বিরতি ভেঙে ইরানে নতুন করে মার্কিন হামলা
ছবি: সংগৃহীত
টানা প্রায় পাঁচ দিন বিরতির পর মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সর্বাত্মক উত্তেজনার পারদ চড়েছে। ইরানের পক্ষ থেকে মার্কিন ও মিত্র বাহিনীর ওপর একের পর এক হামলার উপযুক্ত জবাব দিতে অবশেষে দেশটিতে ফের বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলীয় সময় (ইস্টার্ন টাইম) অনুযায়ী বুধবার রাত ৮টায় (বাংলাদেশের স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার ভোর ৬টা) এই বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু হয়, যা চলে টানা দুই ঘণ্টা ধরে।
মার্কিন প্রতিরক্ষা বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ড সেন্টকমের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বাহিনীকে লক্ষ্য করে ইরানের সাম্প্রতিক আগ্রাসী হামলার কঠোর ও উপযুক্ত জবাব হিসেবে এই অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। সেন্টকমের সম্পদ ও যুদ্ধবিমানগুলো ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) ডজনখানেক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। এর মধ্যে রয়েছে সামরিক কমান্ড সেন্টার, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন রক্ষণাবেক্ষণ এবং উৎক্ষেপণ কেন্দ্র, উপকূলীয় নজরদারি ও প্রতিরক্ষা স্থাপনা এবং গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক সক্ষমতা। এর আগে গত শুক্রবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে ১৩ দিনের তীব্র বোমা হামলার পর সাময়িক বিরতি দেওয়া হয়েছিল।
এদিকে সংঘাতের পরিধি শুধু ইরান আর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়েছে।
সামুদ্রিক জাহাজ চলাচল বিষয়ক ব্রিটিশ নিরাপত্তা সংস্থা অ্যামব্রের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল বুধবার বাংলাদেশ সময় ভোরের দিকে মিসরের ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলের কৌশলগত বন্দর দামিয়েত্তায় যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানাধীন একটি গ্যাসবাহী ট্যাংকার ও একটি ভাসমান সংরক্ষণ স্থাপনায় ড্রোন হামলা আঘাত হানে। এর ফলে তীব্র বিস্ফোরণ ঘটে এবং জাহাজগুলোতে ভয়াবহ আগুন ধরে যায়। যদিও মিসরের পেট্রোলিয়াম বিষয়ক মন্ত্রণালয় দামিয়েত্তা বন্দরে আগুন লাগার সত্যতা স্বীকার করেছে, তবে তাদের প্রাথমিক বিবৃতিতে ড্রোন হামলার সুনির্দিষ্ট কোনো উল্লেখ ছিল না।
ঠিক একই সময়ে জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন সেনাঘাঁটি লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র বর্ষণ করে ইরানের অভিজাত বাহিনী আইআরজিসি। জর্ডানের সামরিক বাহিনীও নিশ্চিত করেছে যে তারা বেশ কয়েকটি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র আকাশে প্রতিহত করেছে। এছাড়া হরমুজ প্রণালিতে অননুমোদিত ও নিষিদ্ধ রুটে চলাচলকারী একাধিক তেল ট্যাংকারেও হামলা চালিয়েছে ইরান।
আরও পড়ুন: ১৩ দিনের সংঘাতের পর অভিযান বন্ধ, কারণ জানালেন ট্রাম্প
এ ছাড়া, মার্কিন ও সৌদি আরব যৌথভাবে ইরাকের পূর্বাঞ্চলে ইরানপন্থি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে লক্ষ্য করে শক্তিশালী বিমান অভিযান পরিচালনা করে, যেখানে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মিলিশিয়া যোদ্ধা ও সামরিক উপদেষ্টা নিহত হয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূত্রে প্রকাশ।
ইরানে মার্কিন বাহিনীর এই অভিযানের ঠিক প্রাক্কালে ওয়াশিংটনের হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত কঠোর হুশিয়ারি উচ্চারণ করেছিলেন।
তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, জর্ডানে আমাদের সেনাঘাঁটিতে ইরান হামলা চালিয়েছে। এখন আমাদের পালা। আমাদের জবাব অত্যন্ত কঠিন ও কঠোর হবে।
তবে একই সঙ্গে তিনি এও উল্লেখ করেন যে, তেহরানের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে কোনো শান্তিচুক্তি করার পথ কিংবা প্রচেষ্টা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি।
উল্লেখ্য, গত ১৭ জুন পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পক্ষের সহায়তায় ইসলামাবাদ সমঝোতা চুক্তি (Islamabad Memorandum of Understanding) স্বাক্ষরিত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার চলমান যুদ্ধের অবসান বা যুদ্ধবিরতির পথ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সেই সমঝোতা টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি। জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে হরমুজ প্রণালিতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ট্যাংকার জাহাজে ইরানের ড্রোন হামলার পর সেন্টকম ফের পাল্টা আক্রমণ শুরু করে। সাম্প্রতিক সময়ে ওমান কর্র্তৃক হরমুজ প্রণালি যৌথভাবে ব্যবস্থাপনার একটি প্রস্তাব তেহরানের কাছে দেওয়া হলেও ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রী সরকার সেই প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে, যার জেরে এই জলপথে বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর ঝুঁকি ও সামরিক সংঘাত আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে।
অন্যদিকে, গতকাল বুধবার রাতে আইআরজিসির পক্ষ থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটি এবং হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর ওপর সফল হামলার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, মিসর, জর্ডান এবং ইরাক পর্যন্ত এই সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে হু হু করে বাড়ছে জ্বালানি তেলের দাম। চলমান এই বহুমুখী সামরিক পদক্ষেপে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠার সব কূটনৈতিক প্রচেষ্টা বর্তমানে মারত্মক অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








