নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ২০:০৬, ১৯ মে ২০২৬

লিবিয়া থেকে ফিরলেন ১৭০ বাংলাদেশি, ফেরার অপেক্ষায় আরও ৩৫০

লিবিয়া থেকে ফিরলেন ১৭০ বাংলাদেশি, ফেরার অপেক্ষায় আরও ৩৫০

ছবি: সংগৃহীত

লিবিয়ার বেনগাজী অঞ্চলের কুখ্যাত 'গানফুদা ডিটেনশন সেন্টার' (আটক কেন্দ্র) সহ বিভিন্ন স্থানে আটকে থাকা ও চরম বিপদগ্রস্ত ১৭০ জন বাংলাদেশি নাগরিক অবশেষে সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় ও নিরাপদে দেশে প্রত্যাবর্তন করেছেন। 

মঙ্গলবার ভোর ৫টায় লিবিয়ার বুরাক এয়ারের একটি বিশেষ চার্টার্ড ফ্লাইটে তারা ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন। অত্যন্ত সংবেদনশীল ও মানবিক এই প্রত্যাবাসন কার্যক্রমটি বাংলাদেশ সরকারের তিনটি প্রধান অঙ্গ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং লিবিয়ার ত্রিপলীতে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের যৌথ ও নিবিড় সমন্বয়ে সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এই পুরো প্রক্রিয়ায় লিবিয়ার স্থানীয় প্রশাসন ও জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) মাঠ পর্যায়ে সার্বিক ও কারিগরি সহযোগিতা প্রদান করেছে।

বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পরপরই সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং আইওএম-এর প্রতিনিধি দল ফিরে আসা এই অনিয়মিত অভিবাসীদের আনুষ্ঠানিকভাবে অভ্যর্থনা জানান। প্রাথমিক স্ক্রিনিং ও জরুরি প্রক্রিয়া শেষে আইওএম-এর পক্ষ থেকে প্রত্যেককে বাড়িতে ফেরার জন্য নগদ পথখরচা, জরুরি খাদ্যসামগ্রী, জরুরি প্রাথমিক চিকিৎসা এবং পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রয়োজন অনুযায়ী অস্থায়ী বাসস্থানের মানবিক সুবিধা প্রদান করা হয়।

এই বৃহৎ দলটির প্রত্যাবাসনের নেপথ্য অনুসন্ধান এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, লিবিয়া থেকে ফেরত আসা এই নাগরিকদের একটি বিশাল অংশই মূলত ভাগ্য অন্বেষণের নামে আন্তর্জাতিক মানবপাচার ও দালাল চক্রের ভয়ানক প্ররোচনার শিকার হয়েছিলেন। তারা বাংলাদেশ থেকে বিপুল অঙ্কের অর্থ খরচ করে সম্পূর্ণ অবৈধ উপায়ে, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার বিভিন্ন রুট ব্যবহার করে লিবিয়ায় অনুপ্রবেশ করেন। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল লিবিয়ার উপকূলীয় অঞ্চল থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে অনিয়মিত ও ঝুঁকিপূর্ণ উপায়ে ইউরোপের কোনো দেশে প্রবেশ করা। তবে ইউরোপের সোনালী স্বপ্নের বাস্তব রূপ ছিল অত্যন্ত নৃশংস। লিবিয়ায় অবস্থানকালে এই বাংলাদেশিদের একটি বড় অংশই স্থানীয় সশস্ত্র অপরাধী চক্র ও মাফিয়াদের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েন। সেখানে তাদের ওপর চালানো হয় অমানুষিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, অবরুদ্ধ করে রাখা হয় অন্ধকার ঘরে এবং মুক্তিপণ আদায়ের উদ্দেশ্যে দেশে তাদের পরিবারের কাছে পাঠানো হতো নির্যাতনের অডিও-ভিডিও। বন্দিদশা, নির্যাতন এবং পুষ্টিহীনতার কারণে বিমানবন্দরে নামা ১৭০ জনের মধ্যে অন্তত ১৯ জন বাংলাদেশি অভিবাসী মারাত্মকভাবে অসুস্থ ও শারীরিকভাবে বিপর্যস্ত অবস্থায় দেশে ফিরেছেন, যাদের তাৎক্ষণিক বিশেষ চিকিৎসার আওতায় আনা হয়েছে।

আরও পড়ুন: মালয়েশিয়ায় ৫ নারীকে হেনস্তার দায়ে এক বাংলাদেশিকে বেত্রাঘাত ও জেল

বাংলাদেশ সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতার একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ফসল হিসেবে এই বাংলাদেশিদের উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। লিবিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশ দূতাবাস জানিয়েছে, দেশটির বিভিন্ন ডিটেনশন সেন্টারে অনিচ্ছাকৃতভাবে আটকে থাকা এবং আইনি জটিলতায় পড়া বাংলাদেশি নাগরিকদের দ্রুত ও নিরাপদ প্রত্যাবাসনের লক্ষ্যে দূতাবাস স্থানীয় প্রশাসন এবং আইওএম-এর সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করে যাচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় দূতাবাসের একটি বিশেষ প্রতিনিধি দল নিয়মিত বিরতিতে ত্রিপলীর 'তাজুরা ডিটেনশন সেন্টার' এবং বেনগাজীর 'গানফুদা ডিটেনশন সেন্টার' পরিদর্শন করে সেখানে বন্দি থাকা বাংলাদেশিদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ, নাগরিকত্ব যাচাই-বাছাই এবং ট্রাভেল পারমিট ইস্যুর কাজ সম্পন্ন করছে। এই নিবিড় আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই আজকের এই ১৭০ জনের মুক্তি ও স্বদেশে প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। 

লিবিয়া সরকার ও দূতাবাসের এই যৌথ প্রচেষ্টা এখানেই থেমে থাকছে না; দূতাবাস সূত্রে আরও নিশ্চিত করা হয়েছে যে, আগামী ২৪ এবং ৩১ মে লিবিয়ার বিভিন্ন ডিটেনশন সেন্টার থেকে আরও অন্তত ৩৫০ জন বাংলাদেশি নাগরিককে দুটি পৃথক ফ্লাইটে দেশে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে সমস্ত প্রশাসনিক প্রস্তুতি ও কূটনৈতিক ছাড়পত্র গ্রহণের কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।

এদিকে, এই ভয়াবহ মানবিক সংকট ও অবৈধ অভিবাসনের লাগাম টানতে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে একটি দৃঢ় ও জনসচেতনতামূলক বার্তা দেওয়া হয়েছে। বিমানবন্দরে উপস্থিত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা ফিরে আসা বাংলাদেশিদের প্রতি বিশেষ অনুরোধ জানিয়েছেন, তারা যেন দালাল চক্রের মুখোশ উন্মোচন করতে এবং মানবপাচারের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী জোরালো জনসচেতনতা তৈরি করতে নিজেদের জীবনের এই দুর্বিষহ ও ভয়াবহ অভিজ্ঞতাগুলো নিজ নিজ এলাকার সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরেন। 

সরকার মনে করে, ভুক্তভোগীদের মুখ থেকে সমুদ্রপথের এই নিষ্ঠুর বাস্তবতার গল্প শুনলে দেশের আর কোনো যুবক বা পরিবার যেন এমন আত্মঘাতী ও ঝুঁকিপূর্ণ পথে পা বাড়াতে প্ররোচিত হবে না। একই সঙ্গে, লিবিয়ায় এখনও আটকে থাকা অন্যান্য বাংলাদেশিদের সম্পূর্ণ নিরাপদে ও পর্যায়ক্রমে স্বদেশে ফিরিয়ে আনতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) তাদের সমন্বিত উদ্ধার অভিযান ও আইনি সহায়তা কার্যক্রম জোরদারভাবে অব্যাহত রাখবে বলে পুনর্ব্যক্ত করেছে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়