আন্তর্জাতিক ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ০৯:৩১, ২৭ আগস্ট ২০২৬

ভূমিকম্প নয়, হিমবাহ ধসেই নেপালে ভয়াবহ বন্যা: ইউএসজিএস

ভূমিকম্প নয়, হিমবাহ ধসেই নেপালে ভয়াবহ বন্যা: ইউএসজিএস

ছবি: সংগৃহীত

নেপাল-চীন সীমান্তবর্তী হিমালয় অঞ্চলে বিশাল হিমবাহ ও পাথরের ধস থেকে সৃষ্ট ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় নেপাল ও তিব্বতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ১৬২ জনে দাঁড়িয়েছে। নেপালে এখন পর্যন্ত ১৫৯ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে, আর চীনের তিব্বত অংশে অন্তত তিনজন নিহত হয়েছেন। একই সঙ্গে কয়েক শ মানুষ এখনও নিখোঁজ থাকায় হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। 

বুধবার (২৬ আগস্ট) সকালে সংঘটিত এই দুর্যোগের সময় যে শক্তিশালী ভূকম্পন অনুভূত হয়েছিল, সেটি কোনো ভূমিকম্প ছিল না বলেও স্পষ্ট করেছে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস। 

সংস্থাটির চূড়ান্ত বিশ্লেষণ বলছে, বিশাল হিমবাহ ধস এবং বরফ, পাথর ও ধ্বংসাবশেষের প্রবাহ থেকেই ওই ভূকম্পন তৈরি হয়েছিল; যার শক্তি ৫ দশমিক ২ মাত্রার ভূমিকম্পের সমতুল্য ছিল।

বুধবার স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ৮টার কিছু পর নেপালের রাসুয়া জেলার তিব্বত সীমান্তবর্তী এলাকায় প্রথমে অস্বাভাবিক কম্পন অনুভূত হয়। ইউএসজিএস প্রাথমিকভাবে ঘটনাটিকে কাঠমান্ডুর উত্তরে নেপাল-চীন সীমান্ত এলাকায় ৪ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্প হিসেবে নথিভুক্ত করেছিল। পরে দীর্ঘ-তরঙ্গের ভূকম্পন তথ্য পুনর্বিশ্লেষণ করে সংস্থাটি জানায়, প্রকৃতপক্ষে সেখানে কোনো টেকটোনিক ভূমিকম্প হয়নি। বরং একটি বড় হিমবাহ ধস এবং তার সঙ্গে নেমে আসা বিপুল ধ্বংসাবশেষের স্রোতই ভূকম্পন তৈরি করে। 

ইউএসজিএসের ভাষ্য অনুযায়ী, এই ধসের ফলে উৎপন্ন কম্পনের শক্তি প্রায় ৫ দশমিক ২ মাত্রার ভূমিকম্পের সমতুল্য ছিল এবং পরে সেটিই ভাটির দিকে ভয়াবহ বিপর্যয়ের সূচনা করে।

প্রাথমিক স্যাটেলাইট বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নেপাল-চীন সীমান্তের রাসুওয়াগাড়ি সীমান্ত ক্রসিং থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে লেন্দে খোলা নদীর উজানে বরফ ও পাথরের বিশাল অংশ ধসে পড়ে। ঘটনাস্থলটি প্রায় ৫ হাজার ২০০ মিটার উচ্চতার একটি হিমবাহ অঞ্চল বলে বিভিন্ন প্রাথমিক বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। পাহাড়ের উঁচু অংশ থেকে বিপুল পরিমাণ বরফ ও পাথর প্রায় ১ হাজার ২০০ মিটার নিচের উপত্যকার দিকে ধেয়ে আসে। সেই ধস নদীর গতিপথে বিপুল পরিমাণ পানি, পলি, কাদা ও পাথর ঠেলে দেয় এবং কয়েক মুহূর্তের মধ্যে তা প্রাণঘাতী ধ্বংসাবশেষপূর্ণ ঢলে রূপ নেয়।

লেন্দে খোলা ভোতে কোশী নদীর একটি উপনদী। উজানের পাহাড়ি অঞ্চল থেকে নেমে আসা বরফ, পানি ও পাথরের এই বিশাল স্রোত দ্রুত ভোতে কোশী নদী হয়ে ভাটির দিকে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর ত্রিশূলী নদী ব্যবস্থার বিভিন্ন অংশেও পানির উচ্চতা অস্বাভাবিক দ্রুততায় বাড়তে শুরু করে। গালছিতে মাত্র ৩০ মিনিটের মধ্যে নদীর পানি প্রায় ৯ মিটার পর্যন্ত বেড়ে যায় বলে প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে। মালেখুতেও একই সময়ের মধ্যে পানির উচ্চতা প্রায় ৭ মিটার বেড়ে যায়। 

বিজ্ঞানীদের মতে, এত অল্প সময়ে পানির এমন অস্বাভাবিক বৃদ্ধি প্রমাণ করে যে উজান থেকে সাধারণ বৃষ্টিজনিত বন্যা নয়, বরং বিপুল পরিমাণ পানি ও ধ্বংসাবশেষ একসঙ্গে হঠাৎ নেমে এসেছিল।

দুর্যোগটি সবচেয়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করে রাসুয়া জেলার সীমান্তবর্তী টিমুরে এলাকায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায়, কোনো বৃষ্টির পূর্বাভাস বা তাৎক্ষণিক সতর্কতা ছাড়াই উজান থেকে কাদা, পাথর ও পানির বিশাল দেয়াল নেমে আসে। রাসুওয়াগাড়ি সীমান্ত বাণিজ্যকেন্দ্র, টিমুরে, সিয়াফ্রুবেসি এবং ভোতে কোশীর তীরবর্তী আরও কয়েকটি জনবসতি মুহূর্তের মধ্যে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। সীমান্ত চৌকিতে অপেক্ষমাণ শত শত যানবাহন ও ট্রাক ভেসে যায়। বহু ঘরবাড়ি, সেতু, সড়ক, জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, বিদ্যুৎ অবকাঠামো ও যোগাযোগব্যবস্থা ধ্বংস হয়েছে। 

নেপালের বিভিন্ন সরকারি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, কয়েকটি জেলায় বিস্তৃত এই দুর্যোগ সাম্প্রতিক দশকগুলোর অন্যতম ভয়াবহ বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে।

আরও পড়ুন: নেপাল-তিব্বত সীমান্তে প্রলয়ঙ্করী বন্যায় নিহত ১৫৭, নিখোঁজ ৪০৩

বৃহস্পতিবারের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, নেপালে উদ্ধারকারীরা শতাধিক মরদেহ উদ্ধার করেছেন এবং তিব্বতের জিরং এলাকাতেও প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। নেপাল ও চীনের দুই পাশ মিলিয়ে মৃতের সংখ্যা অন্তত ১৬২ জনে পৌঁছেছে। তবে কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষের নিচে আরও মানুষ চাপা পড়ে থাকতে পারেন এবং কয়েক শ মানুষ এখনও নিখোঁজ থাকায় প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির চিত্র পরিষ্কার হতে আরও সময় লাগবে। উদ্ধারকাজে দুর্গম পাহাড়ি ভূখণ্ড, ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দুর্যোগে বিপুলসংখ্যক পর্যটকও নিখোঁজ হয়েছেন। বুধবারের শেষ দিকের হিসাবে নেপালের পর্যটন কর্তৃপক্ষ কয়েক শ পর্যটকের সঙ্গে যোগাযোগ হারানোর কথা জানায়, যাদের বড় অংশ বিদেশি নাগরিক। নিখোঁজদের মধ্যে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, কানাডাসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিক রয়েছেন। এদের অনেকেই তিব্বতের কৈলাস মানসসরোবর অঞ্চল এবং হিমালয়ের বিভিন্ন ট্রেকিং রুটে যাওয়ার পথে সীমান্তবর্তী এলাকায় অবস্থান করছিলেন। হতাহত ও নিখোঁজের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সংস্থার তথ্য সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হচ্ছে, কারণ অনেক এলাকায় যোগাযোগ এখনো বিচ্ছিন্ন এবং নিখোঁজ ব্যক্তিদের তালিকা যাচাইয়ের কাজ চলছে।

নেপালের উদ্ধার অভিযান এখন সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলছে। সেনাবাহিনী, পুলিশ ও অন্যান্য উদ্ধারকারী সংস্থা হেলিকপ্টার ব্যবহার করে দুর্গম এলাকা থেকে জীবিতদের সরিয়ে আনছে। নুওয়াকোট, ধাদিং ও রাসুয়াসহ ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলের বহু মানুষ এখনও নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে বিভিন্ন উদ্ধারকেন্দ্র ও সেনা স্থাপনার সামনে অপেক্ষা করছেন। বিদ্যুৎ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় কিছু এলাকায় অন্ধকারের মধ্যেই উদ্ধার ও তথ্য সংগ্রহের কাজ চালাতে হচ্ছে। বহু এলাকায় সড়ক ও সেতু ধ্বংস হওয়ায় স্থলপথে উদ্ধারকারী দল পাঠানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

চীনের তিব্বত অংশেও পরিস্থিতি ভয়াবহ। জিরং এলাকায় ভূমিধস ও আকস্মিক বন্যায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। সেখানে অন্তত তিনজন নিহত এবং দুই শতাধিক মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। চীনা উদ্ধারকারী দল সীমান্তবর্তী ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছে। নিরাপত্তা ক্যামেরায় ধারণ করা বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা গেছে, পাথর, কাদা ও পানির প্রবল স্রোত নেমে আসার কয়েক সেকেন্ড আগে মানুষ ও যানবাহন দ্রুত এলাকা ছেড়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। এরপরই ধ্বংসাবশেষপূর্ণ স্রোত ভবন ও যানবাহন গ্রাস করে।

তবে প্রথম দফার বিপর্যয় কাটার আগেই নতুন করে দ্বিতীয় দফা বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। হিমালয় অঞ্চলের পরিবেশ ও জলবায়ু নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংস্থা আইসিআইএমওডির বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন, উজানের কোনো কোনো অংশে ভূমিধসের ধ্বংসাবশেষ নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করে অস্থায়ী প্রাকৃতিক বাঁধ তৈরি করে থাকতে পারে। এমন বাঁধের পেছনে বিপুল পানি জমে থাকলে তা হঠাৎ ভেঙে গিয়ে নতুন করে আরও শক্তিশালী ঢল সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে ভোতে কোশী ও ত্রিশূলী নদী অববাহিকার তীরবর্তী ঝুঁকিপূর্ণ জনবসতিগুলোকে সতর্ক রাখা হয়েছে এবং কিছু এলাকায় সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

বিজ্ঞানীদের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখনো রয়ে গেছে হিমবাহ ধসের তাৎক্ষণিক কারণ কী। প্রথম দিকে ভূমিকম্পকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দেখা হলেও ইউএসজিএসের সংশোধিত বিশ্লেষণে সেই ধারণা বাতিল হয়েছে। এখন স্যাটেলাইট চিত্র, নদীর প্রবাহের তথ্য, ভূকম্পন রেকর্ড এবং পাহাড়ি ঢালের স্থিতিশীলতা বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা বোঝার চেষ্টা করছেন, কীভাবে বরফ ও পাথরের এত বড় অংশ একসঙ্গে ধসে পড়ল। সাম্প্রতিক উচ্চ তাপমাত্রা ও দীর্ঘমেয়াদি হিমবাহ গলনের সঙ্গে এ ঘটনার কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। 

তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই নির্দিষ্ট দুর্যোগের জন্য জলবায়ু পরিবর্তনকে সরাসরি দায়ী করার মতো পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।

হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ, তুষারস্তর, পারমাফ্রস্ট ও পাহাড়ি ঢালের পরিবর্তন ক্রমেই নতুন ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, উঁচু পার্বত্য এলাকায় কোনো বরফ-পাথরের ধস কয়েক মিনিট বা কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শত শত কিলোমিটার ভাটির জনবসতির জন্য ভয়াবহ বন্যায় পরিণত হতে পারে। ফলে এ ধরনের আন্তসীমান্ত নদী ব্যবস্থায় স্যাটেলাইটভিত্তিক নজরদারি, ভূকম্পন পর্যবেক্ষণ, নদীর উজানে আগাম সতর্কীকরণ এবং নেপাল-চীন-ভারতসহ সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে দ্রুত তথ্য বিনিময়ের প্রয়োজনীয়তা আবারও সামনে এসেছে। একই নদী অববাহিকায় গত ১৪ মাসের মধ্যে দ্বিতীয়বার বড় ধরনের বন্যা হওয়ায় অঞ্চলটির দুর্যোগঝুঁকি নিয়েও নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

নেপালের নতুন প্রধানমন্ত্রী বলেন্দ্র শাহ সরকার ও রাষ্ট্রের সব ধরনের সম্পদ উদ্ধার ও ত্রাণকাজে ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন। আন্তর্জাতিক পর্যায়েও সহায়তার প্রস্তাব আসছে। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন সংস্থা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং কয়েকটি দেশ নেপালকে উদ্ধার ও মানবিক সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখনো নিখোঁজ মানুষের সন্ধান, বিচ্ছিন্ন এলাকাগুলোতে পৌঁছানো এবং উজানে আটকে থাকা পানি বা অস্থায়ী ভূমিধসের বাঁধ ভেঙে দ্বিতীয় দফা বন্যা নেমে আসার সম্ভাবনা মোকাবিলা করা।

বুধবারের এই বিপর্যয় তাই শুধু একটি আকস্মিক বন্যার ঘটনা নয়; এটি হিমালয়ের উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে হিমবাহ, বরফ, পাথর, নদী ও জনবসতির মধ্যে তৈরি হওয়া নতুন ধরনের দুর্যোগঝুঁকিরও ভয়াবহ উদাহরণ। যে কম্পনকে প্রথমে ভূমিকম্প মনে করা হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত সেটিই ছিল একটি বিশাল প্রাকৃতিক ধসের পূর্বসংকেত। আর সেই ধসের কয়েক মিনিটের মধ্যেই পাহাড় থেকে নেমে আসা পানি, কাদা ও পাথরের স্রোত নেপাল ও তিব্বতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলকে মৃত্যু ও ধ্বংসের উপত্যকায় পরিণত করে। এখন উদ্ধার অভিযান চললেও উজানের পরিস্থিতি পুরোপুরি স্থিতিশীল না হওয়ায় ভোতে কোশী ও ত্রিশূলী নদী অববাহিকার মানুষের জন্য বিপদ এখনো পুরোপুরি কাটেনি।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়