ভূমধ্যসাগরে ১০ দিনের মৃত্যুযাত্রা, প্রাণ গেল ৯ বাংলাদেশির
ছবি: সংগৃহীত
লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে গ্রিস যাওয়ার পথে মর্মান্তিক দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন বাংলাদেশি অভিবাসনপ্রত্যাশীরা। নেভিগেশন ব্যবস্থা ও জ্বালানি সংকটে দিকভ্রষ্ট হয়ে প্রায় ১০ থেকে ১১ দিন সাগরে ভাসমান থাকার পর তীব্র গরম, অনাহার ও পানিশূন্যতায় ৯ জন বাংলাদেশি ও ১ জন সুদানি নাগরিকসহ মোট ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। মিসরের মারসা মাতরুহ উপকূল থেকে ২৯ জন বাংলাদেশিকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে, যাদের মধ্যে অনেকেই গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
কায়রোতে বাংলাদেশ দূতাবাসের তথ্য এবং বেঁচে যাওয়া যাত্রীদের বিবরণে জানা যায়, গত ৩ আগস্ট মানবপাচারকারী চক্রের সহায়তায় লিবিয়ার তবরুক থেকে একটি রাবারের নৌকায় করে গ্রিসের উদ্দেশে যাত্রা করেন মোট ৪২ জন অভিবাসনপ্রত্যাশী। এই দলে ৩৮ জন বাংলাদেশি এবং ৪ জন সুদানের নাগরিক ছিলেন। পাচারকারীরা যাত্রার আগে তাদের আশ্বস্ত করেছিল যে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে গ্রিসে পৌঁছাতে মাত্র ৩৬ ঘণ্টা বা এর কাছাকাছি সময় লাগবে। তবে সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত ও ঝুঁকিপূর্ণ এই যাত্রার আয়োজন করা হয়েছিল একটিমাত্র স্পিডবোটের ইঞ্জিনযুক্ত সাধারণ রাবারের নৌকায়, যাতে ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি লোক তোলা হয়েছিল।
বেঁচে যাওয়া যাত্রী আব্দুল করিমের ভাষ্যমতে, রাবারের নৌকাটিতে সর্বোচ্চ ২৫ জন যাত্রী বহনের সক্ষমতা থাকলেও সেখানে ৪২ জনকে গাদাগাদি করে তোলা হয়েছিল এবং নৌকাটিতে কোনো ধরনের উপযুক্ত নেভিগেশন বা দিকনির্ণয় ব্যবস্থা ছিল না।
যাত্রার কিছুদিন পরই নৌকাটির জ্বালানি ফুরিয়ে যায় এবং উপযুক্ত নেভিগেশন ব্যবস্থার অভাবে মাঝসমুদ্রে দিক হারিয়ে সম্পূর্ণ ভাসমান হয়ে পড়ে। প্রায় ১০ থেকে ১১ দিন ধরে খাদ্য ও পানীয় ছাড়া ভূমধ্যসাগরের উত্তাল ও লবণাক্ত পানিতে ভাসতে থাকে নৌকাটি। দীর্ঘ সময় সাগরে আটকে থাকায় তীব্র দাবদাহ, প্রচণ্ড রোদ, খাবার ও সুপেয় পানির চরম সংকটে একে একে যাত্রীদের শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকে।
বেঁচে যাওয়া যাত্রী আবদুল করিম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এবং দূতাবাস কর্মকর্তাদের কাছে দেওয়া বর্ণনায় জানান, চোখের সামনে ৯ জন বাংলাদেশি একে একে মারা যান। পরবর্তীতে আরও এক সুদানি নাগরিকসহ মোট ১০ জনের মৃত্যু হয়। দিনের পর দিন দীর্ঘ সময় তীব্র গরমে মরদেহগুলো নৌকার মধ্যেই পচে যাওয়ায় এবং মারাত্মক দুর্গন্ধ ছড়ানোর কারণে জীবিত যাত্রীরা বাধ্য হয়ে মৃতদেহগুলো সমুদ্রে ভাসিয়ে দেন। এছাড়া দীর্ঘ সময় লবণাক্ত পানিতে থাকার কারণে বেঁচে থাকা যাত্রীদের শরীরের বিভিন্ন অংশেও পচন ধরতে শুরু করেছিল এবং তাদের শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন হয়ে পড়েছিল।
গত ১৩ আগস্ট নৌকাটি মিসরের মারসা মাতরুহ এলাকার উপকূলে এসে পৌঁছালে স্থানীয় লোকজন তা দেখতে পেয়ে পুলিশকে খবর দেয়। পরবর্তীতে স্থানীয় পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছে ২৯ জন বাংলাদেশিকে জীবিত উদ্ধার করে। উদ্ধারকৃতদের মধ্যে ১৮ জন গুরুতর অসুস্থ ও অচেতন অবস্থায় ছিলেন। তাদের দ্রুত মারসা মাতরুহ জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বর্তমানে পুলিশের তত্ত্বাবধানে মোট ২৯ জন বাংলাদেশি অভিবাসনপ্রত্যাশী সেখানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
ঘটনার খবর পাওয়ার পরপরই কায়রোস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রথম সচিব (শ্রম) মোড. জাকির হোসেন স্থানীয় পুলিশ এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে জরুরি যোগাযোগ স্থাপন করেন। দূতাবাসের পক্ষ থেকে চিকিৎসাধীন বাংলাদেশিদের শারীরিক অবস্থার নিয়মিত খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে এবং তাঁদের প্রয়োজনীয় কনস্যুলার ও অন্যান্য সহযোগিতা দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
আরও পড়ুন: লিবিয়ায় জিম্মি ১৩ বাংলাদেশি উদ্ধার, গ্রেফতার ১
দূতাবাস জানিয়েছে, চিকিৎসাধীন প্রবাসীরা সুস্থ হয়ে উঠলে মিসরের প্রচলিত আইন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে তাঁদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে সরকারি ব্যবস্থাপনায় দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হবে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সীমান্ত সংস্থা ফ্রন্টেক্স (Frontex) এবং ব্র্যাকের তথ্য অনুযায়ী, লিবিয়া থেকে সমুদ্রপথে ইউরোপ বা গ্রিসে পাড়ি জমানোর এই পথটি সেন্ট্রাল মেডিটেরিয়ান রুট হিসেবে পরিচিত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইতালির পাশাপাশি গ্রিসের উদ্দেশে সমুদ্রপথে পাড়ি জমানোর প্রবণতা বাংলাদেশিদের মধ্যে আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
ব্র্যাকের প্রতিবেদনে প্রকাশিত ফ্রন্টেক্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই অন্তত ৩ হাজার ৬০৮ জন বাংলাদেশি এই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথ পাড়ি দিয়ে গ্রিসে পৌঁছেছেন। এর আগে চলতি বছরের মার্চ মাসেও লিবিয়া থেকে গ্রিসের উদ্দেশে যাত্রা করা একটি নৌকায় অন্তত ১৮ জন বাংলাদেশির মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছিল, যার মধ্যে ১২ জনই ছিলেন সুনামগঞ্জ জেলার।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০০৯ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত এই একটিমাত্র রুট দিয়েই প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার বাংলাদেশি অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ উপায়ে ইউরোপে প্রবেশ করেছেন। এর মধ্যে শুধু ২০২৫ সালেই ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়েছেন ২০ হাজার ২৫৯ জন বাংলাদেশি।
বিশেষজ্ঞ ও অভিবাসী নিয়ে কাজ করা সংস্থাগুলোর মতে, যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তান বা দারিদ্র্যপীড়িত সুদানের নাগরিকদের পেছনে ফেলে বাংলাদেশিদের এই মৃত্যুর মিছিলে শীর্ষ অবস্থানে থাকা দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এই মানবপাচার চক্রের মূলোৎপাটনে বিচ্ছিন্ন কোনো পদক্ষেপের সুযোগ নেই; বরং সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে কঠোর রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজন।
এদিকে আন্তর্জাতিক এই ট্রাজেডির রেশ ধরে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মর্মান্তিক এই ঘটনার শিকার হওয়া সুনামগঞ্জ জেলার শান্তিগঞ্জ উপজেলার অন্তত পাঁচ তরুণের এখনো কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। নিখোঁজ যুবকরা হলেন শান্তিগঞ্জের পাগলা শত্রুমর্দান গ্রামের হৃদয় পাল, চিকরকান্দি গ্রামের এনামুল খান, রিপন মিয়া ও মামুন খান এবং রানসি গ্রামের মো. তালহা।
নিখোঁজ হৃদয়ের চাচা কানন পাল গণমাধ্যমকে জানান, গত ৩১ জুলাই হৃদয়ের সঙ্গে তার শেষ কথা হয়েছিল এবং তখন তিনি জানিয়েছিলেন যে ৩ আগস্ট তিনি গ্রিসের উদ্দেশে যাত্রা করবেন। পরবর্তীতে একাধিক নৌকা ছেড়ে যাওয়ায় এবং প্রথম নৌকার যাত্রীরা যোগাযোগ করতে পারলেও দ্বিতীয় নৌকায় থাকা হৃদয়ের কোনো সন্ধান না মেলায় পরিবারগুলো চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এলাকার কিছু প্রভাবশালী দালাল চক্র ও পাচারকারী সিন্ডিকেট ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে আশ্বস্ত করার পাশাপাশি গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা না বলার জন্য চাপ সৃষ্টি করছে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








