টেকনাফে রোহিঙ্গাবাহী নৌকাডুবিতে নিখোঁজ ১৩, উদ্ধার ১৮
ছবি: সংগৃহীত
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান তীব্র সংঘাত ও সহিংস পরিস্থিতির মধ্যে প্রাণ বাঁচাতে নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের সময় কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার শাহপরীর দ্বীপ পশ্চিমপাড়া সাগর উপকূলে একটি রোহিঙ্গাবাহী নৌকাডুবির মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে।
শুক্রবার (৩১ জুলাই) সকাল আটটার দিকে শাহপরীর দ্বীপ পশ্চিমপাড়া নৌকাঘাট সংলগ্ন বঙ্গোপসাগরের উত্তাল মোহনায় এই দুর্ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় স্থানীয় জেলেদের তাৎক্ষণিক সাহসিকতাপূর্ণ পদক্ষেপে ১৮ জনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হলেও, নৌকাটির মাঝি-মাল্লাসহ ১৩ থেকে ১৪ জন এখনও নিখোঁজ রয়েছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মিয়ানমারজুড়ে সামরিক জান্তা সরকার এবং সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির মধ্যে চলমান রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের জেরে রাখাইন রাজ্যের সাধারণ মানুষের জীবন চরম বিপন্ন হয়ে উঠেছে। এই সহিংসতার কবল থেকে রক্ষা পেতে এবং নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে একটি নৌকায় করে বেশ কিছু রোহিঙ্গা নাগরিক সাগরপথে বাংলাদেশের দিকে রওনা দেন। উপকূলের অত্যন্ত কাছাকাছি পৌঁছানোর পরপরই বৈরী আবহাওয়া, প্রবল স্রোত ও বঙ্গোপসাগরের উত্তাল ঢেউয়ের কবলে পড়ে যাত্রবোঝাই নৌকাটি আকস্মিক ডুবে যায়।
দুর্ঘটনার পরপরই শাহপরীর দ্বীপ পশ্চিমপাড়ার স্থানীয় জেলেরা দ্রুত এগিয়ে আসেন এবং জীবনের ঝুঁকি নিয়ে উদ্ধার অভিযান শুরু করেন। জেলেদের ভাষ্যমতে, ডুবে যাওয়া নৌকাটিতে সবমিলিয়ে ৩১ থেকে ৩২ জন আরোহী ছিলেন। এর মধ্যে স্থানীয়রা সাঁতরে ও বোটের সাহায্যে ১৮ জন রোহিঙ্গাকে জীবিত উদ্ধার করতে সক্ষম হন। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে কোনো নারী বা শিশু নেই বলে নিশ্চিত করেছেন স্থানীয় জেলেরা। তবে নৌকার মাঝি-মাল্লাসহ আরও অন্তত ১৩ থেকে ১৪ জন নিখোঁজ রয়েছেন।
স্থানীয়দের কেউ কেউ ধারণা করছেন, এপার থেকে ওপারে লোক আনতে যাওয়া কয়েকজন মাঝিও নিখোঁজদের অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারেন। এছাড়া উদ্ধার হওয়াদের কেউ কেউ সাঁতরে অন্য চরে বা তীরে উঠতে পেরেছেন বলেও প্রাথমিক তথ্যে জানা গেছে।
উদ্ধারকৃতদের বরাত দিয়ে স্থানীয় ও প্রশাসনিক সূত্রে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সূত্র ও স্থানীয়দের দাবি, উদ্ধার হওয়া এই দলটির বেশ কয়েকজন সদস্য পূর্বে বাংলাদেশের বিভিন্ন আশ্রয়শিবির বা রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে গোপনে মিয়ানমারে ফিরে গিয়েছিলেন এবং সেখানে আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংঘাতে অংশ নিয়েছিলেন। পরবর্তীতে রাখাইনের পরিস্থিতি তাদের প্রতিকূলে চলে যাওয়ায় এবং জান্তা-বিদ্রোহী লড়াইয়ের তীব্রতা বৃদ্ধি পাওয়ায় তারা পুনরায় জীবন বাঁচাতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসার চেষ্টা চালাচ্ছিলেন। তবে এই সংবেদনশীল তথ্যটি কতটুকু বাস্তবসম্মত, তা খতিয়ে দেখছে গোয়েন্দা ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো।
আরও পড়ুন: কক্সবাজারে সিএনজি-কাভার্ড ভ্যানের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত ৩
এদিকে, স্থানীয়দের মাধ্যমে খবর পেয়ে বাংলাদেশ বর্ডার গার্ডের (বিজিবি) টেকনাফ-২ ব্যাটালিয়নের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে জীবিত উদ্ধার হওয়া ১৮ জন রোহিঙ্গাকে নিজেদের হেফাজতে নেন। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ ও প্রক্রিয়া শেষে শুক্রবার বিকেলের দিকে তাদের টেকনাফ মডেল থানায় হস্তান্তর করা হয়।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে টেকনাফ-২ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হানিফুর রহমান ভূঁইয়া জানান, নৌকাডুবির পর উদ্ধার হওয়া ১৮ জন রোহিঙ্গা বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে রয়েছেন। তাদের সুনির্দিষ্ট পরিচয়, প্রকৃতপক্ষেই তারা কোন ক্যাম্প থেকে গিয়েছিলেন কি না, কিংবা বাংলাদেশে প্রবেশের নেপথ্যের মূল উদ্দেশ্য কী তা গভীরভাবে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। পাশাপাশি নিখোঁজদের উদ্ধারে স্থানীয় জেলেদের সহায়তায় সাগরে তল্লাশি কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে এবং পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত শেষেই এ বিষয়ে বিস্তারিত গণমাধ্যমকে জানানো হবে।
অন্যদিকে, টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, বিজিবি কর্তৃক থানায় হস্তান্তরিত রোহিঙ্গাদের আইনি প্রক্রিয়া ও পরিচয় শনাক্তকরণের কাজ বর্তমানে চলমান রয়েছে।
উল্লেখ্য, দীর্ঘ বছর ধরে চলা নিপীড়ন ও সহিংসতার শিকার হয়ে বর্তমান সময়েও কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি জনবহুল আশ্রয়শিবিরে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা প্রায় সাড়ে ১২ লাখের কাছাকাছি রয়েছে। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সামরিক বাহিনীর নৃশংস অভিযানের মুখে কয়েক লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়।
এরপর থেকে নানা সময়ে সমুদ্র ও স্থলপথে অবৈধ অনুপ্রবেশের এই চেষ্টার কারণে প্রায়শই উপকূলীয় অঞ্চলে এমন মর্মান্তিক নৌডুবি ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটে চলেছে। সাম্প্রতিক সময়ে রাখাইনে নতুন করে সংঘাত তীব্র আকার ধারণ করায় সীমান্ত দিয়ে নতুন করে রিফিউজি ঢলের আশঙ্কা ও মানবিক সংকট উভয়ই চরম মাত্রা ধারণ করেছে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








