উয়েফার বয়কট হুমকি প্রত্যাহারে ফিফার স্বস্তি
ছবি: সংগৃহীত
বিশ্ব ফুটবলের অঙ্গনে দীর্ঘ কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা চরম অনিশ্চয়তা ও উত্তেজনার পর অবশেষে বড় ধরনের স্বস্তি ফিরেছে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ামক সংস্থা ফিফায়। ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর বিতর্কিত বাণিজ্যিক পরিকল্পনা ঘিরে ইউরোপীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (উয়েফা) সঙ্গে যে বরফ জমেছিল, তা গলতে শুরু করেছে। উয়েফার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ফিফার মেগা টুর্নামেন্টগুলো বয়কটের যে হুমকি দেওয়া হয়েছিল, তা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহার করে নেওয়ার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
গত জুলাইয়ের শেষ দিকে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত ও সমালোচিত একটি বাণিজ্যিক প্রস্তাব সামনে এনেছিলেন।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ (FFE) নামের একটি নতুন বাণিজ্যিক সহযোগী প্রতিষ্ঠান গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এই উদ্যোগের মাধ্যমে পুরুষ বিশ্বকাপ ও ক্লাব বিশ্বকাপের মতো মেগা টুর্নামেন্টগুলোর বাণিজ্যিক স্বত্বের প্রায় ২০ শতাংশ বা প্রায় ৪.২ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ শেয়ার বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির পরিকল্পনা করা হয়েছিল। আনুমানিক ২০ বিলিয়ন ডলারের (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকা) এই মূল্যায়ন সামনে আসতেই ফুটবল বিশ্বে তীব্র সমালোচনার ঝড় ওঠে।
সমালোচকরা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে অভিযোগ তোলেন যে, ফিফা বৈশ্বিক ফুটবলকে ব্যক্তিগত লাভের পণ্যে পরিণত করতে চাইছে। উয়েফা সভাপতি আলেকজান্ডার সেফেরিনের নেতৃত্বে উয়েফার ৫৫টি সদস্য দেশ কঠোর অবস্থান নিয়ে জানিয়ে দেয় যে, এই বাণিজ্যিক চক্রান্ত বহাল থাকলে উয়েফার কোনো দল ফিফার প্রতিযোগিতায় অংশ নেবে না। কাতার ও দক্ষিণ আমেরিকার কনমেবল ছাড়াও অন্যান্য মহাদেশীয় সংস্থাগুলোর যৌথ আপত্তির মুখে তীব্র চাপে পড়ে ফিফা দ্রুত ওই পরিকল্পনাটি স্থগিত ও প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়।
পরিকল্পনা প্রত্যাহার করা হলেও উয়েফা সহজে সন্তুষ্ট হয়নি। ইউরোপীয় সংস্থাটির পক্ষ থেকে দুটি কঠোর শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছিল প্রথমত, বাণিজ্যিক স্বত্ব বিক্রির প্রস্তাব চিরতরে বাতিল করতে হবে এবং দ্বিতীয়ত, ভবিষ্যতে ফুটবলের ঐতিহ্য ও কাঠামো বিকৃত করার মতো এ ধরনের উদ্যোগ আর কখনো নেওয়া হবে না এমন আইনি বা লিখিত নিশ্চয়তা প্রদান করতে হবে।
আরও পড়ুন: ঢাকার মাঠে কি আসছে ব্রাজিল? সম্ভাব্য মেগা ম্যাচ নিয়ে বাফুফে ব্যস্ত সমীকরণে
সাম্প্রতিক গোপনীয় ও কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে ফিফা সেই নিশ্চয়তা প্রদান করায় উয়েফা তাদের বয়কটের অবস্থান থেকে সরে আসছে। ফ্রান্সের বিখ্যাত পর্যটন শহর মোনাকোতে অনুষ্ঠিত উয়েফার নির্বাহী কমিটি এবং সদস্য অ্যাসোসিয়েশনগুলোর সভাপতিদের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত করা হয়েছে।
উয়েফার ভেতরের সূত্রগুলো জানিয়েছে, বয়কট তুলে নেওয়ার এই সিদ্ধান্তটি কোনো পক্ষের হার-জিত নয়, বরং তরুণ ফুটবলারদের ক্যারিয়ার এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার স্বার্থে নেওয়া একটি বাস্তবসম্মত ও অনিবার্য পদক্ষেপ।
উয়েফার এই ইতিবাচক সিদ্ধান্তের ফলে আগামী মাসেই পোল্যান্ডে শুরু হতে যাওয়া ফিফা অনূর্ধ্ব-২০ নারী বিশ্বকাপ নিয়ে সব শঙ্কা কেটে গেছে। আগামী ৫ থেকে ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পোল্যান্ডের মাটিতে অনুষ্ঠেয় এই টুর্নামেন্টে স্বাগতিক দেশ ছাড়াও ইউরোপের পাওয়ারহাউজ হিসেবে পরিচিত ইংল্যান্ড, স্পেন, ফ্রান্স, ইতালি ও পর্তুগালের মতো ঐতিহ্যবাহী দলগুলোর অংশগ্রহণের পথ সম্পূর্ণ পরিষ্কার হয়েছে। বয়কট বহাল থাকলে যুব ও নারী ফুটবলাররা অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়তেন, যা এড়াতে দুই পক্ষই সমঝোতার পথ বেছে নেয়।
বয়কটের হুমকি সাময়িকভাবে দূর হলেও ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর রাজনৈতিক সংকট ও নেতৃত্ব নিয়ে অস্বস্তি কাটেনি।
ইউরোপীয় ফুটবলের শীর্ষ নেতৃত্ব পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে যে, বয়কট তুলে নেওয়া হলেও ইনফান্তিনোর কার্যপদ্ধতি ও একক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সংস্কৃতির বিরুদ্ধে তাদের রাজনৈতিক চাপ ও সমালোচনা অব্যাহত থাকবে।
ইতিমধ্যে উয়েফার পাশাপাশি এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (AFC) এবং কনকাকাফ (CONCACAF)-এর মতো সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকেও ফিফা নেতৃত্বের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে। এছাড়া ইউরোপের প্রভাবশালী ফুটবল ফেডারেশনগুলো যেমন ইতালি, ইংল্যান্ড, ওয়েলস ও আয়ারল্যান্ড আগামী ২০২৭ সালের ১৮ মার্চ মরক্কোর রাবাতে অনুষ্ঠব্য ফিফা সভাপতি নির্বাচনে ইনফান্তিনোর বিপক্ষে নিজেদের অনাস্থা প্রকাশ করেছে এবং বর্তমান মেয়াদের শেষ প্রান্তে এসে তার বিকল্প খোঁজার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। আগামী ১৮ নভেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত সভাপতি পদপ্রার্থী হিসেবে নাম নিবন্ধনের সময়সীমা নির্ধারিত থাকায় বিশ্ব ফুটবলের ক্ষমতার মসনদে বড় ধরনের পরিবর্তনের হাওয়া লাগার জোর সম্ভাবনা রয়েছে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








