ইরানে হামলা বাতিলের ঘোষণা ট্রাম্পের
ফাইল ছবি
মধ্যপ্রাচ্যে তীব্র সামরিক উত্তেজনার অবসান ঘটিয়ে আকস্মিক এক মোড় নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সম্পর্ক। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, তেহরানের সঙ্গে দ্রুত একটি সমঝোতা চুক্তিতে পৌঁছানোর শর্ত সাপেক্ষে তিনি ইরানের ওপর পরিকল্পিত বড় ধরনের সামরিক হামলা স্থগিত বা বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় ধরনের সামরিক শক্তি প্রয়োগের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছিল। তবে সম্ভাব্য একটি চুক্তির মৌলিক কাঠামো নিয়ে অগ্রগতি হওয়ায় এবং ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের অনুরোধে তিনি আপাতত হামলা থেকে সরে এসেছেন। যদিও ট্রাম্পের এ দাবির বিষয়ে ইরান কিংবা ইসরাইলের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
ট্রাম্প তার পোস্টে বলেন, বিশ্বের ভবিষ্যৎ কল্যাণ এবং একটি সফল ও সমৃদ্ধ ইরানের স্বার্থে তিনি হামলা বাতিল করতে রাজি হয়েছেন, তবে শর্ত একটাই অতি দ্রুত একটি চূড়ান্ত চুক্তি সম্পন্ন করতে হবে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, সম্ভাব্য ওই সমঝোতার আওতায় হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ উন্মুক্ত রাখা হবে এবং ইরানের পারমাণবিক হুমকির অবসান ঘটানো হবে।
একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, ইসরাইলও এ সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত হয়েছে এবং এখন সংশ্লিষ্ট সবাইকে দ্রুত চুক্তি সম্পন্ন করার আহ্বান জানান।
এই ঘোষণার আগে মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোতে খবর প্রকাশিত হয়, ট্রাম্প প্রশাসন চলতি সপ্তাহান্তে ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোসহ গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে নতুন করে বড় ধরনের হামলার পরিকল্পনা করছিল। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ট্রাম্প একাধিকবার ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর সামরিক পদক্ষেপের হুমকি দিয়েছিলেন। এমনকি মন্ত্রিসভার বৈঠকেও তিনি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, প্রয়োজন হলে এমন হামলা চালানো হবে যাতে ইরান যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। তবে শেষ মুহূর্তে কূটনৈতিক অগ্রগতির সম্ভাবনা সামনে আসায় অবস্থান বদলান তিনি।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প দাবি করেছেন যে ইরান এবং মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ হামলা স্থগিত রাখার অনুরোধ জানিয়েছে, যাতে আলোচনার মাধ্যমে একটি চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছানো যায়।
আরও পড়ুন: যুক্তরাষ্ট্রের ঢাল হলে যুদ্ধের আগুনে পুড়বে মুসলিম দেশগুলো: ইরান
তিনি আরও জানান, আলোচনায় তার প্রশাসনের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সক্রিয়ভাবে যুক্ত রয়েছেন। তবে একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, ইরান প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না করলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বিকল্প এখনও বহাল রয়েছে।
এদিকে ইরানও অবস্থান নরম করার কোনো ইঙ্গিত দেয়নি। তেহরান বরাবরের মতো যুক্তরাষ্ট্রকে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধির জন্য দায়ী করেছে এবং সতর্ক করে বলেছে, ওয়াশিংটনের সঙ্গে সহযোগিতা করবে এমন যেকোনো আঞ্চলিক রাষ্ট্রও সংঘাতের বাইরে থাকবে না।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে পৃথক টেলিফোন আলাপে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সম্ভাব্য যেকোনো আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কঠোর ও উপযুক্ত জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি পুনর্ব্যক্ত করেন।
অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির আশঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্র সরকার ওই অঞ্চলে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছে। পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে দ্রুত অঞ্চল ত্যাগের প্রস্তুতি রাখতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাতের প্রেক্ষাপটে মার্কিন মিত্র ইসরাইলও নিরাপত্তা সতর্কতা জোরদার করেছে।
দেশটির বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালালে ইরানের পাল্টা হামলার সম্ভাবনা মাথায় রেখে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সর্বোচ্চ প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
ইসরাইলি সংবাদমাধ্যমগুলোর দাবি, দেশটির সামরিক নেতৃত্ব মনে করছে, প্রয়োজন হলে ট্রাম্প খুব অল্প সময়ের নোটিশেই ইরানের জ্বালানি স্থাপনায় হামলার নির্দেশ দিতে পারেন। একই কারণে ইসরাইল নিজস্ব সামরিক প্রস্তুতিও জোরদার করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান উত্তেজনা এখনো পুরোপুরি প্রশমিত হয়নি; বরং সামরিক চাপ এবং কূটনৈতিক আলোচনার সমান্তরাল কৌশলই অনুসরণ করছে ওয়াশিংটন।
পর্যবেক্ষকদের মতে, ট্রাম্পের সাম্প্রতিক ঘোষণা একদিকে সম্ভাব্য সামরিক সংঘাত এড়ানোর বার্তা দিলেও অন্যদিকে এটি ইরানের ওপর চাপ বজায় রাখার কৌশলের অংশ। কারণ হামলা স্থগিতের ঘোষণা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র এখনো সামরিক প্রস্তুতি শিথিল করেনি এবং আলোচনায় কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি না হলে পরিস্থিতি আবারও দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি, হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ঘিরে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ এখনো পুরোপুরি কাটেনি।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








