পরাশক্তির দ্বন্দ্বে চড়া মূল্য দিচ্ছে বাংলাদেশ: তথ্যমন্ত্রী
ছবি: সংগৃহীত
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মতো পরাশক্তিগুলোর কৌশলগত প্রতিযোগিতা এবং বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে চলমান সংঘাতের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব বাংলাদেশের মতো ভোক্তা-নির্ভর উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর ক্রমেই বাড়ছে বলে মন্তব্য করেছেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী আন্দালিব রহমান পার্থ।
তার মতে, যেসব দেশের কোনো যুদ্ধ বা ভূরাজনৈতিক সংঘাতে সরাসরি সম্পৃক্ততা নেই, তারাও বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে জ্বালানিসহ প্রয়োজনীয় পণ্য অনেক বেশি দামে কিনতে বাধ্য হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্বার্থে আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা ও সংঘাতমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।
শনিবার (০৩ অক্টোবর) রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে শুরু হওয়া তিন দিনব্যাপী বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন ২০২৬-এর দ্য ফিউচার অব এশিয়া শীর্ষক লিডারশিপ ফোরাম সেশনে বক্তব্য দিতে গিয়ে এসব কথা বলেন তিনি।
৩ থেকে ৫ অক্টোবর আয়োজিত এবারের সম্মেলনে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, অর্থনৈতিক পুনর্বিন্যাস, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন, জলবায়ু ও মানবনিরাপত্তা, গণতন্ত্র ও শাসনব্যবস্থাসহ বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক নানা ইস্যু নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।
আয়োজক সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) জানিয়েছে, সম্মেলনে শতাধিক দেশের অংশগ্রহণ রয়েছে; এতে ২০০-এর বেশি বক্তা, ৩০০-এর বেশি প্রতিনিধি এবং এক হাজারের বেশি অংশগ্রহণকারী যুক্ত হচ্ছেন।
বিশ্বমঞ্চে মার্কিন-চীন কৌশলগত প্রতিযোগিতা এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক সংঘাতের প্রত্যক্ষ নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের মতো ভোক্তা পর্যায়ের উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর।
তথ্যমন্ত্রী আন্দালিভ রহমান পার্থ এই সম্মেলনে স্পষ্ট করেন যে, বৈশ্বিক এই দ্বন্দ্বে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা না থাকা সত্ত্বেও যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি আমদানিতে তাদের ৩ থেকে ৪ গুণ বেশি মূল্য চুকাতে বাধ্য করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চলমান অস্থিরতা ও সংঘাতের পথ পরিহার করে উন্নয়নশীল অর্থনীতির সুরক্ষায় বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার তাগিদ দেন তিনি।
একইসঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর এ ধরনের আমদানীকৃত ধাক্কা সামলানো বর্তমানে একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
আরও পড়ুন: গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী সরকার: তথ্যমন্ত্রী
বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার তথাকথিত তীব্র ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা নিয়ে দেশের ভেতর নানা আলোচনা থাকলেও, বাস্তবে এর ভিন্ন রূপ তুলে ধরেছেন যুক্তরাষ্ট্রের জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ক্যারল ক্রিস্টিন ফেয়ার।
কনভারসেশনের গ্র্যান্ড বলরুমে অনুষ্ঠিত একটি সেশনে তিনি মন্তব্য করেন যে, গণমাধ্যম বা জনমনে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের যে পরাশক্তিগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার ধারণা প্রচলিত রয়েছে, বাস্তবে তার প্রাবল্য ততটা নেই। চীন ও ভারত মূলত নিজেদের আঞ্চলিক প্রতিযোগিতার অংশ হিসেবে বাংলাদেশে নিজেদের উপস্থিতি ও আগ্রহ বাড়াচ্ছে।
অপরদিকে, চীনের মতো বিশাল পরিসরে বাংলাদেশে বিনিয়োগ করার সমতুল্য অর্থনৈতিক সম্পদ বা সক্ষমতার ঘাটতি যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে। ফলে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে বলে মনে করেন এই মার্কিন বিশেষজ্ঞ।
অধ্যাপক ক্যারল ক্রিস্টিন ফেয়ার আরও স্পষ্ট করেছেন যে, বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের যে সুদৃঢ় ও মৌলিক অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে, চাইলেও তা থেকে ঢাকাকে দূরে রাখতে পারবে না যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি পুরোপুরি নিজেদের জাতীয় স্বার্থের ওপর প্রতিষ্ঠিত। তাই দেশটি নিজের স্বার্থে যা লাভজনক মনে করবে, ঠিক সেই পথেই এগোবে। অর্থাৎ, বেইজিংয়ের সঙ্গে ঢাকার অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক হ্রাসে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক চাপ বা প্রচেষ্টা খুব একটা ফলপ্রসূ হবে না।
দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কাঠামোর সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে তথ্যমন্ত্রী আন্দালিভ রহমান পার্থ জানান যে, গত দুই দশকের ধারাবাহিক ও পরিকল্পিত নেতৃত্বের শূন্যতার কারণে দেশের নীতিনির্ধারণী ও রাজনৈতিক পরিসরে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। বিগত বছরগুলোতে সচেতনভাবেই তরুণ প্রজন্মকে রাজনীতি ও রাষ্ট্রগঠনমূলক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখা হয়েছিল। তবে বর্তমান সময়ে যেকোনো বড় জাতীয় সংকটে সমগ্র জাতির ঐক্যবদ্ধ হওয়া বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা। এই ঐক্যের ধারাকে টিকিয়ে রেখে তরুণদের মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব দূর করতে হবে এবং তাদের যথাযথভাবে দেশ গড়ার কাজে সম্পৃক্ত করাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
পরিশেষে, বে অব বেঙ্গল কনভারসেশনের এই আলোচনাগুলো প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশের সামনে একদিকে যেমন বৈশ্বিক জ্বালানি ও অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার চ্যালেঞ্জ রয়েছে, অন্যদিকে তেমনি পরাশক্তিগুলোর হিসাব-নিকাশ পাশ কাটিয়ে নিজস্ব স্বকীয়তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ বজায় রাখার কূটনৈতিক কৌশলও নির্ধারণ করতে হচ্ছে। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তরুণ প্রজন্মের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে না পারলে দীর্ঘমেয়াদী টেকসই উন্নয়ন অর্জন ব্যাহত হতে পারে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








