আন্তর্জাতিক ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৪:১৪, ২০ আগস্ট ২০২৬

কলকাতায় হোটেল অগ্নিকাণ্ডে ইজারাদার আবু জাফর গ্রেফতার

কলকাতায় হোটেল অগ্নিকাণ্ডে ইজারাদার আবু জাফর গ্রেফতার

ছবি: সংগৃহীত

কলকাতার নিউমার্কেট এলাকার মির্জা গালিব স্ট্রিটের আবাসিক হোটেল শিখা ইন-এ ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ৯ জনের মৃত্যুর ঘটনায় হোটেলটির ইজারাদার আবু জাফরকে গ্রেফতার করেছে কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ। একই ঘটনায় আরও দুজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তবে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর থেকে হোটেলটির মূল মালিক বীরেশ্বর মিত্রের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। 

বুধবার (২০ আগস্ট) গভীর রাতে এন্টালি মেইন মার্কেট এলাকা থেকে আবু জাফরকে আটক করার পর দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাকে গ্রেফতার করা হয়। 

পুলিশ বলছে, হোটেলটির লিজ, পরিচালনা, নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং অগ্নিকাণ্ডের সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের ভূমিকা সবকিছুই এখন বিশেষ তদন্ত দলের (সিট) তদন্তের আওতায় রয়েছে।

গত মঙ্গলবার দিবাগত রাত থেকে বুধবার ভোরের মধ্যে নিউমার্কেট এলাকার ঘনবসতিপূর্ণ মির্জা গালিব স্ট্রিটের ওই পাঁচতলা ভবনে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। ভবনটির একাধিক তলায় কয়েকটি আবাসিক হোটেল ও অতিথিনিবাস পরিচালিত হচ্ছিল। আগুনের খবর পেয়ে কলকাতা পুলিশ, দমকল বাহিনী ও অন্যান্য জরুরি সেবার সদস্যরা উদ্ধার অভিযান শুরু করেন। দীর্ঘ অভিযানে কয়েক ডজন মানুষকে ভবন থেকে বের করে আনা হলেও নয়জনকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। পরে হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকেরা তাদের মৃত ঘোষণা করেন। নিহতদের মধ্যে একটি শিশুও ছিল। ঘটনায় অন্তত ছয়জন আহত হওয়ার তথ্যও জানিয়েছে পুলিশ। প্রাথমিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে নিহত বাংলাদেশির সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন তথ্য এলেও কলকাতা পুলিশ ও বাংলাদেশ সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, নিহতদের মধ্যে বাংলাদেশি নাগরিক ছিলেন। নিহতদের পরিচয় যাচাই ও হালনাগাদ তথ্য প্রকাশের কাজও চলছিল।

নিহতদের মধ্যে কুষ্টিয়ার একই পরিবারের চার সদস্যের থাকার তথ্য নিশ্চিত হয়েছে বিভিন্ন প্রতিবেদনে। তারা হলেন সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত, তার স্ত্রী আফসানা শারমীন, তাদের শিশু সন্তান এবং পরিবারের আরেক সদস্য আকরাম আলী। পরিবারটি চিকিৎসার কাজে ভারতে গিয়েছিল বলে জানা গেছে। এছাড়া ঢাকার সাভারের আহমেদ বাবু ও অন্য কয়েকজন বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুর খবরও প্রকাশিত হয়েছে। নিউমার্কেট ও আশপাশের এলাকা দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশি চিকিৎসাপ্রার্থী ও পর্যটকদের অন্যতম প্রধান আবাসনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। ফলে এই অগ্নিকাণ্ডে বাংলাদেশি নাগরিকদের প্রাণহানি দুই দেশের মধ্যেই গভীর উদ্বেগ ও শোকের সৃষ্টি করেছে।

তদন্তের প্রাথমিক পর্যায়েই সামনে এসেছে হোটেলটির অবকাঠামো ও অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন। প্রায় ১ হাজার ১০০ বর্গফুট জায়গাজুড়ে পরিচালিত শিখা ইন-এ ছোট ছোট কক্ষ তৈরি করা হয়েছিল বলে অভিযোগ। পাঁচতলা ভবনটির বিভিন্ন অংশে একাধিক হোটেল ও অতিথিনিবাস পরিচালিত হওয়ায় সংকীর্ণ করিডর, সীমিত বের হওয়ার পথ এবং ঘনবসতিপূর্ণ পরিবেশ উদ্ধারকাজকে আরও জটিল করে তোলে। প্রাথমিক তদন্তে হোটেলটির অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থার পর্যাপ্ততা, জরুরি নির্গমনপথ, অ্যালার্ম ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট অনুমোদনের বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে আগুনের সুনির্দিষ্ট উৎস বা কারণ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত করা হয়নি।

আরও পড়ুন: কলকাতার আগুনের ভয়াবহতা জানালেন ৩ বাংলাদেশি

অগ্নিকাণ্ডের পর কলকাতা পুলিশ একটি বিশেষ তদন্তকারী দল গঠন করে। তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন হোটেলটি বৈধভাবে পরিচালিত হচ্ছিল কি না, লিজ নেওয়ার পর আবু জাফরের দায়িত্ব কী ছিল, অগ্নিনিরাপত্তা সনদ ও অন্যান্য অনুমোদন ছিল কি না এবং থাকলেও সেগুলোর শর্ত মানা হয়েছিল কি না। একই সঙ্গে ভবনের অন্যান্য হোটেল ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পরিচালনাগত কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তাও তদন্তের আওতায় এসেছে। আটক দুজনের একজন পাশের একটি হোটেলের কর্মী বলে বিভিন্ন ভারতীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। তবে তাদের বিরুদ্ধে এখনো কী ধরনের অভিযোগ আনা হবে, সে বিষয়ে পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত জানায়নি।

ঘটনার পর মির্জা গালিব স্ট্রিটের আশপাশের একাধিক হোটেল ও রেস্তোরাঁর অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে অভিযান শুরু হয়েছে। নিরাপত্তাবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে এবং দ্রুত জবাব দিতে বলা হয়েছে। কলকাতা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও শহরের অন্যান্য আবাসিক হোটেলের বৈধ অনুমোদন ও অগ্নিনিরাপত্তা ছাড়পত্র যাচাইয়ের উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরাও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ভবনের ভেতরে ছোট ছোট কক্ষে বিপুলসংখ্যক অতিথি রাখার ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

এই অগ্নিকাণ্ড এখন শুধু একটি হোটেলে আগুন লাগার ঘটনায় সীমাবদ্ধ নেই; বরং কলকাতার ঘনবসতিপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকায় আবাসিক হোটেলগুলোর অনুমোদন, ভবনের ব্যবহার পরিবর্তন, অগ্নিনিরাপত্তা তদারকি এবং প্রশাসনিক নজরদারি নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে। দমকল ও প্রশাসনিক কাঠামোর কাছাকাছি এমন একটি এলাকায় বছরের পর বছর সম্ভাব্য অনিয়ম কীভাবে চলেছে, তা নিয়েও তদন্তের দাবি উঠেছে। বিশেষ করে ভবনটি আবাসিক ব্যবহারের জন্য অনুমোদিত ছিল কি না এবং পরে সেটিকে কীভাবে বাণিজ্যিক আবাসন ব্যবস্থায় ব্যবহার করা হয়েছে এসব বিষয়ও তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

অগ্নিকাণ্ডের সময় অধিকাংশ অতিথি ঘুমিয়ে ছিলেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ঘন ধোঁয়ায় দ্রুত শ্বাসকষ্ট শুরু হওয়ায় অনেকেই নিরাপদে বের হতে পারেননি। জীবিত উদ্ধার হওয়া কয়েকজনের বর্ণনায় ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন ভবনের ভেতরে আটকে পড়া এবং সাহায্যের জন্য অপেক্ষার ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা উঠে এসেছে। উদ্ধারকারীরা কয়েকজনকে ছাদ ও ভবনের বিভিন্ন অংশ থেকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেন।

এদিকে হোটেলটির ইজারাদার গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে তদন্ত এখন নতুন পর্যায়ে পৌঁছেছে। পুলিশের সামনে প্রধান প্রশ্ন আগুন কীভাবে শুরু হয়েছিল, আগুন ছড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রে কোনো অবহেলা বা নিরাপত্তা ত্রুটি ভূমিকা রেখেছিল কি না, অতিথিদের জন্য পর্যাপ্ত জরুরি নির্গমনব্যবস্থা ছিল কি না এবং হোটেল পরিচালনায় কার কী দায়িত্ব ছিল। পলাতক বা নিখোঁজ মালিক বীরেশ্বর মিত্রের সন্ধানও চালিয়ে যাচ্ছে তদন্তকারীরা। সিটের তদন্তে দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশি নাগরিকদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতির কারণে কলকাতার নিউমার্কেট-ফ্রি স্কুল স্ট্রিট-মির্জা গালিব স্ট্রিট এলাকা বাংলাদেশি চিকিৎসাপ্রার্থী ও পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত পরিচিত। এই দুর্ঘটনা সেই আবাসনব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। ভবিষ্যতে বাংলাদেশি নাগরিকসহ সব বিদেশি ও দেশীয় অতিথির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হোটেলগুলোর অগ্নিনিরাপত্তা, লাইসেন্স ও ভবন ব্যবহারের বৈধতা কঠোরভাবে তদারকির দাবি জোরালো হচ্ছে। কলকাতার শিখা ইন ট্র্যাজেডির প্রকৃত দায় কার, তা এখন নির্ভর করছে সিটের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এবং ফরেনসিক ও দমকল বিভাগের চূড়ান্ত প্রতিবেদনের ওপর।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়