নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৪:২৮, ১ অক্টোবর ২০২৬

মিরপুরে হকার উচ্ছেদ ঘিরে সংঘর্ষে ৪ মামলায় আসামি ২ হাজার

মিরপুরে হকার উচ্ছেদ ঘিরে সংঘর্ষে ৪ মামলায় আসামি ২ হাজার

ছবি: সংগৃহীত

রাজধানীর মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর ও সংলগ্ন এলাকায় ফুটপাত থেকে অবৈধ হকার ও ভাসমান দোকান উচ্ছেদ অভিযানকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া নজিরবিহীন সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় কঠোর অবস্থানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এ ঘটনায় মিরপুর মডেল থানা ও কাফরুল থানায় মোট চারটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এসব মামলায় অজ্ঞাতনামা অন্তত দুই হাজার ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। ঘটনায় জড়িত সন্দেহে অভিযান চালিয়ে এখন পর্যন্ত ২৬ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। 

এদিকে বৃহস্পতিবার (০১ অক্টোবর) দিনভর মিরপুর এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করলেও সিটি করপোরেশনের উচ্ছেদ ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মারুফা বেগম নেলীর নেতৃত্বে মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর থেকে হোপ মার্কেটের দিকে ফুটপাতের অবৈধ দখল উচ্ছেদে অভিযান শুরু হয়। 

প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় দোকানিদের বিবরণ অনুযায়ী, অভিযানের একপর্যায়ে হোপ মার্কেটসংলগ্ন বায়তুল কুদ্দুস জামে মসজিদ মার্কেটের নিচে থাকা ভাসমান দোকান সরাতে গেলে খননযন্ত্র বা ভেকুর আঘাতে একটি বৈদ্যুতিক তার ছিঁড়ে শর্টসার্কিট হয়ে আকস্মিক আগুন ধরে যায়। মুহূর্তে আগুন মার্কেটের পাঁচটি দোকানে ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে ১৫ থেকে ২০ মিনিটের চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।

তবে মার্কেটের দোকান পুড়ে যাওয়ার পরপরই ক্ষুব্ধ হকার ও স্থানীয় ব্যবসায়ীরা সিটি করপোরেশনের কর্মীদের ওপর চড়াও হন এবং শুরু হয় তীব্র সংঘর্ষ। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছালে পরিস্থিতি আরও অবনতি হয়। হকাররা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতে শুরু করলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বেশ কয়েক রাউন্ড কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে। এই আকস্মিক সংঘর্ষের জেরে মিরপুর-১০ থেকে মিরপুর-১৪ নম্বর পর্যন্ত সড়কে দীর্ঘ সময় যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে।

সংঘর্ষ চলাকালীন সময়ে তীব্র ক্ষোভে ফেটে পড়েন হকাররা। এ সময় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও উচ্ছেদ কাজে ব্যবহৃত তিনটি গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। পাশাপাশি পুলিশের একটি গাড়ি, ট্রাফিক পুলিশ বক্স, একটি ভেকু এবং বেশ কয়েকটি যাত্রীবাহী বাসে ভাঙচুর চালানো হয়। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সংঘর্ষের ছবি ও ভিডিও ধারণ করতে যাওয়া বেশ কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মীও বাধার মুখে পড়েন এবং লাঞ্ছিত হন বলে অভিযোগ ওঠে। ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও হাতাহাতির এই ঘটনায় পুলিশ সদস্যসহ উভয় পক্ষের বেশ কয়েকজন আহত হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসার পর দুপুরের দিকে ডিএনসিসি কর্তৃপক্ষ পুনরায় পুলিশি নিরাপত্তায় উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে মিরপুর-১০ থেকে ১৩ নম্বর সড়কের দুই পাশের অবশিষ্ট ভাসমান দোকানগুলো গুঁড়িয়ে দেয়।

উত্তপ্ত এই পরিস্থিতি ও রাষ্ট্রীয় সম্পদহানির ঘটনায় পুলিশ ও সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে দ্রুত আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। মিরপুর মডেল থানায় তিনটি এবং কাফরুল থানায় একটিসহ মোট চারটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।

মিরপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাফিজুর রহমান জানান, থানায় দায়ের করা তিন মামলার মধ্যে দুটি মামলা করেছে পুলিশ এবং অপর মামলাটি করেছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। সিটি করপোরেশনের মামলায় সরকারি গাড়ি পোড়ানোর অভিযোগ আনা হয়েছে; একটি পুলিশ বাদী হয়ে পুলিশের ওপর হামলা ও সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে এবং ট্রাফিক পুলিশ বাদী হয়ে ট্রাফিক বক্স ভাঙচুর ও ট্রাফিক কার্যক্রমে বাধা দেওয়ার অভিযোগে আরেকটি মামলা করেছে। এই তিন মামলার প্রতিটিতে ১৭ জন করে সুনির্দিষ্ট নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা ৪০০ থেকে ৫০০ জন করে হকার ও দুষ্কৃতকারীকে আসামি করা হয়েছে।

আরও পড়ুন: মিরপুরে পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর, সিটি কর্পোরেশনের গাড়িতে আগুন

অন্যদিকে, কাফরুল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানান, সিটি করপোরেশনের গাড়ি পোড়ানোর ঘটনায় ডিএনসিসির পক্ষ থেকে কাফরুল থানাতেও একটি এজাহার দেওয়া হয়েছে। ওই মামলাতেও অজ্ঞাতনামা ৪০০ থেকে ৫০০ জনকে আসামি করা হয়েছে। সবমিলিয়ে চার মামলায় আসামির সংখ্যা প্রায় দুই হাজারে দাঁড়িয়েছে। 

ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস বিভাগ এবং মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) হাসান মোহাম্মাদ নাছের রিকাবদার নিশ্চিত করেছেন যে, সিসিটিভি ফুটেজ, স্থিরচিত্র ও ভিডিও যাচাই-বাছাই করে সহিংসতা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগে সরাসরি জড়িতদের সুনির্দিষ্টভাবে শনাক্ত করার প্রক্রিয়া চলছে। সুনির্দিষ্ট যাচাই-বাছাইয়ের পর এ পর্যন্ত মোট ২৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং আজ তাদের আদালতে পাঠানো হয়েছে। অভিযুক্তদের গ্রেফতারে মিরপুর ও কাফরুল থানা এলাকার বিভিন্ন পয়েন্টে সাঁড়াশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

সংঘর্ষ ও মামলার প্রভাবে আজ বৃহস্পতিবার মিরপুর-১০ ও মিরপুর-২ নম্বর এলাকা পুরোপুরি থমথমে রয়েছে। সকাল থেকে মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর থেকে ১৩ নম্বর পর্যন্ত সড়কের দুই পাশের ফুটপাতে কোনো হকার বা ভাসমান দোকানদারকে বসতে দেখা যায়নি। ফুটপাতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে হকারদের ফেলে যাওয়া ভাঙা চৌকি, হ্যালোজেন লাইটের ফোল্ডার এবং পোড়া বা ছেঁড়া বৈদ্যুতিক তার। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের দিনভর সড়কের আবর্জনা ও ভাঙাচোরা আসবাবপত্র পরিষ্কার করতে দেখা গেছে। যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে মিরপুর-১০ নম্বর চত্বরে অতিরিক্ত পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন রাখা হয়েছে।

এদিকে মিরপুর মডেল থানার প্রধান ফটকের সামনে আটক ও গ্রেফতার ব্যক্তিদের স্বজনদের আহাজারি ও ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। হানিফ নামের এক স্থানীয় ব্যক্তি অভিযোগ করেন, গত বুধবার রাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তার জামাই রুবেলকে বাসা থেকে তুলে নিয়ে এসেছে এবং পুলিশের ওপর হামলার মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। থানার সামনে অনেক নারী স্বজনকে কান্নাকাটি করতে দেখা যায়। এ সময় থানা থেকে কোনো প্রিজন ভ্যান বের হলেই স্বজনেরা সেটির পেছনে ছুটে যান এবং ভেতরে থাকা প্রিয়জনের নাম ধরে চিৎকার করে ডাকতে থাকেন।

রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এই বাণিজ্যিক ও জনবহুল এলাকায় ফুটপাত দখলমুক্ত রাখতে এবং জনসাধারণের নির্বিঘ্ন চলাফেরা নিশ্চিত করতে সিটি করপোরেশন কঠোর অবস্থানে রয়েছে। 

ডিএনসিসির প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, সরকারি কাজে বাধা এবং ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগের মতো অপরাধের পরও ফুটপাত দখলমুক্ত করার এই উচ্ছেদ অভিযান কোনোভাবেই থামবে না, বরং তা নিয়মিত ও অব্যাহত থাকবে। এর আগে হকারদের পুনর্বাসন বা বিকল্প স্থানে ব্যবসার সুযোগ দেওয়ার নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও অবৈধভাবে মূল সড়ক ও ফুটপাত দখল করে বসার কারণে জনদুর্ভোগ চরমে পৌঁছায়, যার পরিপ্রেক্ষিতেই এই ধারাবাহিক উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হচ্ছে বলে জানিয়েছে ডিএনসিসি।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

পাঠকপ্রিয়