আন্তর্জাতিক ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৮:১৯, ৩১ জুলাই ২০২৬

নেপালে হিন্দু-মুসলিম সংঘর্ষে প্রাণহানি ৩

নেপালে হিন্দু-মুসলিম সংঘর্ষে প্রাণহানি ৩

ছবি: সংগৃহীত

নেপালের দক্ষিণাঞ্চলে হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে সংঘটিত সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের ঘটনায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে তিনজনে দাঁড়িয়েছে। এই রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও দেশের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে পড়া অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে দেশবাসীকে শান্তি বজায় রাখার জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ। গত মার্চে দায়িত্ব গ্রহণের পর এটি ছিল জাতির উদ্দেশে তার প্রথম গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ।  

সংঘর্ষের সূত্রপাত যেভাবে
সরকারি কর্মকর্তা ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্যানুযায়ী, গত ২৬ জুলাই রবিবার ভারত সীমান্তবর্তী সুনসারি জেলার দিওয়ানগঞ্জ গ্রামে হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি ধর্মীয় শোভাযাত্রা ও র‌্যালিকে কেন্দ্র করে এই বিরোধের সূত্রপাত হয়। 

শোভাযাত্রায় উচ্চ শব্দে গান বাজানো এবং ধর্মীয় পতাকা টাঙানোকে কেন্দ্র করে স্থানীয় হিন্দু ও মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রথমে তুমুল বাক্‌বিতণ্ডা ও পরে তা সংঘর্ষে রূপ নেয়। 

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গুলি চালালে ঘটনাস্থলেই ওম প্রকাশ মেহতা নামের এক তরুণ নিহত হন। এছাড়া সংঘর্ষে গুরুতর আহত জয় প্রকাশ মেহতা চিকিৎসাধীন অবস্থায় পরবর্তী সময়ে মারা যান।  

অস্থিরতা পার্শ্ববর্তী জেলায় বিস্তার ও প্রাণহানি
সুনসারির এই সংঘর্ষের জেরে উত্তেজনা দ্রুত পার্শ্ববর্তী তেরাই ও মধেজ অঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রশাসন সুনসারি, সিরাহা, সপ্তরি, ধনুশা ও পারসা জেলাসহ সংবেদনশীল এলাকাগুলোতে কঠোর কারফিউ এবং জরুরি নিষেধাজ্ঞা জারি করে। কারফিউ অমান্য করে গত বৃহস্পতিবার পার্শ্ববর্তী সিরাহা জেলার গোলবাজার এলাকায় বিক্ষোভ ও ভাংচুরের ঘটনা ঘটে। 

এ সময় নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে সংঘর্ষে ১৭ বছর বয়সী কিশোর গণেশ যাদব গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। সহিংসতায় এ পর্যন্ত পুলিশ সদস্যসহ অন্তত পঁচিশ জন আহত হয়েছেন, এবং বেশ কিছু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সম্পত্তিতে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের খবর পাওয়া গেছে।  

আরও পড়ুন: মরক্কো থেকে স্পেনে ৪৯ হাজার অভিবাসীর অনুপ্রবেশ

প্রধানমন্ত্রীর জাতির উদ্দেশে ভাষণ ও শান্তিপ্রচেষ্টা
দেশের এই সংকটময় পরিস্থিতিতে গত বৃহস্পতিবার জাতির উদ্দেশে প্রথম বড় ধরনের ভাষণ দেন প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ। 

নাগরিকদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, আসুন, সবাই মিলে অশান্তির মেঘ দূর করি। 

সরকারের পক্ষ থেকে সব নাগরিক, সুশীল সমাজ, ধর্মীয় সম্প্রদায়, রাজনৈতিক দল ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যমের প্রতি ধৈর্য ও সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, দেশে শান্তি, সম্প্রীতি, ভ্রাতৃত্ব এবং জাতীয় ঐক্য রক্ষা করাই এই মুহূর্তে সরকারের প্রধান লক্ষ্য।  

প্রধানমন্ত্রী স্পষ্টভাবে ঘোষণা দেন যে, পুরো ঘটনার একটি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত করা হবে। এই সহিংসতার পেছনে যারাই জড়িত থাকুক না কেন, তাদের আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির মুখোমুখি করা হবে। ইতোমধ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুদান গুরুং সুনসারিতে নিহতদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন এবং সরকারের পক্ষ থেকে নিহত প্রত্যেক পরিবারকে ১০ লাখ নেপালি রুপি আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।  

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা
পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রাখতে নেপাল পুলিশ, আর্মড পুলিশ ফোর্স (এপিএফ) এবং নেপাল সেনাবাহিনীকে যৌথভাবে মাঠে নামানো হয়েছে। 

পুলিশের মুখপাত্র আবি নারায়ণ কাফলে জানিয়েছেন, অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে সব সদস্যকে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রাখা হয়েছে। জনসাধারণের জানমাল রক্ষা এবং সরকারি সম্পত্তি সুরক্ষায় ন্যূনতম বলপ্রয়োগের নীতি নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করছে। সীমান্ত এলাকায় নজরদারি জোরদার করা হয়েছে এবং অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে বিভিন্ন স্থানে অনির্দিষ্টকালের জন্য কারফিউ বলবৎ রয়েছে।  

উল্লেখ্য, ২০২১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী নেপালের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮১ শতাংশ হিন্দু এবং প্রায় ৫ শতাংশ মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ। দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় তেরাই অঞ্চলে মুসলিম জনগোষ্ঠীর বসবাস তুলনামূলকভাবে বেশি হওয়ায় এর আগেও ছোটখাটো সামাজিক বা ডিজিটাল মাধ্যমভিত্তিক উত্তেজনার ঘটনা ঘটেছিল, তবে এবারের সংঘাত জাতীয় রাজনীতিতে বড় ধরনের উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়