আন্তর্জাতিক ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৫:৪৯, ২১ আগস্ট ২০২৬

অগ্নিকাণ্ডের আতঙ্কে কলকাতা ছাড়ছেন বাংলাদেশিরা

অগ্নিকাণ্ডের আতঙ্কে কলকাতা ছাড়ছেন বাংলাদেশিরা

ছবি: সংগৃহীত

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতার নিউ মার্কেটসংলগ্ন মির্জা গালিব স্ট্রিটের শিখা ইন আবাসিক হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে সাত বাংলাদেশিসহ নয়জনের মৃত্যুর ঘটনায় বাংলাদেশি পর্যটকদের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। দুর্ঘটনার পর কলকাতায় অবস্থানরত অনেক বাংলাদেশি নির্ধারিত সফর সংক্ষিপ্ত করে দ্রুত দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আবার বাংলাদেশে থাকা অনেকে আপাতত কলকাতাসহ ভারতের বিভিন্ন গন্তব্যে ভ্রমণের পরিকল্পনা স্থগিত বা পুনর্বিবেচনা করছেন। এই পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে নিউ মার্কেট, মারকুইস স্ট্রিট, সাডার স্ট্রিট ও ফ্রি স্কুল স্ট্রিটসংলগ্ন হোটেল, রেস্তোরাঁ, ট্রাভেল এজেন্সি ও খুচরা ব্যবসায়।

গত ১৮ আগস্ট দিবাগত রাতে, ১৯ আগস্ট ভোররাতের দিকে মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি পাঁচতলা ভবনে থাকা শিখা ইন-এ আগুনের সূত্রপাত হয়। প্রাথমিকভাবে আগুন লাগার সময় নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে সামান্য ভিন্নতা থাকলেও ঘটনাটি রাত প্রায় দেড়টা থেকে দুইটার মধ্যে ঘটে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার পাশাপাশি ভবনের ভেতরে ঘন ধোঁয়া জমে যাওয়ায় বহু মানুষ বের হতে পারেননি। অগ্নিদগ্ধ হওয়ার পাশাপাশি ধোঁয়ায় শ্বাসরুদ্ধ হয়েও হতাহতের ঘটনা ঘটে। ঘটনায় ছয়জন আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন।

ঘটনার প্রথম দিকে নিহতদের পরিচয় নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হলেও পরে বাংলাদেশ উপহাইকমিশন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী নিহত নয়জনের মধ্যে সাতজন বাংলাদেশি এবং দুজন ভারতীয় নাগরিক। নিহত বাংলাদেশিদের মধ্যে একই পরিবারের একাধিক সদস্যও রয়েছেন। ভারতীয় দুই নাগরিকের একজন হোটেলের কর্মী ছিলেন। ঘটনার পর কলকাতায় বাংলাদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে, বিশেষ করে নিউ মার্কেটকেন্দ্রিক সেই সব হোটেল ও বোর্ডিং হাউস নিয়ে, যেখানে চিকিৎসা, ব্যবসা ও পর্যটনের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ থেকে আসা বিপুলসংখ্যক মানুষ অবস্থান করেন। অগ্নিকাণ্ডের পর আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে কলকাতায় অবস্থানরত বাংলাদেশিদের মধ্যেও। 

স্থানীয় হোটেল ব্যবসায়ী ও ট্রাভেল এজেন্সির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দুর্ঘটনার পর অনেক বাংলাদেশি পর্যটক ও ব্যবসায়ী সফরের সময়সীমা কমিয়ে জরুরি ভিত্তিতে ফিরতি টিকিটের খোঁজ করছেন। নিউ মার্কেট, মারকুইস স্ট্রিট, সাডার স্ট্রিট ও আশপাশের এলাকায় বাংলাদেশি অতিথিদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা এখন প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে পরিবারের সদস্যদের চাপ, ভবনের অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এবং প্রশাসনিক অভিযানের আশঙ্কা সব মিলিয়ে অনেকেই দ্রুত কলকাতা ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।

অগ্নিকাণ্ডের সময় ওই ভবনেই অবস্থান করছিলেন পাবনার বাসিন্দা মো. খুরশীদ আলম। পরে তিনি মারকুইস স্ট্রিটের অন্য একটি হোটেলে ওঠেন। 

তার ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশিদের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর স্ত্রী ও বাবা-মা বারবার ফোন করে দ্রুত দেশে ফিরে আসার তাগিদ দিচ্ছেন। ব্যবসায়িক প্রয়োজনে কলকাতায় আসায় জরুরি কাজ শেষ করেই দেশে ফেরার পরিকল্পনা করছেন তিনি। 

একই ধরনের পরিস্থিতির কথা জানিয়েছেন আরও কয়েকজন বাংলাদেশি ভ্রমণকারী। তাদের অনেকের বক্তব্য, কলকাতায় থাকার সময় তারা আগে কখনো হোটেলের অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে তেমনভাবে ভাবেননি; কিন্তু এই ঘটনার পর আশপাশের হোটেলগুলোর নিরাপত্তা নিয়েও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।

শুধু আগুনের ভয় নয়, ঘটনার পর শুরু হওয়া প্রশাসনিক তৎপরতাও অনেককে দ্রুত এলাকা ছাড়তে উদ্বুদ্ধ করছে। দুর্ঘটনার পর কলকাতা পুলিশ তদন্ত জোরদার করেছে এবং হোটেলটির সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হয়েছে। শিখা ইনের লিজধারী আবু জাফরকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আরও কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্তের আওতায় নেওয়া হয়েছে। তবে হোটেলটির মালিক বীরেশ্বর মিত্রকে এখনো পাওয়া যায়নি বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। তার খোঁজে তল্লাশি চলছে।

তদন্তে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে কীভাবে পর্যাপ্ত অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়া এত মানুষের থাকার জন্য হোটেলটি পরিচালিত হচ্ছিল। বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, শিখা ইনের প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ও পরিচালনসংক্রান্ত নথিপত্র নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতির অভিযোগ সামনে এসেছে। আগুনের সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হয়নি। প্রথম দিকে শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বা অন্য কোনো বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম থেকে আগুনের সূত্রপাতের সম্ভাবনার কথা আলোচনায় এলেও তদন্ত শেষ হওয়ার আগে এ বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়নি।

আরও পড়ুন: কলকাতার হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ গেল ৯ বাংলাদেশির

দুর্ঘটনার পর কলকাতা প্রশাসন নিউ মার্কেট ও মির্জা গালিব স্ট্রিট এলাকায় হোটেলগুলোর অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে ব্যাপক তৎপরতা শুরু করেছে। মির্জা গালিব স্ট্রিটের অন্তত ১৩টি হোটেল ও রেস্তোরাঁকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। অগ্নিনিরাপত্তা বিধি, লাইসেন্স, অনুমোদন ও জরুরি নির্গমনব্যবস্থা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে বৃহত্তর পরিসরে হোটেল, লজ ও গেস্টহাউসগুলোর নিরাপত্তা নিরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এ ঘটনায় কলকাতার নিউ মার্কেট এলাকার হোটেল ব্যবসার বাস্তব চিত্রও নতুন করে সামনে এসেছে। এলাকাটি দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশি পর্যটক, চিকিৎসাপ্রার্থী ও ব্যবসায়ীদের অন্যতম প্রধান গন্তব্য। বাংলাদেশ থেকে কলকাতায় আসা মানুষের বড় অংশ তুলনামূলক কম খরচের কারণে নিউ মার্কেট, মারকুইস স্ট্রিট, সাডার স্ট্রিট ও ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের হোটেলগুলোতে থাকেন। স্থানীয়দের কাছে বাংলাদেশি পর্যটকদের বিপুল উপস্থিতির কারণে এলাকাটি দীর্ঘদিন ধরে মিনি বাংলাদেশ নামেও পরিচিত।

স্থানীয় ব্যবসায়ী ও পর্যটনসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, করোনা মহামারির পর বাংলাদেশ-ভারত যাতায়াতের জটিলতা এবং বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাবে কলকাতার এই এলাকার ব্যবসা আগেই বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছিল। একসময় প্রতিদিন হাজার হাজার বাংলাদেশি পর্যটক ও চিকিৎসাপ্রার্থী এই এলাকায় এলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। গত কয়েক মাসে ভিসা প্রক্রিয়া তুলনামূলক সহজ হওয়া এবং যাতায়াত বাড়তে শুরু করায় হোটেল, রেস্তোরাঁ ও খুচরা ব্যবসায়ীদের মধ্যে আবারও আশাবাদ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু শিখা ইনের অগ্নিকাণ্ড সেই পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়াকে নতুন করে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছে।

বিশেষ করে বাংলাদেশি পর্যটকদের বড় অংশ চিকিৎসার উদ্দেশ্যে কলকাতায় যান। চিকিৎসার পাশাপাশি স্বজনরা আশপাশের সাশ্রয়ী হোটেলগুলোতে অবস্থান করেন। ফলে এ ধরনের আবাসিক হোটেলের নিরাপত্তা ঘাটতি শুধু পর্যটন খাতের নয়, চিকিৎসাসেবা নিতে যাওয়া বাংলাদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। 

স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের মতে, এই দুর্ঘটনার পর অনেক বাংলাদেশি পরিবার এখন হোটেল নির্বাচনের ক্ষেত্রে শুধু ভাড়া ও অবস্থানের সুবিধা নয়, অগ্নিনিরাপত্তা, জরুরি সিঁড়ি, বিকল্প বের হওয়ার পথ এবং বৈধ অনুমোদনের বিষয়গুলোও গুরুত্ব দিতে শুরু করবেন।

কলকাতার নিউ মার্কেট এলাকার হোটেলগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে সাম্প্রতিক একাধিক প্রতিবেদনে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। সরু রাস্তা, পুরোনো ভবন, ঘনবসতি, এক ভবনে একাধিক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এবং জরুরি অবস্থায় দ্রুত বের হওয়ার সীমিত ব্যবস্থা এসব বিষয় বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। মির্জা গালিব স্ট্রিটের ঘটনার পর এই বাস্তবতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

অন্যদিকে, বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও নিহতদের পরিবারকে সহায়তা এবং প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক যোগাযোগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভারতীয় পক্ষ সাত বাংলাদেশির মৃত্যুর ঘটনায় শোক প্রকাশের পাশাপাশি ক্ষতিপূরণ ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে।

সব মিলিয়ে, একটি আবাসিক হোটেলের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড এখন শুধু নয়জনের প্রাণহানির তদন্তে সীমাবদ্ধ নেই; এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে কলকাতার বাংলাদেশনির্ভর পর্যটন ও ব্যবসায়িক এলাকায়। একদিকে নিহতদের পরিবারের শোক, অন্যদিকে কলকাতায় অবস্থানরত বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং দেশে থাকা সম্ভাব্য পর্যটকদের ভ্রমণ পরিকল্পনা স্থগিতের প্রবণতা সব মিলিয়ে নিউ মার্কেটকেন্দ্রিক ব্যবসায় নতুন ধাক্কার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। প্রশাসনের চলমান অগ্নিনিরাপত্তা অভিযান কতটা কার্যকর হয় এবং বাংলাদেশি পর্যটকদের মধ্যে আস্থা কত দ্রুত ফিরিয়ে আনা যায়, তার ওপরই অনেকাংশে নির্ভর করবে এই এলাকার পর্যটন ও ব্যবসা খাতের পরবর্তী পরিস্থিতি।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়