কারিগরি শিক্ষার প্রসারে ৩ দিনের সফরে চীন গেলেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা
ছবি: সংগৃহীত
চীন সরকারের আমন্ত্রণে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাবিষয়ক আন্তর্জাতিক বিভিন্ন আয়োজন, আলোচনা ও কর্মসূচিতে অংশ নিতে তিন দিনের সরকারি সফরে চীন গেছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন।
মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) রাতে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে চীনের উদ্দেশে যাত্রা করেন তিনি।
রাত সাড়ে ১১টার দিকে চায়না সাউদার্নের একটি ফ্লাইটে ঢাকা ছাড়ার সময় বিমানবন্দরে তাকে আনুষ্ঠানিক বিদায় ও শুভেচ্ছা জানান বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন। এ সময় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব মোহাম্মদ দাউদ মিয়া এবং চীনা দূতাবাসের কালচারাল কাউন্সেলর লি শাওপেং ও কালচারাল সেকশনের থার্ড সেক্রেটারি শিয়া দাওজিং উপস্থিত ছিলেন।
মাহদী আমিনের এই সফর এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও দক্ষতাভিত্তিক ও কর্মমুখী করার বিষয়ে সরকার একাধিক পরিকল্পনা সামনে এনেছে এবং চীনের সঙ্গে শিক্ষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণ খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও ধারাবাহিক আলোচনা চলছে। গত ২৪ আগস্ট শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের সঙ্গে ঢাকায় চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনের নেতৃত্বাধীন একটি প্রতিনিধিদলের বৈঠকেও শিক্ষা ও কারিগরি খাতের মানোন্নয়ন এবং দুই দেশের সহযোগিতা আরও বিস্তৃত করার বিষয়টি গুরুত্ব পায়। এর পরদিনই শিক্ষামন্ত্রী চীনের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়েন। তার সফরসঙ্গী হিসেবে মাহদী আমিন ও কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব মো. দাউদ মিয়ার থাকার তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে।
চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের শিক্ষা সহযোগিতার পরিধি কেবল শিক্ষার্থী বিনিময় বা উচ্চশিক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে শিল্পের প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, কারিকুলাম উন্নয়ন এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির মতো বিষয়ও আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। এর আগে চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনের সঙ্গে মাহদী আমিনের বৈঠকেও বাংলাদেশের শিক্ষা খাতের আধুনিকায়ন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কারিকুলাম উন্নয়ন, শিক্ষক দক্ষতা বৃদ্ধি এবং কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রসারে চীনের সহযোগিতার আগ্রহের কথা উঠে আসে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি বাংলাদেশে তৃতীয় ভাষা হিসেবে চীনা ভাষা অন্তর্ভুক্তির সম্ভাবনাও তখন আলোচিত হয়েছিল।
সরকারের সাম্প্রতিক শিক্ষা সংস্কারের পরিকল্পনায় কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে মূলধারায় নিয়ে আসার বিষয়টিও বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
গত জুনে মাহদী আমিন জানিয়েছিলেন, শিক্ষাব্যবস্থাকে যুগোপযোগী, দক্ষতাভিত্তিক ও কর্মমুখী করতে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা সব শিক্ষার্থীর জন্য বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা রয়েছে। নতুন পাঠ্যক্রমে ক্রীড়া শিক্ষা, সংস্কৃতি শিক্ষা, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা এবং লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস যুক্ত করার পরিকল্পনার কথাও তিনি জানিয়েছিলেন। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা, উদ্ভাবনী সক্ষমতা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, নেতৃত্ব এবং বাস্তব জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়ার কথা বলেন তিনি।
আরও পড়ুন: ঢাকায় ভুটানের রাজা, রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ
কারিগরি শিক্ষাকে শুধু নির্দিষ্ট একটি শিক্ষাধারা হিসেবে নয়, বরং জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যও সরকারের পরিকল্পনায় রয়েছে। মাহদী আমিনের বক্তব্য অনুযায়ী, শিক্ষার্থীদের সনদনির্ভর শিক্ষার বাইরে এনে কর্মদক্ষতা অর্জনের সুযোগ তৈরি, জাতীয় পর্যায়ে স্কিলস কম্পিটিশন ও ক্যারিয়ার ফেয়ার আয়োজন, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংযোগ বাড়ানো এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকেই চাকরি ও উদ্যোক্তা হওয়ার পথ তৈরি করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কেও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে কর্মমুখী ও কারিগরি শিক্ষা সম্প্রসারণ, ক্যারিয়ার সেন্টার ও জব প্লেসমেন্ট, ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া সহযোগিতা এবং শিক্ষানবিশ ও ইন্টার্নশিপের সুযোগ বাড়ানোর পরিকল্পনার কথা তিনি জানিয়েছেন।
কারিগরি শিক্ষার প্রতি সামাজিক অনীহা দূর করার বিষয়টিও সরকারের পরিকল্পনায় রয়েছে। সম্প্রতি মাহদী আমিন বলেছেন, দেশের প্রতিটি শিক্ষার্থীকে কিছু না কিছু কারিগরি শিক্ষা দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করা হচ্ছে এবং এ ক্ষেত্রে বিদ্যালয় পর্যায়ে ল্যাব স্থাপন ও শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। তার বক্তব্যে কারিগরি শিক্ষাকে শুধু অপেক্ষাকৃত দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য বিকল্প ধারা হিসেবে না দেখে সব শিক্ষার্থীর মৌলিক দক্ষতার অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি উঠে এসেছে।
দেশের কারিগরি শিক্ষাকে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রেও সম্প্রতি কিছু উদ্যোগ সামনে এসেছে। চীন সফরে যাওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগে মঙ্গলবার সচিবালয়ে এক পর্যালোচনা সভায় মাহদী আমিন জানিয়েছিলেন, জাপানি ভাষা শিক্ষার মাধ্যমে দেশের ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের জন্য জাপানে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। সিভিল, ইলেকট্রিক্যাল ও আর্কিটেকচার বিষয়ে ডিপ্লোমা সম্পন্নকারীদের কর্মসংস্থান ভিসায় জাপানে পাঠানোর উদ্যোগের আওতায় সংশ্লিষ্ট জাপানি প্রতিষ্ঠান ভাষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণ থেকে শুরু করে জাপানে পৌঁছানো পর্যন্ত ব্যয় বহন করবে। প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থীদের ভাষা প্রশিক্ষণ প্রায় শেষ এবং তারা অক্টোবর ২০২৬-এর মধ্যে জাপানে কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে; দ্বিতীয় ব্যাচের নির্বাচিতদের ২০২৭ সালের জানুয়ারির মধ্যে জাপানে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। একই উদ্যোগের অংশ হিসেবে ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ল্যাব উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণ সরঞ্জাম সরবরাহের কথাও জানানো হয়েছে।
বাংলাদেশ-চীন শিক্ষা সহযোগিতার সাম্প্রতিক ধারাবাহিকতায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও শিক্ষাপ্রযুক্তি। চলতি বছরের মে মাসে শিক্ষা খাতের একটি অনুষ্ঠানে জানানো হয়েছিল, চীনের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে সাধারণ ও কারিগরি শিক্ষকদের বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। একই সময়ে দুই দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একাধিক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর এবং শিক্ষা ও প্রযুক্তিবিষয়ক প্রদর্শনীর আয়োজনের কথাও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। এসব উদ্যোগের মধ্য দিয়ে শিক্ষা খাতে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরও কার্যকর ও দক্ষতা উন্নয়নমুখী করার প্রচেষ্টা স্পষ্ট হয়েছে।
এবারের চীন সফরে মাহদী আমিনের অংশগ্রহণ তাই শুধু একটি আনুষ্ঠানিক আন্তর্জাতিক সফর হিসেবে নয়, বাংলাদেশের চলমান দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা সংস্কারের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্ব হিসেবেও দেখা হচ্ছে। সফরে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার আধুনিকায়ন, আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন, শিক্ষা ও শিল্প খাতের সংযোগ এবং ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের উপযোগী শিক্ষা কাঠামো নিয়ে অভিজ্ঞতা ও সহযোগিতার সুযোগ তৈরির বিষয়গুলো গুরুত্ব পেতে পারে। তবে সফরসূচির নির্দিষ্ট বৈঠক, চুক্তি বা সমঝোতার বিষয়ে এখন পর্যন্ত প্রকাশ্য সূত্রে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি; ফলে এ বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য প্রকাশের জন্য সংশ্লিষ্ট সরকারি ঘোষণা বা সফর-পরবর্তী বিবরণের অপেক্ষা করা প্রয়োজন।
তিন দিনের সফর শেষে মাহদী আমিনের দেশে ফেরার কথা রয়েছে। তার সঙ্গে শিক্ষা খাতের সংশ্লিষ্ট উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ এবং একই সময়ে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের চীন সফর বাংলাদেশের শিক্ষা ও কারিগরি খাতে চীনের সঙ্গে চলমান যোগাযোগকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। চীনের শিক্ষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণ অবকাঠামো, দক্ষতা উন্নয়ন ব্যবস্থা এবং শিল্পভিত্তিক প্রশিক্ষণ মডেল থেকে বাংলাদেশের জন্য কার্যকর অভিজ্ঞতা নেওয়া গেলে তা দেশে কর্মমুখী শিক্ষার বিস্তার এবং আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








