নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৯:২৫, ৩১ জুলাই ২০২৬

ছাতার পর এবার আশুলিয়ায় প্রেসার কুকার বোমা

ছাতার পর এবার আশুলিয়ায় প্রেসার কুকার বোমা

ছবি: সংগৃহীত

রাজধানীর মতিঝিলে ছাতার ভেতরে রাখা ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আইইডি) উদ্ধারের এক সপ্তাহের ব্যবধানে এবার ঢাকার অদূরে সাভারের আশুলিয়ায় একটি চায়ের দোকানের বেঞ্চে ফেলে যাওয়া ব্যাগের ভেতর থেকে প্রেসার কুকারভিত্তিক বোমাসদৃশ বিস্ফোরক উদ্ধার করেছে পুলিশ। 

খবর পেয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের বোম্ব ডিসপোজাল টিম ঘটনাস্থলে পৌঁছে সেটিকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণের মাধ্যমে নিষ্ক্রিয় করে। ঘটনাটি ঘিরে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। 

পুলিশ বলছে, এটি পরিকল্পিতভাবে রেখে যাওয়া হয়েছে কি না, কোনো নাশকতার উদ্দেশ্য ছিল কি না এবং এর সঙ্গে কারা জড়িত—এসব বিষয় গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) রাত সাড়ে ১০টা থেকে ১১টার মধ্যে আশুলিয়ার খেজুরবাগান (চারাবাগ) এলাকার হৃদয় চাকমার মালিকানাধীন জয়ী জেনারেল স্টোর নামের একটি চায়ের দোকানের সামনে বেঞ্চের ওপর একটি কালো রঙের ব্যাগ রেখে যায় এক ব্যক্তি। 

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, তার বয়স আনুমানিক ৩০ থেকে ৩৬ বছর। মুখে মাস্ক পরা ওই ব্যক্তি দোকানে এসে একটি কোমল পানীয় (মোজো) কিনতে চান এবং দোকানিকে ৫০০ টাকার একটি নোট দেন। দোকানির কাছে খুচরা টাকা না থাকায় তিনি পাশের দোকানে টাকা ভাঙাতে গেলে সুযোগ বুঝে ওই ব্যক্তি ব্যাগটি রেখে দ্রুত সেখান থেকে চলে যান। দীর্ঘ সময় পার হলেও তিনি আর ফিরে না আসায় স্থানীয়দের সন্দেহ হয়।

পরে ব্যাগটি খুলে ভেতরে টেপে মোড়ানো প্রেসার কুকার আকৃতির একটি ভারী বস্তু দেখতে পান তারা। বস্তুটির গঠন ও অবস্থান দেখে সেটি বিস্ফোরক হতে পারে বলে আশঙ্কা করেন উপস্থিত লোকজন। সঙ্গে সঙ্গে আশুলিয়া থানা পুলিশকে খবর দেওয়া হয়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে দোকানসংলগ্ন এলাকা ঘিরে ফেলে এবং সাধারণ মানুষকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে দেয়। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে বস্তুটি বিস্ফোরক হওয়ার সম্ভাবনা থাকায় রাতেই ডিএমপির সিটিটিসির বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটকে অবহিত করা হয়। রাতেই বোম্ব ডিসপোজাল টিম ঘটনাস্থলে পৌঁছে বিশেষ সুরক্ষা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে ব্যাগটি পরীক্ষা করে। 

পরে শুক্রবার (৩১ জুলাই) ভোর থেকে সকাল পর্যন্ত বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে বিস্ফোরকটি ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে আশুলিয়া ইউনিয়নের বঙ্গবন্ধু রোড এলাকার ইউনাইটেড গার্মেন্টস-সংলগ্ন আমির সরকারের হাউজিংয়ের ভেতরের একটি ফাঁকা প্লট (কিছু সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী পাশের একটি খালি মাঠ) নির্বাচন করা হয়। সেখানে গর্ত খুঁড়ে চারপাশে বালুর বস্তা দিয়ে নিরাপত্তা বলয় তৈরি করে নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণের মাধ্যমে বস্তুটি নিষ্ক্রিয় করা হয়। বিস্ফোরণের সময় আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয় এবং ঘটনাস্থলে সাধারণ মানুষের প্রবেশ সীমিত রাখা হয়।

আরও পড়ুন: চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী ডেভিড ইমন যশোর থেকে গ্রেফতার

বোম্ব ডিসপোজাল-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রাথমিকভাবে এটি প্রেসার কুকারভিত্তিক ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আইইডি) হওয়ার আলামত পাওয়া গেছে। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। 

প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, বিস্ফোরকটির ভেতরে রাসায়নিক পদার্থের পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিয়ারিং বল ছিল, যা বিস্ফোরণের সময় প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি বাড়ানোর উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। তবে বোমাটি ঠিক কোন ধরনের বিস্ফোরক দিয়ে তৈরি এবং এর কার্যক্ষমতা কতটা ছিল তা ফরেনসিক ও বোমা বিশেষজ্ঞদের পরীক্ষার পর নিশ্চিত হওয়া যাবে।

ঘটনার পর আশুলিয়া এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় বাসিন্দা আজিজুল হক বলেন, রাতে দোকানের সামনে একটি ব্যাগ পড়ে থাকতে দেখে প্রথমে বিষয়টি গুরুত্ব দেননি। কিন্তু দীর্ঘ সময়েও কেউ ব্যাগটি নিতে না আসায় সন্দেহ হয়। পরে ব্যাগ খুলে প্রেসার কুকারের মতো বোমাসদৃশ বস্তু দেখতে পেয়ে তারা দ্রুত পুলিশকে খবর দেন। 

তার মতে, সময়মতো পুলিশকে জানানো এবং বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটের দ্রুত পদক্ষেপের কারণে সম্ভাব্য বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানো গেছে।

আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ তরিকুল ইসলাম জানান, উদ্ধার হওয়া বিস্ফোরকটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে। কে বা কারা এটি সেখানে রেখে গেছে, তাদের উদ্দেশ্য কী ছিল এবং কোনো নাশকতার পরিকল্পনা ছিল কি না সব দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের জন্য তদন্ত শুরু হয়েছে। আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। দোকানে আসা সন্দেহভাজন ব্যক্তির পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা চলছে এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থাও বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে।

আশুলিয়া থানার তদন্ত-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও জানান, দোকানদার ও প্রত্যক্ষদর্শীদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। ব্যাগটি দোকানে রেখে যাওয়ার ঘটনাটি পূর্বপরিকল্পিত কি না এবং সন্দেহভাজন ব্যক্তি একা ছিলেন নাকি তার সঙ্গে অন্য কেউ ছিল এসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া আলামত পরীক্ষার জন্য সংশ্লিষ্ট ল্যাবরেটরিতে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে।

ঘটনাটি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে, কারণ এর মাত্র এক সপ্তাহ আগে, ২৪ জুলাই রাজধানীর মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে একটি পরিত্যক্ত ছাতার ভেতর থেকে আইইডি উদ্ধার করেছিল পুলিশ। ওই বোমাটিতে লাল রঙের নির্দেশক বাতি জ্বলছিল এবং শব্দ হচ্ছিল বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। সে সময় হিন্দু সম্প্রদায়ের উল্টো রথযাত্রার শোভাযাত্রা ওই এলাকা অতিক্রম করছিল এবং শত শত মানুষ সেখানে উপস্থিত ছিলেন। পরে ডিএমপির বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট সেটিও নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণের মাধ্যমে নিষ্ক্রিয় করে। ওই অভিযানের সময় বিস্ফোরণের অভিঘাতে মিরাজ আহমেদ (৩৩) নামে এক পথচারীর বাঁ চোখে আঘাত লাগে। তদন্ত-সংশ্লিষ্টদের ধারণা ছিল, জনসমাগমপূর্ণ ওই ধর্মীয় শোভাযাত্রাকে লক্ষ্য করেই বিস্ফোরকটি সেখানে রাখা হয়েছিল।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, অল্প সময়ের ব্যবধানে রাজধানী-সংলগ্ন এলাকায় দুটি পৃথক স্থানে আইইডি-সদৃশ বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনাকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই। দুটি ঘটনার মধ্যে কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, একই ব্যক্তি বা চক্র জড়িত কি না, অথবা এগুলো কেবল আতঙ্ক সৃষ্টির উদ্দেশ্যে করা হয়েছে কি না এসব বিষয়ও তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে। পাশাপাশি গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং জনসমাগমপূর্ণ এলাকা, পরিবহন অবকাঠামো ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নিরাপত্তা জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এদিকে পুলিশ সাধারণ মানুষকে কোনো পরিত্যক্ত ব্যাগ, বাক্স, ছাতা বা সন্দেহজনক বস্তু দেখলে তা স্পর্শ না করে দ্রুত নিকটস্থ থানায় বা জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ জানানোর আহ্বান জানিয়েছে। কর্মকর্তারা বলছেন, সামান্য সচেতনতা ও দ্রুত তথ্য দেওয়ার কারণেই আশুলিয়ার ঘটনায় সম্ভাব্য বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হয়েছে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়