মরক্কো থেকে স্পেনে ৪৯ হাজার অভিবাসীর অনুপ্রবেশ
ছবি: সংগৃহীত
মরক্কো সীমান্তঘেঁষা স্পেনের উত্তর আফ্রিকান ছিটমহল সেউতায় নজিরবিহীন অভিবাসী অনুপ্রবেশের ঘটনা ঘটেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় স্থল ও সমুদ্রপথে হাজার হাজার মানুষ মরক্কো থেকে ভূখণ্ডটিতে প্রবেশ করেছেন। এই পরিস্থিতিতে সীমান্ত পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং নিরাপত্তা জোরদার করতে সেখানে জরুরি ভিত্তিতে অতিরিক্ত নিরাপত্তা বাহিনী ও সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েন করেছে স্পেন সরকার। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ফার্নান্দো গ্রান্দে-মারলাস্কা দ্রুত অঞ্চলটি পরিদর্শনে যান।
স্থানীয় গণমাধ্যম এবং আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) হঠাৎ করেই মরক্কোর দিক থেকে শত শত মানুষ সীমানা প্রাচীর ভেঙে, জেটির পাথর ঘেঁষে এবং সমুদ্রপথে সাঁতরে সেউতায় প্রবেশ করতে শুরু করে।
স্প্যানিশ টেলিভিশন এবং সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রাথমিক হিসাবে প্রায় দুই থেকে তিন হাজার মানুষ একদিনেই প্রবেশ করেছে বলে জানানো হলেও, কিছু সূত্র ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে এই সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সারারাত ধরে এই অনুপ্রবেশ অব্যাহত ছিল এবং সীমান্ত এলাকায় পুলিশ ও অভিবাসীদের মধ্যে সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া চলে।
এই বিশাল জনস্রোতের মধ্যে তরুণ ও পুরুষের সংখ্যাই বেশি হলেও নারী, শিশু এমনকি বহু অপ্রাপ্তবয়স্ক ও পরিবারও রয়েছে। হঠাৎ করে এত বিপুলসংখ্যক মানুষের এই প্রবেশে সেউতার সীমান্ত ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। অনুপ্রবেশের এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে সাগরে ডুবে এবং বিভিন্ন দুর্ঘটনায় অন্তত ৯ থেকে ১৮ জনের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে।
স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সেউ্তায় প্রবেশের চেষ্টা করতে গিয়ে প্রাণ হারানো মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
আফ্রিকায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের একমাত্র দুটি স্থল সীমান্তের একটি হলো স্পেনের এই সেউতা ও মেলিলা অঞ্চল। মরক্কো এই শহর দুটি নিজেদের বলে দাবি করে আসায় দীর্ঘদিন ধরেই স্পেনের সঙ্গে কূটনৈতিক টানাপোড়েন চলে আসছে।
তবে মাদ্রিদের স্পষ্ট অবস্থান হলো, এই অঞ্চল দুটি স্পেনের মূল ভূখণ্ডের আধা-স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলগুলোর মতোই অবিচ্ছেদ্য অংশ।
চলতি মাসেই স্পেনের সুপ্রিম কোর্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ রায় দেন। ওই আদেশে বলা হয়, সেউতা বা মেলিলায় পৌঁছানোর চেষ্টা করার সময় সমুদ্রে ধরা পড়া অভিবাসীদের সোজাসুজি বা অবিলম্বে মরক্কোতে ফেরত পাঠানো যাবে না। অভিবাসন বিশেষজ্ঞ ও স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মনে করছে, মানবপাচারকারী চক্রগুলো এই আইনি রায়কে কাজে লাগিয়ে অভিবাসীদের সীমান্ত পার হতে উৎসাহিত করেছে, যার ফলে এই বিস্ফোরণমুখ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
এছাড়া স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের সাম্প্রতিক আলজেরিয়া সফরও এই কূটনৈতিক বিরোধকে কিছুটা চাঙ্গা করে তুলেছে, কারণ আলজেরিয়া পশ্চিম সাহারার স্বাধীনতাকে সমর্থন করে।
আরও পড়ুন: শেখ হাসিনাকে ভারতে রাজনীতি করতে দেওয়া হয়নি: মোদি সরকার
সেউতার এই ঘটনায় দ্রুত সরব হয়েছে ইউরোপের অন্যান্য দেশ। ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি এই পরিস্থিতিকে স্তম্ভিত করার মতো বলে অভিহিত করেছেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন যে, এমন নিয়ন্ত্রণহীন অভিবাসন ইউরোপীয় নিরাপত্তার জন্য একটি বাস্তব হুমকি।
তিনি স্পেন থেকে মুক্ত চলাচলের সুবিধা সংক্রান্ত শেনজেন জোন চুক্তি স্থগিত করার বিষয়টি ইতালি বিবেচনার কথাও জানান। ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তাজানিও একই ধরনের মন্তব্য করেন।
তবে ইতালীয় শীর্ষ নেতাদের এমন মন্তব্যে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছে মাদ্রিদ। স্পেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোসে ম্যানুয়েল আলবারেস অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল বা সস্তা প্রচারের জন্য অভিবাসন ইস্যুটিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ইউরোপীয় সংহতির প্রত্যাশা করা যায় এমন একটি বন্ধু ও অংশীদার দেশের কাছ থেকে এমন মন্তব্য সম্পূর্ণ অনুচিত। এই ঘটনার জেরে মাদ্রিদে নিযুক্ত ইতালির রাষ্ট্রদূতকে তলব করে স্পেন।
হঠাৎ এই নজিরবিহীন পরিস্থিতিতে সেউতার স্থানীয় কর্তৃপক্ষ চরম উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে। শহরের মোট জনসংখ্যা প্রায় ৮৩ হাজার ৬০০ জন হওয়ায়, এক দিনে হাজার হাজার মানুষের প্রবেশ স্থানীয় প্রশাসন ও অভিবাসী গ্রহণকেন্দ্রগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে। সেউতার মেয়র হুয়ান হেসুস ভিভাস পরিস্থিতিকে সংকটজনক বলে বর্ণনা করেছেন। স্থানীয় বহু দোকানপাট ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নিরাপত্তার স্বার্থে বন্ধ রাখা হয়েছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্পেনের কেন্দ্রীয় সরকার মূল ভূখণ্ড থেকে বিশেষায়িত পুলিশ কর্মকর্তা এবং সেনাসদস্যদের সেউতায় মোতায়েন করেছে।
স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, অবৈধভাবে প্রবেশ করা ব্যক্তিদের যত দ্রুত সম্ভব ফেরত পাঠানোর জন্য তারা মরক্কো কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করছে। এদিকে প্রতিবেশী মেলিলা অঞ্চলেও উত্তেজনা ছড়িয়েছে এবং সেখানেও নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। ২০২১ সালে মরক্কোর সঙ্গে রাজনৈতিক বিরোধের জেরে প্রায় ১০ হাজার মানুষের অনুপ্রবেশের স্মৃতি উসকে দিয়ে সেউতার এই নতুন সংকট ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভিবাসন নীতি এবং সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








