‘অব্যবস্থাপনা-গাফিলতি বিন্দুমাত্র বরদাশত করা হবে না’
ছবি: সংগৃহীত
ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের বিশৃঙ্খলা, যাত্রী ভোগান্তি, অনিয়ম ও সেবার নিম্নমান দূর করতে বাস কোম্পানিগুলোকে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনার সুযোগ দিতে চান সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোনো কোম্পানি সেবার মান, বাসের অবস্থা, যাত্রীসেবা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট রুটে নতুন কোম্পানি গঠন করা হবে। তাতেও প্রত্যাশিত ফল না এলে প্রয়োজনে রুট বাতিল করে সরকারি ব্যবস্থাপনায় বাস পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে বলে জানিয়েছেন তিনি।
সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর তেজগাঁও সড়ক ভবনের অডিটরিয়ামে বাস রুট রেশনালাইজেশন কার্যক্রমের আওতায় বাসমালিকদের সঙ্গে আয়োজিত আলোচনা সভায় মন্ত্রী এসব কথা বলেন।
সভায় বাস রুট পুনর্বিন্যাস, কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিচালনা, বাসের মানোন্নয়ন, যাত্রীসেবা, চালকদের দক্ষতা ও লাইসেন্স, বাসস্টপেজ ব্যবস্থাপনা, চার্জিং অটোরিকশার চলাচল নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবহন খাতের ব্যয় কাঠামোসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়।
বাসমালিকদের উদ্দেশে মন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন, যাত্রীসেবা ও বাসের মান নিশ্চিত করার দায় ব্যক্তিগত বাসমালিকের চেয়ে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির ওপরই বর্তাবে। কোনো মালিক বাসের যথাযথ সংস্কার না করলে, চালক নিয়ম না মানলে কিংবা কর্মচারীরা শৃঙ্খলা ভঙ্গ করলে কোম্পানিকেই তার দায় নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে মালিকের বাস কোম্পানিতে রাখার বিষয়েও কোম্পানিকে দায়িত্বশীল হতে হবে।
শেখ রবিউল আলম বলেন, আমি কোনো বাসমালিক চিনব না, কোম্পানি চিনব।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, একটি কোম্পানির অধীনে চলা বাসের মান, যাত্রীদের সুবিধা, চালক ও কর্মচারীদের আচরণ এবং সামগ্রিক পরিচালনব্যবস্থার দায়ও সেই কোম্পানিকেই নিতে হবে। কোনো মালিকের বাস নির্ধারিত মান বজায় না রাখলে তা কোম্পানির বহরে রাখার প্রয়োজন নেই বলেও তিনি জানান।
বাসমালিকদের পক্ষ থেকে প্রায়ই লোকসানের যে যুক্তি দেখানো হয়, তার জবাবে মন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় বলেন যে, আগে যাত্রীদের জন্য নিরাপদ, আরামদায়ক ও মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করতে হবে; এরপর ভাড়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। যাত্রীদের ওপর অযৌক্তিক চাপ তৈরি করে বা সেবার মান না বাড়িয়ে শুধু ভাড়া বৃদ্ধির দাবি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। উদ্যোক্তাদের টিকিয়ে রাখতে এবং তাদের যুক্তিসংগত লাভের বিষয়টি সরকার মাথায় রাখলেও, তা হতে হবে সেবার মানোন্নয়নের সাথে সামঞ্জস্য রেখে।
আরও পড়ুন: আইন নয়, নৌখাতের সাফল্য নির্ভর করে বাস্তব প্রয়োগে
উল্লেখ্য, ইতিপূর্বে সরকার জ্বালানি ও ব্যবস্থাপনা ব্যয় বিশ্লেষণ করে বাস ভাড়া কিলোমিটারে ১৭ পয়সা নির্ধারণ করেছিল এবং অতিরিক্ত ভাড়া আদায় রোধে রুট পারমিট বাতিলের কঠোর হুশিয়ারিও দেওয়া হয়েছিল।
রাজধানীর প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে চার্জিং অটোরিকশার অবাধ চলাচল নিয়ন্ত্রণে একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়নের কাজ চলছে বলে জানান সড়ক পরিবহনমন্ত্রী। এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট এলাকা ও নিয়মের বেড়াজালে এসব ছোট যানবাহনের চলাচল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে।
পাশাপাশি, পরিবহন খাতে দক্ষ চালকের সংকট দূর করতে দ্রুত ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাস কোম্পানিগুলোকে উপযুক্ত, প্রশিক্ষিত এবং শারীরিক ও মানসিকভাবে সক্ষম চালকদের তালিকা তৈরি করে বিআরটিএতে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে দ্রুত পরীক্ষা নিয়ে তাদের বৈধ লাইসেন্স প্রদান করা যায়।
যাত্রীদের ওঠানামার সুবিধার্থে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে নির্দিষ্ট বাসস্টপেজ চিহ্নিত করার কাজ দ্রুত শুরু হবে। ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষকে (ডিটিসিএ) রুটভিত্তিক বাস কোম্পানিগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে বাসস্টপেজগুলো চিহ্নিত করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, যা পরবর্তীতে সিটি করপোরেশনের মাধ্যমে সম্পূর্ণ যাত্রীবান্ধব হিসেবে গড়ে তোলা হবে। এছাড়া রাজধানীর ওপর থেকে অতিরিক্ত যানজটের চাপ কমাতে ঢাকার মূল টার্মিনালগুলোকে ধীরে ধীরে শহরের বাইরে স্থানান্তর ও পুনর্বিন্যাসের দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনাও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
পরিবহন খাতের শৃঙ্খলা ফেরাতে মালিকদেরও সহযোগিতা করার আহ্বান জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, নতুন বা ভালো বাস বহরে যুক্ত করতে গিয়ে মালিকদের কাছ থেকে বিভিন্ন খাতের নামে অতিরিক্ত ফি বা অনৈতিক কালেকশন আদায় করা হয়ে থাকে। গাড়ি বুকিং ফি বা ট্রিপপ্রতি অতিরিক্ত চাঁদা তোলার এই সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে, যাতে মালিকরা কম খরচে সুন্দরভাবে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারেন।
সবশেষে মন্ত্রী বলেন, এক দিনে বা এক মাসে রাতারাতি সম্পূর্ণ পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়, তবে সরকার এই সংস্কারমূলক উদ্যোগ থেকে কোনোভাবেই পিছপা হবে না। মালিকদের পেশাগতভাবে বিকশিত হওয়ার পর্যাপ্ত সুযোগ দেওয়া হলেও কোনো ধরনের অনির্দিষ্ট অব্যবস্থাপনা, গাফিলতি বা অসহযোগিতা বিন্দুমাত্র বরদাশত করা হবে না।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি









