ডেঙ্গুতে মৃত্যু ২৫০, আক্রান্ত ৮২ হাজার
ফাইল ছবি
চলতি বছর দেশে ডেঙ্গুর সংক্রমণ ও এর ফলে সৃষ্ট সংকট দিন দিন আরও গভীর ও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোলরুমের নিয়মিত তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবরের শুরুতে ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন জনস্বাস্থ্য ও মশাবাহিত রোগ বিশেষজ্ঞরা।
তাদের মতে, বিগত মাসগুলোর ধারাবাহিকতায় সাম্প্রতিক বৃষ্টিপাত এবং আবহাওয়ার প্রভাবে এই রোগটির প্রকোপ আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে, যা সামগ্রিক স্বাস্থ্যখাতের ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে আরও একজনের মৃত্যু হয়েছে এবং এর মধ্য দিয়ে চলতি বছরে ডেঙ্গুতে মোট প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৫০ জনে। একই সময়ে নতুন করে ১ হাজার ১৬৩ জন ডেঙ্গু রোগী দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর ফলে ১ জানুয়ারি থেকে ২ অক্টোবর পর্যন্ত সারা দেশে মোট ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা পৌঁছেছে ৮২ হাজার ৭৬১ জনে। অন্যদিকে, গত ২৪ ঘণ্টাতেই ১ হাজার ১৬৩ জন ডেঙ্গুরোগী হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন এবং এ নিয়ে চলতি বছরে এ পর্যন্ত মোট ৭৬ হাজার ৮৬২ জন রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়েছেন। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৫ হাজার ৬৪৯ জন রোগী।
আরও পড়ুন: ডেঙ্গুতে আরও ৬ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে ১৯৪৮
বিভাগ ও সিটি করপোরেশনওয়ারী পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন ভর্তি হওয়া ১ হাজার ১৬৩ জন রোগীর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় ৮০ জন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ৪৫ জন এবং ঢাকা বিভাগের অন্যান্য জেলায় (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ২৯৫ জন ভর্তি হয়েছেন। তবে বরাবরের মতো এবারও ঢাকার বাইরে রোগীর চাপ লক্ষ্য করা গেছে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম বিভাগে সর্বোচ্চ ৩৩৩ জন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এছাড়া বরিশাল বিভাগে ১৫১ জন, খুলনা বিভাগে ১১১৯ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ৭৭ জন এবং রংপুর বিভাগে ৭১ জন নতুন রোগী চিকিৎসাধীন অবস্থায় ভর্তি হয়েছেন।
চলতি বছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত মাসভিত্তিক ডেঙ্গু মৃত্যুর পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট হয়। বছরের শুরুতে অর্থাৎ জানুয়ারিতে ২ জন ও ফেব্রুয়ারিতে ২ জনের মৃত্যু হলেও মে মাসে ১ জন, জুনে ১৩ জন, জুলাইয়ে ৩৬ জন এবং আগস্টে ৪৩ জন মারা যান। পরিস্থিতি সবচেয়ে মারাত্মক রূপ নেয় সেপ্টেম্বর মাসে, যে মাসে এক মাসেই ডেঙ্গুতে ১৪৮ জনের মৃত্যু হয়েছে, যা চলতি বছরের এখন পর্যন্ত একমাসে সর্বোচ্চ মৃত্যুর রেকর্ড। এছাড়া অক্টোবরের প্রথম দুই দিনে ৫ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। ভৌগোলিক বিস্তারে দেখা যায়, এ বছর ডেঙ্গুতে একক এলাকা হিসেবে সর্বোচ্চ ৭০ জনের মৃত্যু হয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায়।
বাংলাদেশের বিগত বছরগুলোর ডেঙ্গু মহামারির চিত্রের সঙ্গে বর্তমান বছরের তুলনামূলক পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, বছরভিত্তিক সংক্রমণের এই ধারা জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। যেমন ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছিল ১ লাখ ২ হাজার ৮৬১ জন এবং ডেঙ্গুতে মোট ৪১৩ জনের মৃত্যু হয়েছিল। এর আগের বছর অর্থাৎ ২০২৪ সালে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ১ হাজার ২১৪ জন এবং প্রাণ হারিয়েছিল ৫৭৫ জন। অন্যদিকে, বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ডেঙ্গু বছর ছিল ২০২৩ সাল, যে বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন এবং প্রাণ হারিয়েছিলেন ১ হাজার ৭০৫ জন।
চলতি বছর ডেঙ্গুর এমন ভয়াবহ পরিস্থিতির পেছনে জলবায়ু পরিবর্তন, অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ন এবং কার্যকর মশা নিধন কার্যক্রমে ঘাটতিকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসায় হাসপাতালগুলোতে যাতে কোনো ধরনের সংকট তৈরি না হয়, সেজন্য স্বাস্থ্য বিভাগ বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। রোগ নির্ণয় সহজতর করতে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার পাশাপাশি দেশীয় পর্যায়েও নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল প্রাতিষ্ঠানিক চিকিৎসা নয়, বরং ব্যক্তিগত সচেতনতা এবং সিটি করপোরেশনের জোরালো লার্ভিসাইডিং কার্যক্রমের মাধ্যমেই কেবল এই পরিস্থিতির দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








