ক্রিট উপকূলে বাংলাদেশিসহ ৭৯ অভিবাসনপ্রত্যাশী উদ্ধার
ফাইল ছবি
দক্ষিণ ভূমধ্যসাগরে গ্রিসের ক্রিট দ্বীপের কাছে দুটি নৌযান থেকে বাংলাদেশিসহ ৭৯ জন অভিবাসনপ্রত্যাশীকে উদ্ধার করেছে দেশটির কোস্টগার্ড।
মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) দক্ষিণ ক্রিটের কালি লিমেনেস বন্দরের সামুদ্রিক এলাকায় পৃথকভাবে দুটি নৌযান শনাক্ত হওয়ার পর উদ্ধার অভিযান চালানো হয়। উদ্ধার হওয়াদের মধ্যে অন্তত দুই নারী ও দুই শিশু রয়েছে। তাদের মধ্যে বাংলাদেশি নাগরিকের পাশাপাশি যুদ্ধবিধ্বস্ত সুদানের নাগরিকও রয়েছেন।
গ্রিসের কোস্টগার্ডের তথ্য অনুযায়ী, ইউরোপীয় সীমান্ত ও উপকূলরক্ষী সংস্থা ফ্রন্টেক্সের ব্যবহৃত একটি ড্রোন প্রথমে সমুদ্রে নৌযান দুটির অবস্থান শনাক্ত করে। এরপর গ্রিসের যৌথ অনুসন্ধান ও উদ্ধার সমন্বয় ব্যবস্থার অধীনে একটি কোস্টগার্ড টহলজাহাজ ঘটনাস্থলে গিয়ে নৌকা দুটিতে থাকা ব্যক্তিদের উদ্ধার করে। পরে তাদের দক্ষিণ ক্রিটের কালি লিমেনেস বন্দরে নেওয়া হয়, যেখানে পরিচয় যাচাই ও নিবন্ধনের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
উদ্ধার হওয়া ব্যক্তির সংখ্যা নিয়ে শুরুতে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল। গ্রিসের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা এএনএ প্রথমে ৮৫ জন অভিবাসনপ্রত্যাশী উদ্ধারের খবর প্রকাশ করে। তবে পরে কোস্টগার্ডের এক কর্মকর্তা এএফপিকে জানান, চূড়ান্ত হিসাবে উদ্ধার হওয়া ব্যক্তির সংখ্যা ৭৯।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, দুটি নৌযানের একটিতে ৩০ জন এবং অন্যটিতে ৪৯ জন ছিলেন। দ্বিতীয় দলটিতে দুই নারী ও কয়েকজন অপ্রাপ্তবয়স্ক ছিল। সবাইকে নিরাপদ অবস্থায় ক্রিটে নেওয়া হয়েছে বলে গ্রিসের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
এই উদ্ধার অভিযান বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে দক্ষিণ ক্রিট ও এর আশপাশের সমুদ্রপথে উত্তর আফ্রিকা থেকে ইউরোপমুখী অভিবাসনপ্রত্যাশীদের যাত্রা বেড়েছে। ২০ আগস্ট দক্ষিণ ক্রিটের একটি সৈকত ও উপকূলীয় এলাকা থেকে প্রায় ২০০ জন অভিবাসনপ্রত্যাশীর গ্রিসে পৌঁছানো বা উদ্ধারের খবর আসে। তাদের বেশির ভাগই উত্তর আফ্রিকা থেকে ছোট নৌযানে যাত্রা করেছিলেন। ওই সময়ের বিভিন্ন অভিযানে যাত্রীদের অনেকেই পূর্ব লিবিয়ার তবরুক এলাকা থেকে যাত্রা শুরু করেছিলেন বলে গ্রিসের কোস্টগার্ড জানিয়েছিল।
আগস্টের মাঝামাঝিও একই রুটে বড় ধরনের উদ্ধার অভিযান চালাতে হয়েছে গ্রিসের কর্তৃপক্ষকে। ১৩ আগস্ট দক্ষিণ ক্রিটের কালি লিমেনেসের কাছে দুটি নৌযান থেকে প্রায় ১১৩ জনকে উদ্ধার করা হয়। এর কয়েক দিন পর গ্রিসের কোস্টগার্ড ১১৫ জন বিদেশি নাগরিককে উদ্ধারের ঘটনার বিস্তারিত জানায়। সে সময় উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্যমতে, নৌযানগুলো লিবিয়ার তবরুক উপকূল থেকে গ্রিসের উদ্দেশে ছেড়েছিল।
ফলে ক্রিট ও এর কাছের ছোট দ্বীপ গাভদোস এখন ভূমধ্যসাগরীয় অভিবাসন রুটের নতুন গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ হিসেবে উঠে এসেছে। দ্বীপ দুটি লিবিয়ার উপকূল থেকে প্রায় ৩২০ কিলোমিটার দূরে। বিশেষ করে পূর্ব লিবিয়ার তবরুক, দেরনা ও বেনগাজি অঞ্চল থেকে মানবপাচারকারী চক্রের সহায়তায় ছোট নৌযানে করে অভিবাসনপ্রত্যাশীরা এই পথে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা করছেন। ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে ক্রিট-গাভদোস রুটে পৌঁছানো ব্যক্তিদের মধ্যে মিসরীয়দের পর সুদানি ও বাংলাদেশি নাগরিকের উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য।
আরও পড়ুন: ভূমধ্যসাগরে ১০ দিনের মৃত্যুযাত্রা, প্রাণ গেল ৯ বাংলাদেশির
বাংলাদেশিদের জন্য এই রুটের ঝুঁকিও ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। চলতি আগস্টের শুরুতে লিবিয়া থেকে গ্রিসের উদ্দেশে যাত্রা করা একটি রাবারের নৌযান ভূমধ্যসাগরে প্রায় ১০ থেকে ১১ দিন ভাসতে থাকার ঘটনায় নয়জন বাংলাদেশি ও একজন সুদানি নাগরিকের মৃত্যু হয়। নৌযানটিতে পর্যাপ্ত খাবার ও পানির ব্যবস্থা ছিল না এবং জ্বালানি শেষ হয়ে যাওয়ার পর সেটি নিয়ন্ত্রণহীনভাবে ভাসতে থাকে। পরে জীবিত ২৯ বাংলাদেশিকে উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় ভূমধ্যসাগরের বিপজ্জনক রুটে বাংলাদেশিদের অনিয়মিত অভিবাসনের ভয়াবহ ঝুঁকি আবারও সামনে আসে।
গ্রিসের অভিবাসন মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশটিতে সামগ্রিকভাবে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের আগমন গত এক বছরে কমেছে। ২০২৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত পূর্ববর্তী ১২ মাসে প্রায় ৬১ হাজার অভিবাসনপ্রত্যাশী গ্রিসে পৌঁছালেও পরবর্তী ১২ মাসে সেই সংখ্যা নেমে আসে প্রায় ৪২ হাজারে। অর্থাৎ সামগ্রিক আগমন প্রায় ৩১ শতাংশ কমেছে। তবে জাতীয় পর্যায়ে আগমন কমলেও ক্রিট ও গাভদোস রুটে নতুন করে চাপ তৈরি হওয়ায় গ্রিসের দক্ষিণাঞ্চলীয় দ্বীপগুলো নিয়ে কর্তৃপক্ষের উদ্বেগ বাড়ছে।
২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত গ্রিসে অনিয়মিতভাবে প্রায় ২২ হাজার মানুষের প্রবেশের তথ্য পাওয়া গেছে, যার বড় অংশই সামুদ্রিক পথে এসেছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এর প্রায় অর্ধেকের গন্তব্য বা প্রবেশপথ ছিল ক্রিট। অথচ দ্বীপটিতে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের দীর্ঘমেয়াদি আবাসনের জন্য পর্যাপ্ত অবকাঠামো নেই। ফলে অনেককে নিবন্ধন ও প্রাথমিক প্রক্রিয়া শেষে গ্রিসের মূল ভূখণ্ড বা এজিয়ান সাগরের অন্যান্য দ্বীপে স্থানান্তর করা হচ্ছে। সরকার ক্রিটে একটি স্থায়ী গ্রহণকেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে।
এদিকে ইউরোপজুড়ে অনিয়মিত অভিবাসন ঠেকাতে নীতি আরও কঠোর করা হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ জোরদারের পাশাপাশি লিবিয়ার মতো ট্রানজিট দেশগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা বাড়িয়েছে। গ্রিসের অভিবাসনমন্ত্রী থানোস প্লেভরিসও সীমান্তে অনিয়মিত প্রবেশ ঠেকাতে কঠোর অবস্থানের পক্ষে। আশ্রয়প্রার্থীদের আবেদন ও প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া পরিচালনার জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের কোনো দেশে তথাকথিত রিটার্ন হাব স্থাপনের বিষয়েও জার্মানিসহ কয়েকটি ইউরোপীয় দেশের সঙ্গে আলোচনা চালাচ্ছে গ্রিস।
সামগ্রিকভাবে গ্রিসে অনিয়মিত অভিবাসনের সংখ্যা কমার সরকারি পরিসংখ্যানের মধ্যেও ক্রিট-গাভদোস রুটের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো ভিন্ন বাস্তবতা তুলে ধরছে। উত্তর আফ্রিকা থেকে দীর্ঘ ও ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথ পাড়ি দিয়ে ইউরোপে পৌঁছানোর চেষ্টায় বাংলাদেশিসহ বিভিন্ন দেশের মানুষ এখনও মানবপাচারকারী চক্রের ওপর নির্ভর করছেন। মঙ্গলবারের ৭৯ জনকে উদ্ধার সেই চলমান সংকটের সর্বশেষ উদাহরণ; যেখানে একই সঙ্গে রয়েছে জীবন রক্ষার অভিযান, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের কঠোরতা এবং নিরাপদ ও বৈধ অভিবাসনের বিকল্প সংকট।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








