কমেছে এলএনজি মজুত, কার্গো না আসায় বাড়ছে গ্যাস সংকট
ছবি: সংগৃহীত
কক্সবাজারের মহেশখালীতে অবস্থিত দেশের দুটি ভাসমান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার পথে থাকলেও এখনো পুরোপুরি কাটেনি সংকট। টার্মিনালগুলোর সম্মিলিত দৈনিক সরবরাহ সক্ষমতা ১১০ কোটি (১,১০০ মিলিয়ন) ঘনফুট হলেও, সাম্প্রতিক সময়ে নানা জটিলতা, কারিগরি ত্রুটি, এবং এলএনজি মজুত ফুরিয়ে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ নেমে এসেছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে। এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে দেশের উৎপাদনমুখী শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, সিএনজি ফিলিং স্টেশন এবং আবাসিক গ্রাহকদের ওপর।
মহেশখালীতে গ্যাস সরবরাহের দায়িত্বে থাকা দুটি ভাসমান সংরক্ষণ ও পুনর্গ্যাসীকরণ ইউনিট বা এফএসআরইউ (FSRU) হলো মার্কিন প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত টার্মিনাল এবং দেশীয় বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সামিট গ্রুপ পরিচালিত টার্মিনাল। এক্সিলারেট টার্মিনালের দৈনিক সক্ষমতা ৬০ কোটি এবং সামিট টার্মিনালের সক্ষমতা ৫০ কোটি ঘনফুট।
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, টার্মিনাল দুটি আংশিক ও পূর্ণ সক্ষমতায় চালুর চেষ্টা চললেও এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালে এলএনজির মজুত আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় সামগ্রিক সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে।
পেট্রোবাংলার দৈনিক উৎপাদন বিবরণী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় গ্রিডে এলএনজি থেকে সরবরাহ নেমে এসেছে ৬৬ কোটি ঘনফুটের কাছাকাছি, যা চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য। দেশে বর্তমানে গ্যাসের দৈনিক মোট চাহিদা প্রায় ৩৮ কোটি (৩,৮০০ মিলিয়ন) ঘনফুট, যার বিপরীতে সব মিলিয়ে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে ২২৫ থেকে ২২৮ কোটি ঘনফুট পর্যন্ত। ফলে প্রায় ১৫৪ কোটি ঘনফুটের একটি বিশাল ঘাটতি থেকে যাচ্ছে।
এলএনজি আমদানির ক্ষেত্রেও তৈরি হয়েছে বহুমুখী জটিলতা। দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকার সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে (প্রকিউরমেন্ট) বেশ কিছু কার্গো আমদানির উদ্যোগ নিলেও সময়মতো সেগুলোর অধিকাংশই এসে পৌঁছায়নি। আগস্ট মাসে বেশ কয়েকটি কার্গো আসার কথা থাকলেও কাগজপত্রে জটিলতা এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার আশঙ্কায় কিছু কার্গো গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি।
আরও পড়ুন: দুই কার্গো এলএনজি আমদানির অনুমোদন
বিশেষ করে, সৌদি আরামকোর সঙ্গে স্বল্পমেয়াদি চুক্তির আওতায় আসা একটি এলএনজিবাহী কার্গো জাহাজ বঙ্গোপসাগরে পৌঁছালেও এক্সিলারেট এনার্জি তা গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায়।
টার্মিনাল কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ওই কার্গো থেকে টার্মিনালে গ্যাস স্থানান্তরের ক্ষেত্রে কারিগরি ও বীমাগত ঝুঁকি থাকায় জাহাজটি ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়। এছাড়া হংকংভিত্তিক ঝেনইউ শিপিং কোম্পানির মাধ্যমে সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে আমদানিকৃত একটি জাহাজ যুক্তরাজ্যের নিষেধাজ্ঞার তালিকায় থাকায় তা গ্রহণেও বিরত থাকে সরকার।
তবে সংকট মোকাবিলায় পেট্রোবাংলা জরুরি ভিত্তিতে নতুন দরপত্র আহ্বান করেছে, যেখানে ব্রিটিশ পেট্রোলিয়ামসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছে। আগামী ২০ ও ২৩ আগস্ট নতুন এলএনজি কার্গো দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে, যার পর পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতির আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
গ্যাসের এই তীব্র সংকটের কারণে দেশের বিদ্যুৎ খাত সবচেয়ে বেশি বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে প্রকাশ, গ্যাস ও অন্যান্য জ্বালানি সংকটের কারণে বহু বিদ্যুৎকেন্দ্র বা ইউনিট হয় সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে অথবা নামমাত্র উৎপাদনে চলছে। এর ফলে জাতীয় গ্রিডে চাহিদামতো বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে এবং বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিংয়ের মাত্রা বেড়ে গেছে।
অন্যদিকে, শিল্পাঞ্চলগুলোর অবস্থা এলাকাভেদে ভিন্নরূপ ধারণ করেছে। নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীর কিছু এলাকায় গ্যাসের চাপ কিছুটা সন্তোষজনক পর্যায়ে থাকলেও গাজীপুর, সাভারসহ বিভিন্ন এলাকার কারখানাসমূহ প্রয়োজনীয় গ্যাসের চাপ পাচ্ছে না। অনেক শিল্পকারখানাকে অর্ধেকের কম উৎপাদনে চালাতে হচ্ছে, যা দেশের রপ্তানি এবং সামগ্রিক উৎপাদনশীলতার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অর্থনীতিবিদ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মহেশখালীর টার্মিনালগুলোর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও বিকল্প উৎসের সন্ধান না করলে এ ধরনের জ্বালানি সংকট জাতীয় অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








