নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ২০:০৭, ৮ জুন ২০২৬

রোহিঙ্গা ভোটার রুখতে ইসির নতুন প্রযুক্তিগত কৌশল

রোহিঙ্গা ভোটার রুখতে ইসির নতুন প্রযুক্তিগত কৌশল

ফাইল ছবি

জাতীয় ভোটার তালিকার শুদ্ধতা রক্ষা এবং মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের অবৈধভাবে এনআইডি বা ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তি ঠেকাতে নতুন কৌশল হাতে নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। একাধিকবার চেষ্টা করেও জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনারের (ইউএনএইচসিআর) কাছে থাকা রোহিঙ্গা ডাটাবেইজের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ বা মালিকানা পেতে ব্যর্থ হওয়ার পর, এবার সরাসরি ডাটাবেইজ নয়, বরং অ্যাপ্লিকেশন প্রোগ্রামিং ইন্টারফেস বা ‘এপিআই’ (API) ব্যবহারের অনুমতি চেয়ে আন্তর্জাতিক এই সংস্থাটিকে চিঠি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন। সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিগত সুবিধা পেলে নিজস্ব সার্ভার থেকেই ইউএনএইচসিআরের ডাটাবেইজের তথ্য যাচাই-বাছাই করে রোহিঙ্গা ভোটার শনাক্ত ও প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন ইসি কর্মকর্তারা।

ইসির দায়িত্বশীল সূত্রগুলো থেকে জানা গেছে, গত বছর বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের বায়োমেট্রিক ও অন্যান্য তথ্যের সার্ভার ইসির কাছে হস্তান্তরের ব্যাপারে নীতিগত সম্মতি জানিয়েছিল ইউএনএইচসিআর। তবে এই বিশাল ও সংবেদনশীল সার্ভারটি মূলত নির্বাচন কমিশনের অধীনে থাকবে, নাকি তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে রাখা হবে তা নিয়ে অভ্যন্তরীণ এক ধরনের প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক মতবিরোধ তৈরি হয়। আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক এই রেষারেষির কারণে শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক সংস্থাটির কাছ থেকে সেই সার্ভার আর বুঝে পাওয়া যায়নি, যার ফলে দীর্ঘদিন ধরে থমকে ছিল রোহিঙ্গাদের তথ্য যাচাইয়ের পুরো প্রক্রিয়াটি।

সম্প্রতি ভোটার তালিকায় কয়েকজন রোহিঙ্গার অবৈধ অনুপ্রবেশের সুনির্দিষ্ট তথ্য ফাঁসের পর নড়েচড়ে বসেছে কমিশন। মাঠপর্যায়ের প্রকৃত চিত্র ও জালিয়াতির ধরন পর্যবেক্ষণ করতে জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের মহাপরিচালক স্বয়ং কক্সবাজার অঞ্চল পরিদর্শন করেন। সেখান থেকে ফিরে এসে তিনি সরাসরি সার্ভার আমদানির জটিলতায় না গিয়ে, আইটি সলিউশন হিসেবে ‘এপিআই’ সংযোগ চেয়ে ইউএনএইচসিআর-কে চিঠি দেওয়ার নির্দেশনা প্রদান করেন। এই চিঠির খসড়া তৈরির কাজ এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এ প্রসঙ্গে নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ জানিয়েছেন, পূর্ববর্তী প্রক্রিয়ায় কিছু জটিলতা থাকায় সার্ভার পাওয়া না গেলেও, জাতীয় নিরাপত্তা ও ভোটার তালিকার সুরক্ষায় তারা পুনরায় ইউএনএইচসিআরের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন এবং এবার এপিআই চেয়ে চিঠি পাঠানো হচ্ছে।

বিগত কয়েক দশক ধরে বিভিন্ন সময়ে মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গাদের পাশাপাশি ২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর পরিকল্পিত গণহত্যা ও নির্যাতনের মুখে প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। 

আরও পড়ুন: সীমান্তে নজরদারি বাড়াতে ১১ জেলায় আনসার-ভিডিপি সদস্য মোতায়েন

ইউএনএইচসিআরের সর্বশেষ হালনাগাদ (২৮ ফেব্রুয়ারি) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১১ লাখ ৮৪ হাজার ৮৬৪ জনে। এই বিশাল এবং দিন দিন বর্ধনশীল জনগোষ্ঠীর কারণে বাংলাদেশ বর্তমানে তীব্র ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটে হিমশিম খাচ্ছে। এর সমান্তরালে দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির যেমন অবনতি ঘটছে, তেমনি একটি চক্রের সহায়তায় অনৈতিক পন্থায় বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) হাতিয়ে নেওয়ার প্রবণতাও অব্যাহত রেখেছে রোহিঙ্গারা। ইতোমধ্যে বেশ কিছু রোহিঙ্গা বাংলাদেশি পাসপোর্ট তৈরি করে বিদেশেও পাড়ি জমিয়েছে। তবে কমিশন বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে বিভিন্ন প্রযুক্তিগত উপায়ে জালিয়াতি করা এনআইডিগুলো শনাক্ত করছে এবং সেগুলো লক বা ব্লক করে দেওয়ার প্রক্রিয়া চলমান রেখেছে।

বর্তমানে চট্টগ্রাম অঞ্চলের নাগরিকদের ভোগান্তি কমাতে এবং একই সঙ্গে রোহিঙ্গা অন্তর্ভুক্তি শতভাগ রুখতে নির্বাচন কমিশন একটি ত্রিস্তর বিশিষ্ট নাগরিক আবেদন যাচাই পদ্ধতি বা ক্যাটাগরি সিস্টেম চালু করেছে। এই প্রক্রিয়া অনুযায়ী সাধারণ নাগরিকদের আবেদনগুলোকে ‘এ’, ‘বি’ এবং ‘সি’ এই তিনটি সুনির্দিষ্ট ক্যাটাগরিতে ভাগ করে নিষ্পত্তি করা হয়। তবে ঢালাওভাবে যেন কোনো প্রকৃত বাংলাদেশি নাগরিক হয়রানির শিকার না হন, সেই বিষয়েও মাঠ প্রশাসনকে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

‘এ’ ক্যাটাগরি: যেসব আবেদনকারীর এসএসসি বা সমমানের শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ রয়েছে এবং দাখিলকৃত তথ্যের সঙ্গে পিতা-মাতার এনআইডি তথ্যের শতভাগ মিল রয়েছে, তাদের আবেদন এই ক্যাটাগরিতে সরাসরি অনুমোদন দেওয়া হয়।

‘বি’ ক্যাটাগরি: আবেদনকারীর যদি কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাগত সনদ না থাকে, তবে অনলাইন জন্ম নিবন্ধন সনদ এবং পিতা-মাতার এনআইডি তথ্যের মিল থাকলে সেটি ‘বি’ ক্যাটাগরিভুক্ত হিসেবে বিবেচিত হয়।

‘সি’ ক্যাটাগরি (বিশেষ যাচাই): উপরে উল্লিখিত দুটি ক্যাটাগরির বাইরে যেসকল আবেদন নিয়ে কর্মকর্তাদের মনে সামান্যতম সন্দেহ জাগবে, সেগুলোকে সরাসরি ‘সি’ ক্যাটাগরি বা ‘বিশেষ এলাকা কমিটি’র কাছে পাঠানো হয়।

রোহিঙ্গা অধ্যুষিত দেশের সীমান্তবর্তী চার জেলা চট্টগ্রাম, বান্দরবান, রাঙামাটি ও কক্সবাজারের ৩২টি উপজেলাকে এই বিশেষ নজরদারির আওতায় রাখা হয়েছে। এই ‘সি’ ক্যাটাগরির আবেদনগুলো যাচাইয়ের জন্য গঠিত বিশেষ কমিটিতে সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) আহ্বায়ক এবং উপজেলা/থানা নির্বাচন কর্মকর্তা সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া কমিটির অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে সম্পৃক্ত রয়েছেন সহকারী কমিশনার (ভূমি), থানার অফিসার ইনচার্জ (কমপক্ষে এসআই/এএসআই পদমর্যাদা), উপজেলা আনসার ও ভিডিপি কর্মকর্তা এবং জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বিজিবি, ডিজিএফআই, এনএসআই ও পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের (এসবি) কর্মকর্তা পর্যায়ের প্রতিনিধি দল। এই উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ও সমন্বিত কমিটির পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত এবং সবুজ সংকেত ছাড়া সন্দেহভাজন কোনো ব্যক্তির এনআইডি বা ভোটার তালিকাভুক্ত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়