শরিফুলের ৬ উইকেটে আশা বাঁচিয়ে রাখল বাংলাদেশ
ছবি: সংগৃহীত
একের পর এক ব্যর্থতা উপহার দিয়েছেন তারা। প্রথম ৬ ব্যাটারের মধ্যে ৪ জনই ফিরেছেন রাতের খাতা খোলার আগেই। টেল-এন্ডারদের কল্যাণে কোনোমতে লজ্জার রেকর্ড এগিয়ে থামে বাংলাদেশ। সেই ব্যর্থতা ঢাকতে যেভাবে বোলিং করার দরকার ছিল, শুরুতে সেটি করতে পারেনি। ক্রমেই যেন ম্যাচ ছিটকে যাচ্ছিল সফরকারীরা। এরপর পেস আগ্রাসন দেখিয়ে বাংলাদেশকে ম্যাচে ফেরান শরিফুল। সবমিলিয়ে প্রথম দিনে উইকেট পড়েছে ১৮টি।
শনিবার (২২ আগস্ট) ম্যাকাইয়ের গ্রেট বেরিয়ার রিফ অ্যারেনায় দ্বিতীয় টেস্ট খেলতে নেমেছিল বাংলাদেশ। প্রথম দিন শেষে ৪০ ওভারে ৮ উইকেট হারিয়ে ১৬৫ রান করেছে অস্ট্রেলিয়া। বাংলাদেশকে ১০১ রানের লিড দিয়েছে স্বাগতিকরা। ৮১ বলে ৫১ রান করে অপরাজিত আছেন ক্যামেরন গ্রিন আর ২৮ বলে ১০ রান করে নাথান লায়ন। এর আগে নিজেদের প্রথম ইনিংসে ৬৪ রান করেছিল বাংলাদেশ।
ব্যাটিংয়ে নেমে শুরুটা ভালোই করেছিল অস্ট্রেলিয়া। ইনিংসের তৃতীয় ওভারে বাংলাদেশকে সাফল্য এনে দেন তাসকিন আহমেদ। জ্যাক ওয়েদারাল্ডের পরিবর্তে একাদশে ফেরা ম্যাথু রেনশকে ফেরান তিনি। ১০ বলে ৮ রান করেন রেনশ।
এরপর জুটি গড়ার চেষ্টা করেন ট্রাভিস হেড আর মার্নাস লাবুশেন। ২৬ বলে ১৮ রানের জুটি গড়েন তারা। বোলিংয়ে এসেই সেই জুটি ভাঙেন শরিফুল ইসলাম। বোল্ড করে ফেরান হেডকে। ২৭ বলে ২২ রান করেন হেড। একই ওভারে আরেক ব্যাটার লাবুশেনকেও (৯ বলে ৪) ফিরিয়ে দেন শরিফুল।
আরও পড়ুন: ৬৪ রানে অলআউট বাংলাদেশ
সেই ধাক্কা সামলে শক্ত প্রতিরোধ গড়েন স্টিভেন স্মিথ আর ক্যামেরন গ্রিন। চতুর্থ উইকেটে জুটি গড়ে বাংলাদেশকে হতাশ করেন তারা। হাফসেঞ্চুরি ছাড়িয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলেন তারা। আবারও সেই জুটি ভাঙেন শরিফুল। হাফসেঞ্চুরির কাছাকাছি চলে যাওয়া স্মিথকে ফেরান তিনি। ৭৪ বলে ৪২ রান করে এলবিডব্লিউয়ের শিকার হয়ে ফেরেন স্মিথ। ভাঙে ৭৪ রানের জুটি।
স্মিথ ফিরলেও ক্যারিকে নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলেন গ্রিন। এই জুটি ভাঙতে নতুন কৌশল আঁটেন অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত। এতো সময় দুই প্রান্ত থেকেই পেসারদের দিয়ে বল করাচ্ছিলেন তিনি। প্রথমবার বোলিংয়ে পরিবর্তন এনে বল তুলে দেন স্পিনার মেহেদী হাসান মিরাজের হাতে। প্রথম ওভারেই উইকেট এনে দেন মিরাজ। ৩১তম ওভারের শেষ বলে ফেরান অ্যালেক্স ক্যারিকে (৮ বলে ৫)।
পরের ওভারে বোলিংয়ে এসে জোড়া আঘাত হানেন শরিফুল। তার তৃতীয় বলে ব্যাট-বলে সংযোগ করতে পারেননি বেউ ওয়েবস্টার। বল গিয়ে আঘাত হানে প্যাডে। আম্পায়ার আউট দিলে, রিভিউ নেন ওয়েবস্টার। তবে রিভিউ তার পক্ষে যায়নি। গোল্ডেন ডাক মেরে ফেরেন তিনি।
এরপর পঞ্চম বলে লিটন দাসের ক্যাচ বানান প্যাট কামিন্সকে। শরিফুলের বাউন্সার বুঝতে পারেননি অসি অধিনায়ক। গ্লাভস ছুঁয়ে বল চলে যায় লিটন দাসের হাতে। বাংলাদেশের আবেদনে আম্পায়ার আঙ্গুল তুলে দেন। ২ বলে কোনো রানই করতে পারেননি কামিন্স। অসি অধিনায়ককে ফিরিয়ে ফাইফার পূর্ণ করে নেন শরিফুল। এটি তার টেস্ট ক্যারিয়ারের প্রথম ফাইফার।
নিজের পরের ওভারে এসে আরেক শিকার ধরেন শরিফুল। এবার ফেরান মিচেল স্টার্ককে। ৬ বল খেলে ১ রান করতে পেরেছেন তিনি। অস্ট্রেলিয়ার হয়ে ৬ উইকেট নেওয়া স্টার্ককে ফিরিয়ে নিজের ষষ্ঠ উইকেট তুলে নেন শরিফুল।
এতে আজই অস্ট্রেলিয়ার গুটিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু শেষ বিকেলে আর কোনো বিপদ ঘটতে দেননি গ্রিন আর লায়ন। দুজন মিলে নবম উইকেট জুটিতে খেলেছেন ৪২ বল। রান করেছেন ১৭। পার করে দিয়েছেন প্রথম।
এর আগে টস হেরে ব্যাটিং করতে নেমে যেন রীতিমতো চোখে সরষে ফুল দেখেছে বাংলাদেশ। দায়িত্ব নিতে পারেনি টপঅর্ডার কিংবা মিডলঅর্ডারের কোনো ব্যাটার। আগের ম্যাচে যেই স্টার্ক উইকেট না পেয়ে হতাশায় পুড়েছেন, আজ প্রথম সাত ওভারেই তিনি ধরেছেন পাঁচ শিকার। তুলে নিয়েছেন ফাইফার। বাকি কাজটা সেরেছেন প্যাট কামিন্স আর হ্যাজলউডরা।
ইনিংসের প্রথম বলেই উইকেট হারায় বাংলাদেশ। স্টার্কের বলে ওপেনার সাদমান ইসলাম ক্যাচ দেন ক্যামেরন গ্রিনের হাতে। আরেক ওপেনার তানজিদ হাসান তামিমের উইকেটে স্থায়ীত্ব হয়েছে ২ বল। তিনিও রানের খাতা খুলতে পারেননি। স্টার্কের বলে ক্যাচ দিয়েছেন বেউ ওয়েবস্টারকে।
একই পথের পথিক অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত। উইকেটে তিনিও এক বলের বেশি সময় থাকতে পারেননি। ৫ বল খেলে রানের খাতা খুলতে পারেননি লিটন দাসও। এই দুই ব্যাটারই স্টার্কের বলে এলবিডব্লিউয়ের শিকার হয়েছেন। প্রথম পাঁচ ব্যাটারের মধ্যে রানের দেখা পেয়েছেন কেবল মুমিনুল হক। ১৬ বলে ৫ রান করে ধরা পড়েছেন গ্রিনের হাতে।
এমন ব্যাটিং ধসের বিপরীতে কিছুটা আশা দেখিয়েছিলেন অভিজ্ঞ মুশফিকুর রহিম আর মেহেদী হাসান মিরাজ। ধংস্তুপে পড়া বাংলাদেশকে টেনে তোলার চেষ্টা করেছিলেন তারা। কিন্তু সেই চেষ্টাও সফল হয়নি। ষষ্ঠ উইকেটে ৫৩ বলে ৯ রানের জুটি ভেঙেছে প্যাট কামিন্সের বলে মুশফিক বোল্ড হয়ে ফিরলে। ৪২ বল থেকে ৫ রান এসেছে মুশির ব্যাট থেকে।
এতেই শঙ্কা জেগেছিল মধ্যাহ্ন বিরতির আগেই গুটিয়ে যাওয়ার। তেমনটা হতে দেননি মিরাজ আর হাসান মাহমুদ। ৫৫ বলে ১৫ রানের জুটি গড়ে প্রথম সেশন পার করেন তারা। তবে দ্বিতীয় সেশনে ফিরতেই আবারও শুরু হয় ব্যাটিং ধস। দ্বিতীয় সেশনের দ্বিতীয় ওভারেই মিরাজকে ফেরান কামিন্স। ওযেবস্টারকে ক্যাচ দেওয়ার আগে তার ব্যাট থেকে আসে ৫১ বলে ১১ রান।
এরপর আর বেশি সময় টিকতে পারেননি হাসানও। পরের ওভারেই জস হ্যাজলউডের বলে ক্যাচ দেন তিনি। ৩৬ বলে ১০ রান করে ফিরেছেন হাসান। দ্রুতই ড্রেসিংরুমের পথে ধরেছেন তাসকিনও। ৭ বলে ১ রান করে কামিন্সের শিকার হয়েছেন তিনি।
তাসকিন যখন ফেরেন তখন ৯ উইকেটে বাংলাদেশের রান ৩৯ রান। টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের সর্বনিম্ন রান ৪৩। সেই লজ্জার রেকর্ড ভাঙারও শঙ্কা জেগেছিল। তবে তাইজুল ইসলাম আর শরিফুল ইসলামের জুটিতে সেই লজ্জার রেকর্ড ছাড়ায় বাংলাদেশ। পার করে অর্ধশত রানের গণ্ডি।
বাংলাদেশের লজ্জার রেকর্ড ছাড়াতে কিছুটা আক্রমণাত্মক ব্যাটিং করেন শরিফুল। ইনিংসে সবচেয়ে বেশি তিনটি চার মারেন তিনি। শেষ পর্যন্ত স্টার্কের বলে উইকেটের পেছনে অ্যালেক্স ক্যারির হাতে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন তিনি। ১৯ বলে ১৪ রান করেন শরিফুল।
নিউজবাংলাদেশ.কম/এনডি








