যুক্তরাষ্ট্রের ঢাল হলে যুদ্ধের আগুনে পুড়বে মুসলিম দেশগুলো: ইরান
মেজর জেনারেল আলী আবদুল্লাহি। ছবি: সংগৃহীত
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান তীব্র সামরিক উত্তেজনার মধ্যেই ওই অঞ্চলের মুসলিম দেশগুলোকে নজিরবিহীন কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্ভাব্য বড় ধরনের হামলা মোকাবিলায় মুসলিম বিশ্বকে মার্কিন জোটবদ্ধতা থেকে অবিলম্বে সরে আসার আহ্বান জানিয়েছে তেহরান।
একই সঙ্গে আমেরিকার সামরিক সুরক্ষায় সাহায্যকারী যেকোনো দেশকে সরাসরি যুদ্ধের আগুনে পুড়তে হবে বলে যে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে, তাতে পুরো অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক উদ্বেগ নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে।
ইরানের যুদ্ধকালীন সামরিক কমান্ডের প্রধান এবং খাতাম আল-আনবিয়া কেন্দ্রীয় সদর দপ্তরের কমান্ডার মেজর জেনারেল আলী আবদুল্লাহি এক গুরুত্বপূর্ণ বিবৃতিতে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র খুব দ্রুততার সঙ্গে একটি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধের আগুন ছড়িয়ে দেওয়ার দিকে এগোচ্ছে। তেহরানের কৌশলগত অবস্থান হলো, ওয়াশিংটন নিজেদের স্বার্থরক্ষায় মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের রাজধানী, অর্থনৈতিক সম্পদ এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে। একই সঙ্গে এগুলোকে ইসরায়েলের যুদ্ধযন্ত্রকে শক্তিশালী করার কাজে লাগাচ্ছে।
মেজর জেনারেল আবদুল্লাহি আঞ্চলিক দেশগুলোকে উদ্দেশ্য করে বলেন, মুসলিম দেশগুলোকে অবশ্যই দূরদর্শিতার সঙ্গে আমেরিকার অপরাধগুলো নজরদারিতে রাখতে হবে এবং তাদের সঙ্গে সহযোগিতা ও জোটবদ্ধতার বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করতে হবে। অন্যথায়, যে দেশই অপরাধী ও আক্রমণকারী আমেরিকার আত্মরক্ষার ঢাল হিসেবে নিজেকে সঁপে দেবে, সে যুদ্ধের আগুনে পুড়বে। পার্সটুডে ও তাসনিম নিউজের মতো ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমগুলোতেও এই বার্তা জোরালোভাবে প্রচারিত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনের প্রতিক্রিয়ায় মূলত ইরান এই কঠোর সতর্কতা জারি করেছে।
ওই প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও পেট্রোকেমিক্যালের মতো ইরানের বেসামরিক অবকাঠামোতে খুব শীঘ্রই এক দফায় ব্যাপক হামলা শুরু করতে পারে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই অভিযানের চূড়ান্ত অনুমোদন না দিলেও, দুই সপ্তাহব্যাপী এই সম্ভাব্য অভিযানের মূল লক্ষ্য হতে পারে ইরানের রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন শহরের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে দেশজুড়ে বিশৃঙ্খলা তৈরি করা।
এদিকে, ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংক ট্যাংক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (CSIS)-এর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সামগ্রিকভাবে ভালো পারফর্ম করলেও ক্রমাগত সামরিক অভিযানের কারণে মার্কিন সেনাবাহিনীর ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধকের (ইন্টারসেপ্টর) মজুদ আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। বর্তমানে তাদের হাতে প্যাট্রিয়টের মজুদ ১ হাজারের নিচে এবং টার্মিনাল হাই–অলটিট্যুড এয়ার ডিফেন্স বা থাডের (THAAD) মজুদ প্রায় ২৫০-এ নেমে এসেছে। এর ফলে মার্কিন সামরিক কৌশল চাপে রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
আরও পড়ুন: বিরতি ভেঙে ইরানে নতুন করে মার্কিন হামলা
অন্যদিকে, ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ সম্প্রতি দেশটির সম্প্রচারমাধ্যম চ্যানেল ১৪-এ প্রচারিত এক নিরাপত্তা সম্মেলনে বলেন, তারা ইরানের জ্বালানি লক্ষ্যবস্তুগুলোতে হামলা চালাতে অত্যন্ত আগ্রহী। তবে যুক্তরাষ্ট্র আপাতত এটি অনুমোদন না করায় ইসরায়েল কিছুটা সংযত রয়েছে, কারণ ওয়াশিংটনের আশঙ্কাএর জবাবে ইরান প্রতিবেশী দেশগুলোতে হামলা চালাতে পারে এবং বিশ্বজুড়ে ভয়াবহ জ্বালানি তেল সংকট তৈরি হতে পারে। ইসরায়েল যেকোনো মূল্যে ইরানকে ৪০ বছর পেছনে ফেলে দিতে প্রস্তুত বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল পুরো ইরানজুড়ে সামরিক ঘাঁটি, শীর্ষ নেতৃত্ব এবং বেসামরিক অবকাঠামোগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করে হামলা চালিয়ে আসছে। এই ধ্বংসযজ্ঞের ফলে ইরানের অভ্যন্তরীণ দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে; সংকুচিত অর্থনীতি এবং চরম জ্বালানি ভারসাম্যহীনতা দেশটির ৯ কোটিরও বেশি নাগরিককে গভীর সংকটে ফেলেছে।
এর জবাবে ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এবং ইরানের নিয়মিত সেনাবাহিনী পুরো অঞ্চলজুড়ে মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক ঘাঁটিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। শুধু তাই নয়, ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলার পাল্টা জবাব হিসেবে ইসরায়েল ছাড়াও সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন এবং ওমানের জ্বালানি স্থাপনাগুলোতেও আঘাত হেনেছে।
সবকিছু ছাপিয়ে কূটনীতির পথ এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। ইরান পরিষ্কার করে জানিয়েছে, মার্কিন আক্রমণ মোকাবিলার কৌশলগত চাল হিসেবে তারা হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ হাতছাড়া করতে চায় না। দেশটির সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহাম্মদ বাঘের জোলঘাদর উল্লেখ করেছেন যে, সামরিক হামলা অব্যাহত রাখা এবং যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ কেবল হরমুজ প্রণালী এবং অন্যান্য জলপথের পরিস্থিতিকে আরও আশঙ্কাজনক করে তুলছে। এর মাসুল বিশ্ব অর্থনীতি, যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বাজার এবং খোদ মার্কিন ভোটারদেরই দিতে হবে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে তারা ওয়াশিংটনের কাছে সরাসরি আলোচনার কোনো অনুরোধ পাঠায়নি। তবে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে বার্তা আদান-প্রদান অব্যাহত রয়েছে এবং পরিস্থিতি শান্ত হলে কীভাবে প্রণালীটি পুনরায় চালু করা যায় তা নিয়ে আলোচনা চলছে। এরই ধারাবাহিকতায় ইরানের প্রধান মধ্যস্থতাকারী ও পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ সামরিক পদক্ষেপ থেকে অর্জিত সাফল্যগুলোকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে একটি সমঝোতামূলক নিষ্পত্তিতে পৌঁছানোর সংকেত দিয়েছেন। কট্টরপন্থি আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে এক বৈঠকে তিনি বলেন, সামরিকভাবে তারা বিজয়ী হয়েছেন এবং এখন এই বিজয়কে নথিবদ্ধ ও সুসংহত করতে হবে।
সবমিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান রণক্ষেত্র এক অত্যন্ত সংবেদনশীল মোড় নিয়েছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্ভাব্য নতুন দফার বিধ্বংসী আক্রমণ এবং অন্যদিকে ইরানের কঠোর হুশিয়ারি ও আঞ্চলিক অংশীদারদের ওপর সম্ভাব্য আঘাতের আশঙ্কায় গোটা বিশ্ব এখন গভীর শঙ্কার সঙ্গে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








