পেরুতে পর্যটকবাহী বিমান বিধ্বস্ত, নিহত ১৩
ছবি: সংগৃহীত
দক্ষিণ আমেরিকার দেশ পেরুর বিশ্বখ্যাত প্রত্নতাত্ত্বিক ও পর্যটন এলাকা নাজকা লাইনস-এর আকাশে উড্ডয়নের সময় একটি ছোট পর্যটকবাহী বিমান ভয়াবহ দুর্ঘটনায় পতিত হয়েছে।
স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের নিশ্চিত তথ্য অনুযায়ী, এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় বিমানে থাকা ১৩ জনের সবাই নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ১১ জন বিভিন্ন দেশের বিদেশি পর্যটক এবং দুজন বিমানটির ক্রু ও পাইলট।
স্থানীয় সময় শনিবার (০১ আগস্ট) দুপুরের দিকে পেরুর দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় মরুভূমি এলাকার পুয়েবলো ভিয়েহো নামক স্থানে এই দুর্ঘটনা ঘটে।
এরোডিয়ানা এয়ারলাইনসের মালিকানাধীন সেসনা ক্যারাভান সি-২০৮ মডেলের ছোট বিমানটি পাশের ইকা বিভাগের পিসকো বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়ন করেছিল। ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান নাজকা লাইনসের প্রাচীন ও রহস্যময় ভূ-চিত্রগুলো আকাশ থেকে পর্যটকদের দেখানোর জন্য নির্ধারিত নিয়মিত ফ্লাইটের অংশ হিসেবে বিমানটি আকাশে ওড়ে।
নাজকা শহরের অদূরে একটি ফাঁকা মাঠে বিমানটি হঠাৎ আছড়ে পড়ে এবং মুহূর্তেই এতে ভয়াবহ আগুন ধরে যায়। দুর্ঘটনাস্থল থেকে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিওচিত্রে দেখা যায়, বিধ্বস্ত বিমানের ধ্বংসস্তূপ থেকে তীব্র ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকাচ্ছে এবং আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে ফায়ার সার্ভিস ও দমকলকর্মীরা আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছেন।
দুর্ঘটনাস্থলে উপস্থিত পুলিশ কর্মকর্তা মেজর জর্জ আন্দ্রাদে (Jorge Andrade) গণমাধ্যমকে জানান, বিমানটি এতটাই ভয়াবহভাবে বিধ্বস্ত হয়েছে যে ভেতরে থাকা কারো পক্ষেই বেঁচে থাকা সম্ভব ছিল না। উদ্ধারকারীরা ঘটনাস্থল থেকে ইতোমধ্যে কয়েকটি মরদেহ উদ্ধার করেছেন এবং উদ্ধার ও তল্লাশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
আরও পড়ুন: মস্কোর ইতালিয়ান রেস্তোরাঁয় ভয়াবহ বিস্ফোরণে নিহত ৩, আহত ২১
পেরুর রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আন্দিনা এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে, এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো ১৩ জনের মধ্যে ১১ জনই বিদেশি পর্যটক। তাদের মধ্যে সর্বোচ্চ সংখ্যক নাগরিক ছিলেন ইতালির। নিহতদের মধ্যে ৭ জন ইতালি, ২ জন জার্মানি এবং ২ জন স্পেনের নাগরিক। বাকি দুজন ছিলেন বিমানটির পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ক্রু বা পাইলট।
নাজকা প্রাদেশিক পৌর কর্তৃপক্ষ এবং পেরুর বৈদেশিক বাণিজ্য ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এই আকস্মিক প্রাণহানিতে গভীর শোক প্রকাশ করেছে।
নিহত পর্যটকদের পরিবারের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জানিয়ে স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত বিমানটির পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান অ্যারোডিয়ানা গত ১৪ বছর ধরে সেসনা গ্র্যান্ড ক্যারাভান বিমানের মাধ্যমে নিরাপদে নাজকা লাইনস দর্শনার্থীদের দেখিয়ে আসছে। দুর্ঘটনার পর এয়ারলাইনস কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা সংশ্লিষ্ট সরকারি ও বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের সকল নির্দেশনা অনুসরণ করে নিজেদের ফ্লাইট পরিচালনা ও সার্বিক নিরাপত্তা কার্যক্রম পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করবে। একই সঙ্গে কী কারণে এই দুর্ঘটনা ঘটেছিল, তা উদ্ঘাটনে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
দক্ষিণ আমেরিকার অন্যতম প্রধান পর্যটননির্ভর দেশ পেরু। দেশটির ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো দেখতে প্রতিবছর বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে লাখ লাখ পর্যটক ভিড় করেন। এর মধ্যে পেরুর দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় মরুভূমিতে অবস্থিত নাজকা লাইনস অন্যতম। ধারণা করা হয়, খ্রিস্টপূর্ব ৫০০ থেকে খ্রিস্টাব্দ ৫০০ সালের মধ্যে প্রাচীন আদিবাসীরা মরুভূমির বালুর ওপরে এই বিশাল আকৃতির ভূ-রেখাচিত্রগুলো অঙ্কিত করেছিল। প্রাণী, উদ্ভিদ, কাল্পনিক সত্তা এবং কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ জ্যামিতিক নকশার এই প্রাচীন নিদর্শনগুলো জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা ইউনেস্কো কর্তৃক বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে স্বীকৃত। ইউনেস্কো এই স্থানটিকে প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণার অন্যতম শ্রেষ্ঠ রহস্য হিসেবে বর্ণনা করেছে।
বিশাল আকৃতির কারণে নাজকা লাইনসের জ্যামিতিক নকশা ও চিত্রগুলো মাটি থেকে সম্পূর্ণ স্পষ্ট দেখা যায় না। এগুলো পরিষ্কারভাবে উপভোগ করার জন্য পর্যটকদের একমাত্র ভরসা ছোট বিমান বা ওয়াচটাওয়ার। ফলে প্রতিদিন শত শত পর্যটক ছোট বিমান নিয়ে আকাশে ওড়েন।
তবে পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় এই আকাশভ্রমণ দীর্ঘদিন ধরেই নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে রয়েছে। নাজকা লাইনস এলাকায় এর আগেও একাধিক ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনা ঘটার রেকর্ড রয়েছে। ইতিপূর্বে ২০২২ সালে একই এলাকায় একটি পর্যটকবাহী ছোট বিমান বিধ্বস্ত হয়ে ৭ জনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছিল। এছাড়া ২০১০ সালের আরেকটি পৃথক দুর্ঘটনায় ছয়জন পর্যটক ও পাইলট নিহত হয়েছিলেন। একের পর এক এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটার পর স্থানীয় পর্যটন খাত ও বিমান চলাচল নিরাপত্তা নিয়ে দেশজুড়ে নতুন করে উদ্বেগ ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








