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।

কলকাতা থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত উত্তর চব্বিশ পরগনার হাকিমপুর সীমান্ত চৌকিটি এখন ভারতত্যাগে মরিয়া মানুষের প্রধান ট্রানজিট পয়েন্টে পরিণত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক সূত্রে ‘হাকিমপুর দিয়ে বাংলাদেশে ঢোকা সম্ভব’ এমন খবর ছড়িয়ে পড়ার পর কলকাতা ও এর আশপাশের জেলাগুলো থেকে শত শত পরিবার এখানে এসে জড়ো হতে শুরু করেছে। সীমান্ত চৌকির পাশে, খোলা আকাশের নিচে বা নির্মাণাধীন ভবনের মেঝেতে ক্ষুধার্ত শিশুদের নিয়ে পরিবারগুলো মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন। 

এমনই এক ভুক্তভোগী, ৪৫ বছর বয়সী হাসিনা বিবি জানান, ছয় বছর আগে কাজের সন্ধানে তিনি ভারতে এসে কলকাতার একটি নির্মাণাধীন ভবনে শ্রমিকের কাজ শুরু করেছিলেন। কিন্তু হঠাৎ করেই তাদের এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য আলটিমেটাম দেওয়া হয়েছে, অন্যথায় কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে।

এই মানুষদের সংকটকে আরও গভীর করে তুলেছে ভারত ও বাংলাদেশ উভয় দেশের দ্বিমুখী নীতি। একদিকে ভারতের স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ তাদের দেশ ছাড়ার জন্য পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ চাপ দিচ্ছে, অন্যদিকে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিজিবি) এবং সরকারের স্পষ্ট নীতি হলো নাগরিকত্বের সুনির্দিষ্ট ও আনুষ্ঠানিক প্রমাণ ছাড়া কাউকেই বাংলাদেশের ভূখণ্ডে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। এই ত্রিভুজ সংকটে পড়ে শত শত মানুষ এখন গভীর দোটানায়। ২০ বছর বয়সী তরুণ আব্দুল শেখের বক্তব্য এই সংকটের আইনি ও মানবিক জটিলতাকে স্পষ্ট করে তোলে। 

আরও পড়ুন: সীমান্তে জড়ো হওয়া শতাধিক অনুপ্রবেশকারীকে হোল্ডিং সেন্টারে স্থানান্তর

কলকাতায় জন্ম নেওয়া আব্দুল জানান, তার বাবা-মা দুই দশক আগে বাংলাদেশ থেকে ভারতে এসেছিলেন এবং তারা ইতিমধ্যে মারা গেছেন। জন্ম ভারতে হলেও তার কাছে ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রমাণের কোনো বৈধ নথিপত্র নেই। এখন তাকে ভারত ছাড়ার হুমকি দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু বাংলাদেশে তার কোনো আত্মীয় বা শিকড় নেই। ফলে বাংলাদেশে গিয়ে তিনি কীভাবে নিজের পরিচয় প্রমাণ করবেন, তা নিয়ে সম্পূর্ণ দিশেহারা। ৩ বছর আগে বাবার চিকিৎসার জন্য ভারতে গিয়ে আটকা পড়া রাজমিস্ত্রি আরিফুল সরদারের মতো অনেকেই কেবল সরকারি নির্দেশের ভয়ে বাধ্য হয়ে সবকিছু ফেলে সীমান্তে এসে দাঁড়িয়েছেন।

পশ্চিমবঙ্গের এই চরম আতঙ্কের পেছনে মূল অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে প্রতিবেশী রাজ্য আসামের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি। মানবাধিকার সংস্থা ও স্থানীয় অধিকারকর্মীদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, আসামে বিতর্কিত এনআরসি (নাগরিকপঞ্জি) প্রক্রিয়ার পর গত কয়েক মাসে কোনো প্রকার আইনি প্রক্রিয়া বা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে, কেবল ধর্মীয় ও জাতিগত বৈশিষ্ট্যের (মুসলিম) ভিত্তিতে শত শত মানুষকে জোরপূর্বক বাংলাদেশ সীমান্তে ঠেলে দেওয়া (পুশব্যাক) হয়েছে। আসামের এই আগ্রাসী অভিযানের খবর ছড়িয়ে পড়ায় পশ্চিমবঙ্গের অভিবাসী ও সংখ্যালঘু মুসলিমদের মধ্যে প্যানিক বা আতঙ্ক প্রকট রূপ নেয়।

হাকিমপুর সীমান্তে দায়িত্বরত রাজ্য পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সুব্রত সাহা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন যে, গত মঙ্গলবার থেকে দলে দলে মানুষ সীমান্তে আসছেন। 

ভারতীয় কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা অনুযায়ী, সীমান্ত এলাকায় জড়ো হওয়া এসব মানুষদের প্রথমে আটক কেন্দ্রে নিয়ে প্রাথমিক যাচাই-বাছাই করা হবে এবং পরবর্তীতে তাদের ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বা বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সের (বিএসএফ) কাছে হস্তান্তর করা হবে, যাতে বিএসএফ তাদের বাংলাদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে পারে। তবে স্থল সীমান্ত দিয়ে বিজিবির কড়া পাহারার কারণে পারাপার কঠিন হওয়ায়, অনেকেই এখন রাতের অন্ধকারে সীমান্ত ঘেঁষা নদীপথ বেছে নিচ্ছেন। 

বিএসএফের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, সীমান্ত অঞ্চলের ভৌগোলিক গঠন এবং নদীপথ উন্মুক্ত থাকায় রাতের অন্ধকারে সাঁতরে বা নৌকায় নদী পার হওয়া মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। দীর্ঘ ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটারের এই বিশাল ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের অনেক স্থান এখনো অরক্ষিত থাকায় সম্পূর্ণ অনুপ্রবেশ ঠেকানো সীমান্তরক্ষীদের জন্য অত্যন্ত দূরূহ হয়ে পড়েছে।

দক্ষিণ এশিয়ার এই অভিবাসন এবং সীমান্ত সংকটের শিকড় মূলত প্রোথিত ১৯৪৭ সালের ব্রিটিশ ভারত বিভাগের ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডির মধ্যে। সে সময় ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে তৎকালীন বেঙ্গল বা বাংলা প্রদেশকে দ্বিখণ্ডিত করে হিন্দুপ্রধান পশ্চিমবঙ্গকে ভারতের অংশ এবং মুসলিমপ্রধান পূর্ব অংশকে পাকিস্তানের (যা ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশ হয়) অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। দেশভাগের পর থেকেই দুই দেশের সীমান্ত অঞ্চলের মানুষের মধ্যে অর্থনৈতিক সংকট, কর্মসংস্থান, চিকিৎসা এবং দীর্ঘদিনের পারিবারিক ও আত্মীয়তার সম্পর্কের কারণে একটি অলিখিত ও অনানুষ্ঠানিক যাতায়াত বজায় ছিল। পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের মতো সীমান্ত রাজ্যগুলোর আবাসন, কৃষি ও অনানুষ্ঠানিক শ্রমখাতে এই বিশাল শ্রমশক্তি বছরের পর বছর ধরে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।

কিন্তু বর্তমান ভারতের অভ্যন্তরীণ উগ্র জাতীয়তাবাদী রাজনীতি এবং নাগরিকত্ব আইন সংশোধনীর (সিএএ) মতো পদক্ষেপগুলো এই ঐতিহাসিক বাস্তবতা ও মানবিক সম্পর্ককে একটি চরম আইনি ও অস্তিত্বের সংকটে রূপ দিয়েছে। 

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ভারত যদি একতরফাভাবে পুশব্যাকের নীতি বজায় রাখে এবং আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে ঢালাওভাবে মানুষদের সীমান্ত পার করার চেষ্টা করে, তবে তা বাংলাদেশের অর্থনীতি ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করবে। নাগরিকত্বের প্রমাণহীন এই লাখো মানুষের পরিচয় ও অস্তিত্বের সংকট দীর্ঘায়িত হলে তা কেবল দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অবনতি ঘটাবে না, বরং সমগ্র দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলেই একটি স্থায়ী মানবিক ও ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার জন্ম দিতে পারে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়