আন্তর্জাতিক ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৩:১৬, ৩০ জুলাই ২০২৬
আপডেট: ১৫:০২, ৩০ জুলাই ২০২৬

পাকিস্তানে চেকপোস্টে ভয়াবহ হামলায় পুলিশসহ নিহত ১৫

পাকিস্তানে চেকপোস্টে ভয়াবহ হামলায় পুলিশসহ নিহত ১৫

ছবি: সংগৃহীত

পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় খাইবার পাখতুনখোয়া (কেপি) প্রদেশের হাঙ্গু জেলার খাজিনা বান্দা পুলিশ চেকপোস্টে অত্যন্ত বর্বরোচিত ও সশস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটেছে। 

বুধবার (২৯ জুলাই) সংঘটিত এই ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলায় একজন ডেপুটি সুপারিনটেনডেন্ট অব পুলিশ (ডিএসপি)-সহ অন্তত সাতজন বীর পুলিশ সদস্য ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারিয়েছেন। এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে পুলিশ ও সন্ত্রাসীদের পাল্টাপাল্টি গুলিতে আটজন হামলাকারীও নিহত হয়েছে। পাশাপাশি নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর চালানো এই অতর্কিত হামলায় আরও ২২ জন পুলিশ সদস্য গুরুতর আহত হয়েছেন। স্থানীয় প্রশাসন ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সূত্রে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।

জেলার পুলিশ কর্মকর্তা (ডিপিও) তারিক হাবিব গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন যে, বুধবার রাতে হাঙ্গু জেলার খাজিনা বান্দা পুলিশ চেকপোস্টে ভারী অস্ত্রে সজ্জিত সন্ত্রাসীরা অতর্কিত হামলা চালায়। অতর্কিত এই হামলায় চেকপোস্টে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিরোধের চেষ্টা করলেও সন্ত্রাসীদের নির্বিচারে চালানো গুলিতে হতাহতের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। নিহত পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যে ডিএসপি মুজাহিদ হুসেইনও রয়েছেন, যিনি সাহসিকতার সাথে পরিস্থিতি মোকাবেলার নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। হামলার পরপরই পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনী অত্যন্ত কঠোর ও দৃঢ়তার সাথে পাল্টা জবাব দেয়। তীব্র গুলিবিনিময় ও বন্দুকযুদ্ধে অন্তত আটজন হামলাকারী ঘটনাস্থলেই নিহত হয় এবং আরও ছয়জন সন্ত্রাসী গুরুতর আহত হয়। ঘটনার পরপরই পুরো এলাকা ঘিরে ফেলা হয় এবং আত্মগোপনকারী সন্ত্রাসীদের গ্রেফতারে ব্যাপক চিরুনি অভিযান শুরু হয়। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনী ও জঙ্গিদের মধ্যে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে এবং অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ২০২১ সালের আগস্ট মাসে আফগানিস্তানে তালেবান পুনরায় ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া এবং বেলুচিস্তান প্রদেশে সন্ত্রাসী হামলা ও জঙ্গি তৎপরতা বহুগুণ বেড়ে গেছে। পাকিস্তান সরকারের পক্ষ থেকে বারবার আফগান তালেবান প্রশাসনকে সীমান্তবর্তী অঞ্চলে আশ্রয় নেওয়া এবং সক্রিয় থাকা সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে জোরালো ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানানো হলেও কাবুল এ বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে বলে অভিযোগ করে আসছে ইসলামাবাদ। খাইবার পাখতুনখোয়া ও বেলুচিস্তানের সীমান্তবর্তী পাহাড়ি অঞ্চলগুলো বছরের পর বছর ধরে উগ্রপন্থিদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে, যা পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আরও পড়ুন: বিরতি ভেঙে ইরানে নতুন করে মার্কিন হামলা

আফগান ভূখণ্ড থেকে সীমান্ত পেরিয়ে নিয়মিত পরিচালিত সন্ত্রাসী হামলার দাঁতভাঙা জবাব দিতে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে পাকিস্তান সেনাবাহিনী আফগান সীমান্তে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করে, যা অপারেশন গাজাব লিল-হক নামে পরিচিত। পাকিস্তানের দাবি, সীমান্ত পার হয়ে চালানো এসব জঙ্গি হামলা দমনের জন্য এই সামরিক পদক্ষেপ জরুরি ছিল। তবে এই অভিযানের জেরে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনা চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। 

বিশেষ করে, আফগান তালেবান সরকার ও জাতিসংঘের বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন মাসে পূর্ব আফগানিস্তানে পাকিস্তানের বিমান হামলায় বেশ কিছু বেসামরিক নাগরিক নিহত হন, যা আন্তর্জাতিক মহলেও তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছিল।

হাঙ্গু জেলার এই রক্তক্ষয়ী ঘটনার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর জনসংযোগ শাখা (আইএসপিআর) এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করেছিল যে, গত ২৪ ঘণ্টায় খাইবার পাখতুনখোয়া ও বেলুচিস্তানের বিভিন্ন সংবেদনশীল এলাকায় পরিচালিত টার্গেটেড অভিযানে ভারত-সমর্থিত অন্তত ৩২ জন সন্ত্রাসী নিহত হয়েছে। দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীর এই দাবি পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তবে স্থানীয় স্বাধীন সূত্র ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো এসব দাবির সত্যতা নিয়ে নানা প্রশ্ন তুললেও খাইবার পাখতুনখোয়া ও বেলুচিস্তানে যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে, তা নিয়ে দ্বিমতের কোনো অবকাশ নেই।

সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজ (সিআরএসএস)-এর প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে পাকিস্তানের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির এক ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। 

২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকের ওই পরিসংখ্যান অনুযায়ী, খাইবার পাখতুনখোয়া এবং বেলুচিস্তান প্রদেশই ছিল সমগ্র দেশের সন্ত্রাসী সহিংসতা ও সংঘাতের মূল কেন্দ্রবিন্দু। আলোচ্য সময়ে পাকিস্তানে সংঘটিত সহিংসতাজনিত মোট মৃত্যুর প্রায় ৯৬ শতাংশই রেকর্ড করা হয়েছে কেবল এই দুটি প্রদেশে। 

প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়েছে যে, ওই নির্দিষ্ট প্রান্তিকে খাইবার পাখতুনখোয়ায় ৪৭৫ জন এবং বেলুচিস্তানে ২৬৫ জন প্রাণ হারিয়েছে। একই সময়ে খাইবার পাখতুনখোয়ায় ১৫১টি এবং বেলুচিস্তানে ৯৪টি বড় ধরনের সহিংস ঘটনার নজির রয়েছে, যা দেশটির রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো এবং নাগরিকদের সুরক্ষায় এক গভীর সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, একের পর এক রক্তক্ষয়ী হামলা, চেকপোস্টে প্রাণহানি এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সাড়াশি অভিযান সত্ত্বেও পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। হাঙ্গুর খাজিনা বান্দা চেকপোস্টে হামলা এবং এর আগে টাঙ্ক জেলায় সেনা, পুলিশ ও সরকারি কর্মকর্তাসহ ১৫ জনের প্রাণহানির ঘটনা প্রমাণ করে যে, সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো এখন আরও বেশি সংগঠিত এবং যেকোনো স্থানে আঘাত হানার সক্ষমতা অর্জন করেছে। 

এমতাবস্থায় গবেষকদের মতে, কেবল সামরিক অভিযান নয়, বরং আঞ্চলিক কূটনীতি ও গোয়েন্দা সমন্বয় জোরদার না করলে এই রক্তপাত বন্ধ করা সম্ভব হবে না।

তথ্যসূত্র: জিও নিউজ, ফ্রান্স টোয়েন্টিফোর (FRANCE 24), সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজ (CRSS) প্রতিবেদন এবং আইএসপিআর প্রেস বিজ্ঞপ্তি।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়