ডেঙ্গুতে আরও ১ মৃত্যু, হাসপাতালে ৫৪৬
ফাইল ছবি
দেশে ডেঙ্গুর সংক্রমণ এখনো উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে আরও একজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে ৫৪৬ জন রোগী দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর ফলে চলতি বছরে ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৪ জনে এবং মোট হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা পৌঁছেছে ১৩ হাজার ৬৪৪ জনে।
সোমবার (২৭ জুলাই) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম প্রকাশিত দৈনিক ডেঙ্গু পরিস্থিতি প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ২২৩ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন ঢাকা বিভাগে। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকার হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হয়েছেন ৫৮ জন এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ৫৬ জন। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের বাইরে ঢাকা বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন আরও ১০৯ জন।
এছাড়া চট্টগ্রাম বিভাগে ৯৭ জন, বরিশাল বিভাগে ৯৬ জন, খুলনা বিভাগে ৬৫ জন, রাজশাহী বিভাগে ৩২ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ২৪ জন এবং রংপুর বিভাগে ৯ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। এ সময় সিলেট বিভাগে নতুন কোনো ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়নি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় চিকিৎসা শেষে ৫৪০ জন রোগী হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন। বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত মোট ১২ হাজার ৪৭৭ জন সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ১ হাজার ১২৩ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
চলতি বছরের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ১ জানুয়ারি থেকে ২৭ জুলাই পর্যন্ত দেশে মোট ১৩ হাজার ৬৪৪ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে জুলাই মাসেই আক্রান্ত হয়েছেন ৭ হাজার ৫৪০ জন, যা চলতি বছরের সর্বোচ্চ মাসিক সংক্রমণ। জুন মাসে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৯০৭ জন। অর্থাৎ বর্ষাকালের শুরু থেকেই সংক্রমণের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা স্পষ্ট হয়েছে।
আরও পড়ুন: ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আরও ৩ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ৪৫৮
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিশ্লেষণে আরও জানা গেছে, এ বছর আক্রান্তদের মধ্যে প্রায় ৬২ শতাংশ পুরুষ এবং ৩৮ শতাংশ নারী। অন্যদিকে মৃত্যুবরণকারীদের মধ্যে ৫২ দশমিক ৬ শতাংশ পুরুষ এবং ৪৭ দশমিক ৪ শতাংশ নারী।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্ষা মৌসুমে জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে এডিস মশার বংশবিস্তার বেড়ে যাওয়ায় ডেঙ্গুর সংক্রমণও দ্রুত বাড়ছে। রাজধানীর পাশাপাশি জেলা শহর ও গ্রামীণ এলাকাতেও রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় পরিস্থিতি আগের তুলনায় আরও বিস্তৃত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু হাসপাতালভিত্তিক চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর নির্ভর না করে মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে স্থানীয় সরকার, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা এবং সাধারণ মানুষের সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, ডেঙ্গু প্রতিরোধে বাসাবাড়ি, অফিস, নির্মাণাধীন ভবন, ছাদ, বারান্দা, ফুলের টব, টায়ার, এসির ট্রে, পানির ট্যাংকসহ যেকোনো স্থানে তিন দিনের বেশি পরিষ্কার পানি জমে থাকতে দেওয়া যাবে না। একই সঙ্গে জ্বর, শরীরব্যথা, মাথাব্যথা, বমি, চোখের পেছনে ব্যথা কিংবা রক্তক্ষরণের মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং প্রয়োজনে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
ডেঙ্গুর ইতিহাসে বাংলাদেশে সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল ২০২৩ সালে। ওই বছর ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন এবং রেকর্ড ১ হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যু হয়। পরের বছরও সংক্রমণ উচ্চমাত্রায় ছিল; ২০২৪ সালে আক্রান্ত হন ১ লাখ ১ হাজার ২১৪ জন এবং মারা যান ৫৭৫ জন। ২০২৫ সালে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল ১ লাখ ২ হাজার ৮৬১ জন এবং মৃত্যু হয় ৪১৩ জনের। সেই তুলনায় চলতি বছরের প্রথম সাত মাসেই আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা ক্রমেই বাড়তে থাকায় পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্ষার বাকি সময়জুড়ে ডেঙ্গুর ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। তাই ব্যক্তি পর্যায়ে সচেতনতা, এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত পরীক্ষা ও চিকিৎসা গ্রহণই ডেঙ্গু মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








