শেখ হাসিনাকে ভারতে রাজনীতি করতে দেওয়া হয়নি: মোদি সরকার
ফাইল ছবি
নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন ভারত সরকার স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত ও দণ্ডিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে কোনো ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হয়নি এবং ভবিষ্যতেও দেওয়া হবে না।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস এবং টাইমস অব ইন্ডিয়া-র প্রকাশিত প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে জানা যায়, কংগ্রেসের সংসদ সদস্য শশী থারুরের সভাপতিত্বে গঠিত ভারতের পররাষ্ট্রবিষয়ক সংসদীয় কমিটির কাছে এই অবস্থান পরিষ্কার করেছে দেশটির সরকার।
সম্প্রতি শেখ হাসিনার আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফিরে আত্মসমর্পণের ঘোষণা এবং তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনার মধ্যেই নয়াদিল্লির পক্ষ থেকে এই কূটনৈতিক বার্তা এল।
কংগ্রেস সাংসদ শশী থারুরের নেতৃত্বে গঠিত ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ শীর্ষক ওই সংসদীয় কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনাকে ভারতে অবস্থানের সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি মূলত দেশটির ঐতিহ্যগত সংস্কৃতি এবং চরম বিপদ বা অস্তিত্বের সংকটে থাকা ব্যক্তিদের আশ্রয় দেওয়ার দীর্ঘদিনের মানবিক ঐতিহ্যের অংশ।
তবে এই মানবিক আশ্রয় প্রদানের ক্ষেত্রে ভারত কঠোরভাবে একটি নীতি অনুসরণ করে আসছে তা হলো, কোনো অবস্থাতেই ভারতীয় ভূখণ্ডকে অন্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না।
সংসদীয় কমিটিকে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে তার মৃত্যুদণ্ড ঘোষণার পর বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে তাকে প্রত্যর্পণের যে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ পাঠানো হয়েছে, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রচলিত আইন, বিচারিক প্রক্রিয়া ও দ্বিপাক্ষিক চুক্তির বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী খতিয়ে দেখছে। তবে এই প্রত্যর্পণের বিষয়ে ভারত কোনো সুনির্দিষ্ট সময়সীমা বা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের বিষয়ে এখনই মুখ খুলতে নারাজ।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়ালের সাম্প্রতিক ব্রিফিংয়েও পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে যে, যেকোনো দেশের প্রত্যর্পণের অনুরোধ অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং তা কেবল আইনি কাঠামোর আলোকেই নিষ্পত্তি করা হয়।
এর আগে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, তিনি চলতি বছরের শেষ নাগাদ (ডিসেম্বরের মধ্যে) দেশে ফিরে আইনি লড়াই বা আত্মসমর্পণের মুখোমুখি হতে পারেন। তার এই সম্ভাব্য ফেরা এবং দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে মন্তব্যের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।
আরও পড়ুন: গঙ্গা চুক্তি নবায়নে ঢাকার সঙ্গে দ্রুত আলোচনার তাগিদ ভারতের কমিটির
বাংলাদেশের আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দণ্ডিত শেখ হাসিনা বা অন্য কেউ দেশে ফিরলে তাদের সাধারণ নাগরিকের মতো আত্মসমর্পণের কোনো সুযোগ নেই; বরং সীমানায় পা দেওয়ামাত্রই তাকে ও সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের প্রচলিত আইন অনুযায়ী তাৎক্ষণিকভাবে গ্রেফতার করা হবে।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের অনেক নেতাকর্মী ভারতে আশ্রয় নিলেও, কলকাতার বাণিজ্যিক ভবনে গোপনে দলীয় কার্যালয় পরিচালনা বা রাজনৈতিক তৎপরতার যে খবর গণমাধ্যমে এসেছে, তা নিয়েও নয়াদিল্লি কঠোর অবস্থান নিয়েছে।
প্রতিবেদনে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোতেও আলোকপাত করা হয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও নিরাপত্তা শঙ্কার কারণে স্থগিত থাকার পর, দীর্ঘ দুই বছর পর চলতি বছরের ২৮ জুন থেকে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য পুনরায় পর্যটন ভিসা প্রদান শুরু করেছে। তবে বর্তমান ভিসা প্রসেসিংয়ের পরিমাণ কমে যাওয়ায় দুই দেশের সাধারণ মানুষের মানসিকতায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে তীব্র উদ্বেগ জানিয়েছে শশী থারুরের নেতৃত্বাধীন সংসদীয় কমিটি। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য ভিসা কার্যক্রম দ্রুত ও সম্পূর্ণ স্বাভাবিক করার জোরালো সুপারিশ করা হয়েছে।
পাশাপাশি, ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত ৩০ বছর মেয়াদী ভারত-বাংলাদেশ গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ চলতি ২০২৬ সালেই শেষ হতে চলেছে। চুক্তিটির নবায়ন নিয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক ও পূর্ণাঙ্গ দ্বিপাক্ষিক আলোচনা শুরু না হওয়ায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে কমিটি।
আর কোনো বিলম্ব না করে দ্রুত ঢাকার সঙ্গে আলোচনা শুরু করার পরামর্শ দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হালনাগাদ হাইড্রোলজিক্যাল বা জলাশয় সংক্রান্ত ডেটা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও বিহার রাজ্য সরকারের সঙ্গে বিস্তারিত পরামর্শের ভিত্তিতেই যেন এই চুক্তি নবায়নের পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
একই সঙ্গে, বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষার বিষয়টি ভারতের কূটনৈতিক আলোচনার অন্যতম শীর্ষ অগ্রাধিকার হিসেবে বজায় রাখার ওপরও গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








